চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণের চার আসনে লড়াইয়ে বিএনপি-জামায়াত

শেষ মুহূর্তে চলছে ভোটের হিসাব-নিকাশ। পছন্দের প্রতীক ও প্রার্থীকে ভোট দিতে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছেন ভোটাররা। কাল বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে সাতটা থেকে শুরু হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ভোট গ্রহণ। ইতিমধ্যে ভোট গ্রহণের যাবতীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে নির্বাচন কমিশন।

চট্টগ্রামের ১৬টি আসনের মধ্যে উত্তর চট্টগ্রামে রয়েছে সাতটি, দক্ষিণে পাঁচটি। ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তর-দক্ষিণের ১২ আসনের মধ্যে ৬টিতে বিএনপির অবস্থান তুলনামূলক ভালো। এলডিপি ও জামায়াতে ইসলামীর অবস্থান ভালো দুটিতে। বাকি চারটিতে বিএনপি-জামায়াতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে।

ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, উত্তর চট্টগ্রামের মিরসরাই, ফটিকছড়ি ও রাঙ্গুনিয়া আসনে বিএনপির সঙ্গে জামায়াতের প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ে তুলেছেন। হাটহাজারী, রাউজান, সদ্বীপ ও সীতাকুণ্ডে বিএনপির প্রার্থীরা ভালো অবস্থানে রয়েছেন।

দক্ষিণ চট্টগ্রামের পাঁচটি আসনের মধ্যে পটিয়া ও আনোয়ারাতে বিএনপি এবং চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ায় এলডিপি ও জামায়াতে ইসলামী ভালো অবস্থানে রয়েছে। বাঁশখালীতে ত্রিমুখী লড়াইয়ের আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

উত্তর চট্টগ্রামের সাতটি আসন

চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসনে বিএনপির প্রার্থী নুরুল আমিন ও জামায়াতের ছাইফুর রহমানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। বিএনপির প্রার্থী ভালো অবস্থানে থাকলেও উপজেলার মিঠানালা, সদরসহ কয়েকটি এলাকায় জামায়াত এগিয়ে। কোন্দলে বিভক্ত বিএনপির সবার ভোট ধানের শীষে না পড়লে নির্বাচনী বৈতরণী পার করা কঠিন হয়ে উঠবে দলটির এই আসনে, যার সুফল পেতে পারে জামায়াত।

চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসনে বিএনপির প্রার্থী সরওয়ার আলমগীরের সঙ্গে জামায়াতের নুরুল আমিনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তৃতীয় অবস্থানে থাকতে পারেন বৃহত্তর সুন্নি জোটের প্রার্থী বাংলাদেশ সুপ্রিম পার্টির সাইফুদ্দিন মাইজভান্ডারী একতারা প্রতীক নিয়ে। মাইজভান্ডার দরবার শরীফের উত্তরসূরি হিসেবে এই আসনে নির্দিষ্ট কিছু ভোট রয়েছে।

এ দিকে গত সোমবার রাতে ফুটবল প্রতীকের স্বতন্ত্র প্রার্থী আহম্মদ কবির করিম সংবাদ সম্মেলন করে নিজে সরে গিয়ে জামায়াত প্রার্থীকে সমর্থন জানান। ঘোষণাকালে তিনি বলেন, ‘বৃহত্তর জনস্বার্থ, ইনসাফভিত্তিক রাজনীতি এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি স্বেচ্ছায় নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করছেন।’

চট্টগ্রাম-৩ (সন্দ্বীপ) আসনে সাবেক সংসদ সদস্য মোস্তফা কামাল পাশা ও জামায়াতের আলাউদ্দিন সিকদারের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। প্রবীণ ও নবীন প্রার্থীর মধ্যে এই লড়াইয়ে ধানের শীষের প্রার্থী এগিয়ে রয়েছে। প্রার্থী এলাকার পরিচিত মুখ ও বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন বলে ভোটারদের ভাষ্য।

চট্টগ্রাম-৪ (সীতাকুণ্ড) আসনে বিএনপির সাবেক আসলাম চৌধুরী ও জামায়াতের আনোয়ার সিদ্দিক রয়েছেন। জাহাজভাঙা শিল্পসহ শিল্প কারখানা রয়েছে এই এলাকায়। কিন্তু ৫ আগস্টের পর চাঁদাবাজিসহ নানা ইস্যুর কারণে লোকজন বিকল্প চিন্তায় রয়েছে। এই কারণে বিএনপির ‘হেভিওয়েট’ প্রার্থীকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে কাঠখড় পোহাতে হবে। এ ছাড়া শুরুতে বিএনপির সালাউদ্দিনকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়। পরে আসলামকে। এতে দ্বিধায় পড়ে যান ভোটাররা। তবে শেষমেশ আসলাম এগিয়ে থাকতে পারেন বলে মনে করেন সেখানকার ভোটাররা।

চট্টগ্রাম-৫ (হাটহাজারী) আসনে বিএনপির মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন ও ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের বাংলাদেশ খেলাফতে মজলিশের নাছির উদ্দিন মুনিরের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে মীর হেলাল এগিয়ে রয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রয়েছেন তিনি। এ ছাড়া উপজেলা বিএনপির বেশির ভাগ নেতা-কর্মী আগে থেকে হেলালের সঙ্গে রয়েছেন। পরে মনোনয়নবঞ্চিত দুই নেতাও তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন।

ভোটাররা জানান, হেফাজতে ইসলাম-অধ্যুষিত এই এলাকায় হেফাজতের যুগ্ম মহাসচিব নাছির উদ্দিন যেমন হেফাজতের ভোট পাবেন তেমনি মীর হেলালও পাবেন। দুজনেরই বাড়ি উপজেলা সদরে। মীর হেলালকেও পছন্দ করেন হেফাজতের কিছু নেতা-কর্মী। গত সোমবার রাতে তার নির্বাচনী সভায় উপজেলা হেফাজতে ইসলামের সাধারণ সম্পাদক মাওলানা এমরান সিকদার মীর হেলালের জন্য ভোট চান।

চট্টগ্রাম-৬ (রাউজান) আসনে বিএনপির গিয়াস উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও বৃহত্তর সুন্নি জোট থেকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের ইলিয়াস নুরীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। গিয়াস এগিয়ে রয়েছেন। তবে ৫ আগস্টের পর রাউজানে গোলাগুলি, খুনোখুনির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় সাধারণ ভোটাররা বিকল্প প্রার্থীর কথাও চিন্তা করছেন জানা গেছে। সেই হিসেবে গিয়াসকে নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে একটু বেগ পেতে হতে পারে। খুনোখুনির ঘটনায় সেখানকার লোকজন সুন্নি জোট কিংবা জামায়াতের শাহজাহান মঞ্জুকেও বেছে নিতে পারেন জানা গেছে।

চট্টগ্রাম-৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপির হুমাম কাদের চৌধুরী ও জামায়াতের এ টি এম রেজাউল করিমের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। প্রয়াত সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে ও বিএনপির প্রার্থী হিসেবে হুমাম সাধরণ অনেক ভোটারের সমর্থন পাচ্ছেন। তবে এলাকায় চিকিৎসাসহ নানা সামাজিক কাজে দীর্ঘদিন কাজ করে যাওয়া রেজাউল করিমও আলোচনায় রয়েছেন। পাশাপাশি বৃহত্তর সুন্নি জোটের এম ইকবাল হাসানেরও সমর্থন রয়েছে।

দক্ষিণে পাঁচ আসন

চট্টগ্রাম-১২ (পটিয়া) আসনে বিএনপির এনামুল হক ও জামায়াতের ফরিদুল আলমের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। এনাম দীর্ঘদিন থেকে এলাকায় রয়েছেন। বিএনপির আসন হিসেবে পরিচিত এই আসেন তাই এগিয়ে আছেন ধানের শীষের প্রার্থী।

চট্টগ্রাম-১৩ (আনোয়ারা-কর্ণফুলী) আসনে বিএনপির সরওয়ার জামাল নিজাম, জামায়াতে ইসলামীর মাহমুদুল হাসান চৌধুরী ও বৃহত্তর সুন্নি জোট থেকে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের এস এম শাহজাহানের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। তবে বিএনপির প্রার্থী সেখানে এগিয়ে রয়েছেন।

চট্টগ্রাম-১৪ (চন্দনাইশ) আসনে বিএনপির জসীম উদ্দিন আহমেদের প্রতিদ্বন্দ্বী লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়াম্যান অলি আহমদের ছেলে ওমর ফারুক (ছাতা প্রতীক) ভালো অবস্থানে আছেন। তাঁকে জামায়াত সমর্থন দিয়েছে। সেখানে সুন্নি জোটের প্রার্থী সোলেমান ফারুকীও আলোচনায় রয়েছেন। তিনি দুইবার উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন। এ ছাড়া বিএনপির দুই বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় এই সুযোগ এলডিপিও সুন্নি জোটের প্রার্থীর ঘরে যাবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।

চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনে জামায়াতের শাহজাহান চৌধুরী ও বিএনপির নাজমুল মোস্তফা আমিন মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে। তবে জামায়াতের শাহজাহান কিছুটা এগিয়ে আছেন জানিয়েছেন ভোটাররা।

চট্টগ্রাম-১৬ (বাঁশখালী) আসনে বিএনপির মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী ও জামায়াতের মুহাম্মদ জহিরুল ইসলাম ও বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী লেয়াকত আলীর (ফুটবল) মধ্যে ত্রিমুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া গেছে।