যাত্রার নায়ক থেকে চায়ের দোকানি, কিন্তু দোতারা ছাড়েননি সামাদ মোল্লাহ
বুকে ঝোলানো দোতারা, গায়ে শার্ট, পায়ে চটিজুতা। আপনমনে হেঁটে চলেছেন নির্দিষ্ট গন্তব্যে। এভাবে গ্রামের মেঠো পথে প্রতিদিন চলাচল করেন দোতারাবাদক আবদুস সামাদ মোল্লাহ (৬৫)। বয়স, অভাব–অনটন আর রোগবালাইয়ের সঙ্গে তিনি যুদ্ধ করে চলেছেন। একসময় যাত্রাপালার নায়ক থেকে হয়ে যান দোতারাবাদক। এখন চা–দোকানি, এরপরও ছাড়েননি দোতারা।
আবদুস সামাদ মোল্লাহ রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের একডালা সমাসপাড়া গ্রামের বাসিন্দা। এলাকায় সাদা মনের মানুষ হিসেবে পরিচিত। এই বয়সেও দোতারা বাজিয়ে গান গেয়ে তাঁর চায়ের দোকানে মানুষকে বিনোদন দিয়ে চলেছেন।
সামাদ মোল্লাহ জানান, কিশোর বয়স থেকেই সাংস্কৃতিক অঙ্গনে জড়িয়ে পড়েন সামাদ মোল্লাহ। ১৯৮৬ সালে এলাকায় জাহানারা অপেরা নামে যাত্রাপালার একটি দল তৈরি হয়। তিনি সেই দলে নায়ক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। অভিনয়দক্ষতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। যাত্রাপালা দলের সঙ্গে দেশের বিভিন্ন স্থানে পেশাদার শিল্পী হিসেবে যেতেন। কিছুদিন পর তিনি চরিত্রের পরিবর্তন আনেন। যাত্রাপালার ‘বিবেক’ চরিত্রের প্রয়োজনে তিনি সেই চরিত্রে কাজ শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যে নিজেকে সেই চরিত্রে প্রতিষ্ঠিত করেন। যাত্রাদলের সেরা বিবেক (অন্তরাত্মা) হিসেবে পরিচিতি লাভ করেন। তবে বেশি দিন ধরে রাখতে পারেননি অভিনয়ের ওই চরিত্র।
বিবেক চরিত্রে দীর্ঘ সুরে গান গাইতে হতো। একসময় সামাদের কণ্ঠের সমস্যা হয়। তিনি আর সেই চরিত্রে কাজ করতে পারেননি। তবে হাল ছাড়েননি। নিজেকে সংস্কৃতির মধ্যে রাখতে চেষ্টা চালিয়ে যান। সে সময় যাত্রাদলে দোতারাবাদকের সংকট ছিল। আগে থেকেই তাঁর দোতারায় টুংটাং করার অভ্যাস ছিল। নিজেই বানিয়ে নেন একটি দোতারা। ২০০২ সালে যাত্রাদল বিলুপ্ত হয়। নিজেকে দল থেকে গুটিয়ে নিলেও ছাড়েননি দোতারা। সেই দোতারাই তাঁর সঙ্গী।
সামাদ আরও জানান, ১৯৯৮ সালে বাংলাদেশ বেতার রাজশাহী ও ২০১৯ সালে বাংলাদেশ টেলিভিশনের দোতারাবাদক হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। সেরা বাদক হিসেবে বেতার ও টেলিভিশনের স্বীকৃতি পেলেও সেখান থেকে আর্থিক কোনো সুবিধা পাননি। আগে বেতারে ডাকা হলেও এখন আর ডাক পড়ে না। তবে টেলিভিশনে তাঁকে ডাকা হয়নি। একডালা সমাসপাড়া বাজারে তাঁর ছোট একটি চায়ের দোকান রয়েছে। সেখানে চা-বিস্কুট বিক্রি করে চলেন। তবে ক্রেতাদের চাহিদা অনুযায়ী জিনিসপত্র ও পরিবেশ না থাকায় আয়রোজগার তেমন হয় না। দোকানে বৈদ্যুতিক পাখা (ফ্যান) ও টেলিভিশন কিনতে পারেননি। এসব না থাকায় ক্রেতাদের ধরে রাখা যায় না। পাশের দোকানগুলোতে ফ্যান ও টেলিভিশনের ব্যবস্থা থাকায় ক্রেতারা সেখানে চলে যান।
স্থানীয়রা জানান, সামাদ কিশোর বয়স থেকে সংস্কৃতির সঙ্গে যুক্ত। নানা প্রতিকূলতা ও বাধার মধ্যেও নিজেকে টিকিয়ে রেখেছেন। প্রতিদিন তিনি দোতারা নিয়ে স্থানীয় বাজারে তাঁর চায়ের দোকানে আসেন। দোকানে বসেই দোতারায় সুর তুলে ও গান গেয়ে লোকজনকে মুগ্ধ করেন।
একডালা সমাসপাড়ার বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক জামাল উদ্দিন (৬১) বলেন, ছোটকাল থেকে সামাদ ভাই গানবাজনার সঙ্গে জড়িত। মানুষকে বিনোদন দেওয়াই তাঁর কাজ। খুব ভালো মনের মানুষ।
একই এলাকার বাসিন্দা জসিম উদ্দিন (৪৬) বলেন, ‘সামাদ চাচার অভিনয় দেখছি। গ্রাম এলাকার লোকজনদের অনেক দিন থাইক্যা বিনোদন দিইয়্যা যাচ্ছে। তবে লোকটার অভাব আর রোগ যেন পিছু ছাড়ে না।’
৫ জুন বিকেলে একডালা সমাসপাড়া গ্রামে গিয়ে আবদুস সামাদের কুঁড়েঘরে দেখা হয় তাঁর সঙ্গে। কাঁধে দোতারা ঝুলিয়ে তিনি দোকানে যাওয়ার প্রস্ততি নিচ্ছিলেন। যেতে যেতেই পথে তাঁর সঙ্গে কথা হয়। প্রথমে তিনি অভাব ও রোগের কথা বলতে গিয়ে কেঁদে ফেলেন। তিনি জানান, দিনে দোকান থেকে ২৫০-৩০০ টাকা আয় হয়। এই আয়ে চলতে পারেন না। পাঁচজনের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হয়। টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। ফুসফুস, কিডনি, ডায়াবেটিসসহ নানা রোগে ভুগছেন।
আবদুস সামাদ কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘এই দোতারা ধরে রাখচি। বয়স হওয়ায় অন্য কাজ করতে পারি না। ট্যাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারি না, ওষুধও কিনতে পারচি না। হয়তো অচিরেই থেমে যাবে দোতারার টুংটাং।’
দোকানে গিয়ে কয়েকজনকে বসে থাকতে দেখা যায়। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে তাঁরা বসে আছেন। সেখানে থাকা স্থানীয় আবদুল জলিল (৪৩) বলেন, ‘সামাদ চাচার দোতারার টানেই এখানে বসে চা খাই। এলাকায় সংস্কৃতি ধরে রাখতে তিনি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।’
পাশের হামিরকুৎসা গ্রামের বাসিন্দা বাগমারা প্রেসক্লাবের সভাপতি রাশেদুল হক বলেন, ‘আবদুস সামাদ মোল্লাহ একজন ভালো দোতারাবাদক। তিনি কষ্টের মধ্যে থাকলেও কারও কাছে হাত পাতেন না, নিজের দোতারার সুরও বন্ধ করেন না। গান গেয়ে, দোতারা বাজিয়ে এলাকার লোকজনদের বিনোদন দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁর পাশে আমাদের দাঁড়ানো উচিত।’