ঋণ করে গড়লেন নারী ফুটবল একাডেমি, জাতীয় পর্যায়ে খেলছেন অনেকে
ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ২০১৮ সালে ১৪ কিশোরীকে নিয়ে ফুটবল একাডেমি গড়েন সুইহলামং মারমা। এখন সেখানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে ৪২ জন। এই একাডেমি থেকে আটজন বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছে।
ফুটবল অনুশীলনে ব্যস্ত একদল কিশোরী। কেউ বল নিয়ে ছুটছে, কেউ সতীর্থকে পাস দিচ্ছে। মাঠের এক পাশে দাঁড়িয়ে বাঁশি হাতে নির্দেশনা দিচ্ছেন কোচ। সম্প্রতি রাঙামাটির কাউখালী উপজেলা পরিষদ মাঠে এক সকালে গিয়ে দেখা গেল এ দৃশ্য।
কথা বলে জানা যায়, এ একাডেমির কিশোরীরা প্রতিদিন দুই বেলা অনুশীলন করে। তাদের অনেকের স্বপ্ন জাতীয় দলের হয়ে খেলা। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া কোচের নাম সুইহলামং মারমা (৫১)। ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তিনি এ একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ২০১৮ সালে মাত্র ১৪ জন কিশোরীকে নিয়ে শুরু হওয়া এ একাডেমিতে বর্তমানে খেলোয়াড় রয়েছে ৪২ জন। তারা রাঙামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়ির প্রত্যন্ত এলাকা থেকে এসেছে।
সুইহলামং মারমা ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ফুটবল দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন কোচের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের কিশোরীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয় তাঁর। এ একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া কিশোরীদের কেউ কেউ ইতিমধ্যে আনসার, সেনাবাহিনী, পুলিশ ও বিমানবাহিনীতে চাকরির সুযোগ পেয়েছে। আবার জাতীয় নারী ফুটবল দলের বিভিন্ন বয়সভিত্তিক পর্যায়ে খেলার সুযোগ পেয়েছে আটজন।
ঋণের টাকায় শুরু
একাডেমি প্রতিষ্ঠার জন্য আনসার ও ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে চার লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন সুইহলামং। বর্তমানে একটি ভাড়া বাসায় তাঁর একাডেমির আবাসন কার্যক্রম চলছে। এ জন্য তাঁকে মাসে ২০ হাজার টাকা ভাড়া দিতে হয়।
একাডেমি পরিচালনায় শুরু থেকেই অর্থসংকট ছিল তাঁর। নিজের ও স্ত্রীর বেতনের বড় একটি অংশ তিনি একাডেমি চালানোর জন্য ব্যয় করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) ও সমবায় সমিতি থেকেও ঋণ নিতে হয়েছে তাঁকে। সেই টাকায় খেলোয়াড়দের জুতা, জার্সি ও বল কেনেন তিনি।
শুরুতে খেলোয়াড়দের বিনা মূল্যে থাকা-খাওয়া ও পড়াশোনার ব্যবস্থা করা হতো। তবে গত বছর থেকে যেসব খেলোয়াড়ের আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে তারা মাসে এক থেকে দেড় হাজার টাকা দিচ্ছে। সম্প্রতি বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনসহ বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান একাডেমিকে এককালীন আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে।
‘যে সুবিধাগুলো এই একাডেমিতে আছে, তা যদি সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আরও বড় পরিসরে বাড়ানো যায়, তবে এই একাডেমি থেকেই উঠে আসবে আগামী দিনের বহু ঋতুপর্ণা, মনিকা ও রূপনা।’
সুইহলামং মারমার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, একাডেমি থেকে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলার সুযোগ পেয়েছে আটজন নারী ফুটবলার। এ ছাড়া সেনাবাহিনীতে ছয়জন, পুলিশে একজন, বিমানবাহিনীতে একজন এবং আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীতে ৫০ জন খেলোয়াড় কোটায় চাকরি পেয়েছে।
এ ছাড়া তাঁর একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া খেলোয়াড়দের মধ্যে আনসার ফেন্সিং দলে আটজন, জুডোতে চারজন এবং সাইক্লিস্ট হিসেবে একজন রয়েছে। একাডেমি থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া ছয়জন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি) ভর্তির সুযোগ পেয়েছে।
বর্তমান জাতীয় নারী ফুটবল দলের খেলোয়াড় ঋতুপর্ণা চাকমা, রূপনা চাকমা, মনিকা চাকমা, আনাই মোগিনী ও আনুচিং মোগিনীর প্রশিক্ষণের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন সুইহলামং। ২০১১ থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত তাঁদের ঘাগড়া উচ্চবিদ্যালয় মাঠে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন তিনি। তিনি ঋতুপর্ণাদের সহকারী কোচ ছিলেন।
জাতীয় দলে খেলার স্বপ্ন তাদের
একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া খেলোয়াড়দের অনেকেরই স্বপ্ন জাতীয় দলের হয়ে খেলা। বান্দরবানের রোয়াংছড়ি উপজেলা থেকে আসা আনিষা তঞ্চঙ্গ্যা তাদের একজন। সে ইতিমধ্যে বাংলাদেশ আনসার একাডেমির ফেন্সিং ইভেন্টে খেলার সুযোগ পেয়েছে।
আনিষা বলে, ‘আমাদের বান্দরবান থেকে এর আগে এভাবে কেউ মূলধারার খেলায় সুযোগ পায়নি। পাহাড়ি গ্রাম থেকে এসে সুইহলামং স্যারের কাছে কঠোর অনুশীলন করেছি। স্যারের সঠিক দিকনির্দেশনায় আমি বাংলাদেশ আনসার একাডেমির ফেন্সিং টিমে খেলার সুযোগ পেয়েছি। তবে আমার মূল লক্ষ্য ও স্বপ্ন—একদিন ঋতুপর্ণা আপুদের মতো দেশের জার্সিতে জাতীয় দলের হয়ে মাঠে নামব।’
সুইহলামং মারমা ২০০৫ সাল থেকে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ফুটবল দলের কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। দীর্ঘদিন কোচের দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পার্বত্য অঞ্চলের কিশোরীদের প্রশিক্ষণ দেওয়ার ইচ্ছা তৈরি হয় তাঁর।
খাগড়াছড়ির লক্ষ্মীছড়ি থেকে আসা অর্কি চাকমাও জাতীয় পর্যায়ের ফুটবলার হতে চায়। সে বলে, ‘এখানে স্যারের অধীনে আমাদের নিয়মিত খুব কঠোর অনুশীলন করতে হয়। কোনো ছাড় নেই। কিন্তু অনুশীলনের বাইরে স্যার আমাদের অভিভাবকের মতো যত্ন নেন। স্যারের নিবিড় দিকনির্দেশনায় নিজেকে প্রতিদিন প্রস্তুত করছি, যেন ভবিষ্যতে দেশের সেরা খেলোয়াড় হতে পারি এবং রূপনা ও মনিকা আপাদের শূন্যস্থান পূরণ করতে পারি।’
রাঙামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার আকর্ষণী চাকমাও এই একাডেমির খেলোয়াড়। সে বলে, ‘এই একাডেমি আমাদের শুধু অনুশীলনেই সীমাবদ্ধ রাখে না, নিয়মিত বিভিন্ন জেলা ও আঞ্চলিক টুর্নামেন্ট খেলার সুযোগ করে দেয়। আমি জাতীয় বয়সভিত্তিক দল থেকে চিঠি পেয়েছি। এটি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন। আমি দেশকে সেরা খেলাটা উপহার দিতে চাই।’
একাডেমির সাফল্য ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে সুইহলামং মারমা বলেন, ‘পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি কিশোরীদের মধ্যে শারীরিক সক্ষমতা ও ফুটবলের জন্য সুপ্ত সম্ভাবনা রয়েছে। দরকার কেবল সঠিক দিকনির্দেশনা ও সঠিক পরিচর্যা। আজ যে সুবিধাগুলো এই একাডেমিতে রয়েছে, তা যদি সরকারি ও বেসরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় আরও বড় পরিসরে বাড়ানো যায়, তবে এই একাডেমি থেকেই উঠে আসবে আগামী দিনের বহু ঋতুপর্ণা, মনিকা ও রূপনা। তারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের পতাকা আরও উঁচুতে তুলে ধরবে।’
একাডেমির কার্যক্রমে সহযোগিতা করছে স্থানীয় প্রশাসনও। কাউখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রাজিব হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সুইহলামং মারমার এই উদ্যোগ পাহাড়ের মেয়েদের স্বাবলম্বী ও আত্মবিশ্বাসী করে তুলছে। কাউখালী উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাডেমিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া কিশোরীদের প্রয়োজনীয় ক্রীড়াসামগ্রী প্রদান করা হচ্ছে। তাদের আবাসিকে খাবারের সুব্যবস্থা করা হচ্ছে। এই ধারাবাহিক সমর্থন ভবিষ্যতে আরও জোরদার করা হবে।