পেশায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মানিকের স্ত্রী হেমতা রানী পীরগঞ্জ সরকারি কলেজে স্নাতক শ্রেণির দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী। একমাত্র সন্তান প্রিন্সের বয়স কেবল সাত মাস। আট বছর ধরে অভিনয় করছেন মানিক।

বিদ্যালয়ের বারান্দায় কাপড় দিয়ে ঘেরাও দিয়ে শিল্পীদের জন্য সাজঘর করা হয়েছে। অন্যদের সঙ্গে চার যুবক সাজ নিচ্ছিলেন। লাল ফিতায় চুলে বেণি। কানে দুল। মুখে মেকআপ। ঠোঁটে লিপিস্টিক। এই ধামের গানে নারী চরিত্রে অভিনয় করবেন তাঁরা। সাজ নেওয়ার সময় কথা হয় মানিকসহ অন্য তিনজনের সঙ্গেও।

দিনমজুর শুকরু বর্মণ (৬০) বলেন, এই দলে যাঁরা অভিনয় করছেন, তাঁদের সবারই বাড়ি জনগাঁও। গ্রামের কৃষক, শ্রমিক, মজুর, মেহনতি মানুষ নিয়ে গড়ে তোলা হয়েছে দল। প্রায় ৪০ বছর ধরে দলের সঙ্গে রয়েছেন তিনি।

প্রবীণ রায় (৩২) পেশায় কৃষিশ্রমিক। কমলা রঙের শাড়ির সঙ্গে মাথায় ব্যান্ড পরে নারী সেজেছেন। এই পালায় তিনি ডাকিনীর চরিত্রে অভিনয় করবেন। প্রবীণ রায় বলেন, বয়স যখন ১০, তখন থেকেই ধামের গানে অভিনয় করে আসছেন। স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়েকে নিয়ে তাঁর সংসার। মেয়ে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে আর ছেলের কেবল পড়ালেখায় হাতেখড়ি হয়েছে। ‘মেয়ে সেজে যখন অভিনয় করি, তখন নিজেকে মেয়েই মনে হয়। তা না হলে অভিনয় ভালো হয় না। লোকজনের প্রশংসাও পাওয়া যায় না,’ বলেন প্রবীণ।

দিনমজুরি করে সংসার চালান সজেন বর্মণ (৩৭)। ‘ডাকিনী বউমা’ পালায় তিনি নায়কের চরিত্রে অভিনয় করছেন। চারজনের পরিবারে বড় মেয়ে এবার এসএসসি পরীক্ষা দিয়েছে। ছোট মেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে পড়ে। সজেন বলেন, পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় হকারের সঙ্গে গ্রামের হাটে হাটে ঘুরে ওষুধ বিক্রি করতে শুরু করেন। সে সময় তাঁকে নানা রকম গান গাইতে হতো। এভাবে ধামের গানের দলে ঢুকে পড়েন। ধামে অভিনয় করতে এসে যা পান, তাতে সংসার চলে না। তবু মনের টানে আসেন। ধামে অভিনয় করতে এসে দুঃখ-কষ্ট ভুলে যান।

ধামের গানকে এ অঞ্চলের সংস্কৃতির ঐতিহ্য বলে উল্লেখ করেন মনতোষ কুমার দে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, গ্রামের সাধারণ মানুষ, কৃষক-শ্রমিক, ভ্যানচালকেরাই এই ধামের গানের শিল্পী। তাঁরা অনেকেই নারী সেজে অভিনয় করেন। তাঁদের অভিনয় নৈপুণ্যও ভালো। নানা কারণে এসব শিল্পীর সংখ্যা দিন দিন কমে আসছে। তাঁদের অভিনয়ে ধরে রাখতে হলে এখনই পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন।