আজ শনিবার দুপুরে বগুড়া প্রেসক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ছাত্রলীগের নতুন কমিটি বাতিলের দাবিতে এভাবে হুমকি দেন পদবঞ্চিত নেতা–কর্মীরা। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন বগুড়া সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ওবাইদুল্লাহ সরকার।

সংবাদ সম্মেলনে ওবাইদুল্লাহ সরকার বলেন, ‘বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের অধীন ১৯টি সাংগঠনিক ইউনিটের মধ্যে ১৫টি ইউনিটই বিতর্কিত জেলা কমিটি বাতিল চায়। ১৫ ইউনিটের নেতা–কর্মীরা সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত আছেন। বিতর্কিত কমিটি বাতিলের দাবিতে চলমান আন্দোলনের কারণে অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সংকট নিরসনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হলে কর্মসূচি দুই দিনের জন্য স্থগিত করা হয়। কিন্তু কালক্ষেপণ করার পরও সমস্যার সমাধান করতে পারেনি জেলা আওয়ামী লীগ। বাধ্য হয়ে অযোগ্য কমিটিকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করে পুনরায় আন্দোলন শুরু হয়েছে। কমিটি বাতিল না হলে ঘরে ফিরে যাব না।’

সংবাদ সম্মেলনে ওবাইদুল্লাহ সরকার আরও বলেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, জেলা ছাত্রলীগের কমিটিতে পদ পেতে হলে নিজ জেলার স্থায়ী বাসিন্দা হতে হবে। অথচ অনৈতিকভাবে ঘোষিত কমিটিতে অন্য জেলার বাসিন্দারাও পদ পেয়েছেন। দুর্গাপূজার মণ্ডপে মদ্যপান করে মাতলামির কারণে গণপিটুনির শিকার ব্যক্তিকেও জেলা ছাত্রলীগের শীর্ষ পদ দেওয়া হয়েছে। সাধারণ সম্পাদক পদ পাওয়া ব্যক্তি জেলা ছাত্রলীগে ‘অচেনা অতিথি’। কমিটি ঘোষণার আগে জেলা ছাত্রলীগের কোনো কর্মকাণ্ডে, আন্দোলন-সংগ্রামে কোনো দিনই তাঁকে দেখা যায়নি। বগুড়ার কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্রও নন তিনি। কমিটিতে মাদকের কারবারি, মাদকসেবী, চাঁদাবাজ, ছিনতাইকারী, সমকামী, ছাত্রলীগ নেতা হত্যায় ইন্ধনদাতাসহ বিতর্কিত অনেককেই পদ দেওয়া হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, অর্থের বিনিময়ে জেলা ছাত্রলীগের কমিটি দেওয়ার কথা স্বীকার করে সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় এক নেতার আত্মস্বীকৃতিমূলক কথোপকথনের অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ওই কথোপকথনে স্পষ্ট হয়েছে, অর্থের বিনিময়ে সরকারি আজিজুল হক কলেজ ইউনিট ঘোষণারও গোপন তোড়জোড় চলছে।

সংবাদ সম্মেলনে বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক তাকবির ইসলামের বাবা ও শহরের মালতীনগরের বাসিন্দা জহুরুল ইসলাম বলেন, তাকবির জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি প্রার্থী ছিলেন। এর জেরে  গত বছরের ১১ মার্চ বগুড়ার সাতমাথায় সরকারি আজিজুল হক কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফের নেতৃত্বে হত্যার উদ্দেশে তাকবিরের ওপর হামলা হয়। পরে শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১৬ মার্চ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান তাকবির। হত্যা মামলা দায়েরের পর আবদুর রউফকে ছাত্রলীগ থেকে বহিষ্কার করা হয়। আবদুর রউফ ও তাঁর সহযোগীদের অভিযুক্ত করে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল হয়েছে। অথচ সাতমাথায় মুজিব মঞ্চে ছাত্রলীগের নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে অভিযুক্ত আবদুর রউফ সদ্য ঘোষিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের গলায় মামলা পরিয়ে দিয়েছেন। এখন খুনি রউফকে ছাত্রলীগের সদ্য ঘোষিত কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ছায়াসঙ্গী হিসেবে দেখা যাচ্ছে। ছাত্রলীগ করতে গিয়ে তাঁর ছেলে খুন হয়েছেন। বাবা হয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে তাঁর দাবি, খুনিদের দোসর বিতর্কিত এই কমিটি বাতিল করে সম্মেলনের মাধ্যমে নতুন কমিটি ঘোষণা করতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে সদর উপজেলা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক শামীম হোসেন, কাহালু উপজেলা শাখার সভাপতি সৌগির আহমেদ, নন্দীগ্রামের সাধারণ সম্পাদক শুভ আহমেদ, সরকারি শাহ সুলতান কলেজ শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুর রাব্বী, শাজাহানপুর উপজেলার সভাপতি রাকিবুল ইসলাম, বগুড়া শহর শাখার সভাপতি সুজিত কুমার দাস, শিবগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক মাসুদ পারভেজ, গাবতলী উপজেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল গফুর প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

৭ নভেম্বর বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের আংশিক কমিটি ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ। সম্মেলন ছাড়াই সাত বছর পর ঘোষিত এ কমিটিতে সভাপতি, সাধারণ সম্পাদকসহ ৩০ জনের নাম আছে। কমিটি ঘোষণার পরপরই শহরের টেম্পল সড়কে আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে জড়ো হন পদবঞ্চিত ও পদ না পাওয়া নেতা-কর্মীরা। ওই ভবনে ছাত্রলীগসহ আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সব সংগঠনের কার্যালয়। বিক্ষুব্ধ নেতা–কর্মীরা কমিটি প্রত্যাখ্যান করে ওই ভবনের ফটকে তালা লাগিয়ে দেন। এরপর লাগাতার আন্দোলনের ঘোষণা দিয়ে বিক্ষোভ শুরু করেন।

১১ নভেম্বর শহরের সাতমাথায় ৩০ গজের মধ্যে ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত এবং পদ পাওয়া অংশ পাল্টাপাল্টি সমাবেশ করে। জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ের সামনে পদবঞ্চিত অংশের সমাবেশ চলাকালে পাশে মুজিব মঞ্চে নতুন কমিটির অভিষেক হয়। উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতিতে পুলিশ মাঝে অবস্থান নেয়। মুজিব মঞ্চে নতুন কমিটির অভিষেক অনুষ্ঠানে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি মজিবর রহমান ও সাধারণ সম্পাদক রাগেবুল আহসান বক্তব্য দেন।

পরে আন্দোলন স্থগিত ঘোষণা করেন ছাত্রলীগের পদবঞ্চিত অংশের নেতারা। কিন্তু বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যেও সংকট নিরসন না হওয়ায় গত সোমবার থেকে বগুড়া জেলা ছাত্রলীগের সদ্য ঘোষিত কমিটি বাতিলের দাবিতে লাগাতার বিক্ষোভ করছেন পদবঞ্চিত ও কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়া নেতা-কর্মীরা।