কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান ইশায়াত শাহরিয়ার ওরফে অপ্রতিমকে আইফোন ছিনিয়ে নিতে হত্যা করা হয়েছে—পুলিশের এই ব্যাখ্যা মানতে নারাজ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। তাঁদের দাবি, অপ্রতিম হত্যার পেছনে অন্য কোনো কারণ বা সংশ্লিষ্টতা আছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে হবে। সেই সঙ্গে পুলিশের তদন্তে গাফিলতি হয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অপ্রতিম হত্যার প্রতিবাদ, সুষ্ঠু বিচারের দাবিতে আজ সোমবার দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের গোলচত্বরে বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন শেষে এসব দাবি জানানো হয়। এসব কর্মসূচিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীরা অংশ নেন।
অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে অপ্রতিমের মা সদর দক্ষিণ থানায় ছেলের নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি করেন। এরপর পুলিশ যথাযথ তৎপরতা দেখিয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।নাঈম ভূঁইয়া, শিক্ষার্থী, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়
গতকাল রোববার কুমিল্লা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান দাবি করেন, মায়ের আইফোন ছিনিয়ে নেওয়ার উদ্দেশ্যে অপ্রতিমকে পরিকল্পিতভাবে লালমাই পাহাড়ের সানন্দা এলাকার নির্জন জঙ্গলে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে ফোন ছিনিয়ে নেওয়ার সময় বাধা দিলে তাঁকে বাঁশের লাঠি দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে মৃত্যু নিশ্চিত হলে ফোনটি নিয়ে তিনজন ঘটনাস্থল থেকে চলে যান। এ ঘটনায় হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত তিনজনসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের এমন ভাষ্য মানতে নারাজ কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। আজকের সংবাদ সম্মেলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও জাতীয় ছাত্রশক্তি কুমিল্লা দক্ষিণ জেলার আহ্বায়ক নাঈম ভূঁইয়া বলেন, অপ্রতিম নিখোঁজ হওয়ার পর থেকে পুলিশ প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ১৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে অপ্রতিমের মা সদর দক্ষিণ থানায় ছেলের নিখোঁজের বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। এরপর পুলিশ যথাযথ তৎপরতা দেখিয়েছে কি না, সেটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
নাঈম ভূঁইয়া বলেন, অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের পর ঘটনাস্থলে ফরেনসিক দলের পৌঁছাতে কয়েক ঘণ্টা সময় লেগেছে বলে তাঁরা জানতে পেরেছেন। এত সময় পর আলামত সংগ্রহের বিষয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এ জন্য পুলিশ সুপার এবং সদর দক্ষিণ ও আদর্শ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের প্রত্যাহারের দাবি জানানো হয়েছে। নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধারে রাষ্ট্রীয়ভাবে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা থাকা দরকার। নিখোঁজের ঘটনাগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে তদন্তের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে বারবার এসেছে আনাস নামের এক তরুণকে আটক ও পরে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি। এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলনে কাজী মিরাজ নামে এক শিক্ষার্থী জানান, পুলিশ সুপারের সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়েছে, আনাস নামে কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। অন্যদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আরেকটি ইউনিট এসআরবির বক্তব্যে আনাসকে আটক করে পরে ছেড়ে দেওয়ার কথা এসেছে।
একই বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দুই ধরনের বক্তব্যে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে জানিয়ে কাজী মিরাজ বলেন, আনাসকে আটক করা হয়ে থাকলে তাঁকে কেন ছেড়ে দেওয়া হলো এবং তাঁর সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল কি না, সেটি তদন্ত করা হয়েছে কি না। অপ্রতিমের মরদেহ উদ্ধারের স্থান ও সময় নিয়েও তাঁদের প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশের দেওয়া সময়ের সঙ্গে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি মিলিয়ে আরও তদন্ত করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
অপ্রতিমের কাছে থাকা আইফোনই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র কারণ—পুলিশের এই বক্তব্য নিয়েও প্রশ্ন তোলেন কাজী মিরাজ। তিনি বলেন, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জীবনযাপন, তাঁদের কাছে থাকা দামি মুঠোফোন ও মোটরসাইকেলের বিষয়গুলোও তদন্তে বিবেচনায় নেওয়া উচিত। গ্রেপ্তার তুহিনের বিরুদ্ধে আগে মোটরসাইকেল চুরির অভিযোগ ছিল। এসব বিষয়ের সঙ্গে অপ্রতিম হত্যার সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা দরকার।
সংবাদ সম্মেলনে কথা বলেন বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের সদস্যসচিব মোহাম্মদ আবুল বাশারও। তিনি বলেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্তের স্বার্থে কিছু তথ্য এখনই প্রকাশ করা হচ্ছে না বলে তাঁদের জানানো হয়েছে। তদন্তে পাওয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত কারণ সামনে আনতে হবে।। আবুল বাশার বলেন, ‘আমরা হত্যার মূল রহস্য উদ্ঘাটন করতে চাই। অপ্রতিম হত্যার কারণ তাঁর মা নাহিদা বেগমকে জানানো প্রয়োজন।’
গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের একজনের বয়স নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয় সংবাদ সম্মেলনে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্র অধিকার পরিষদের মহানগর সভাপতি সাইফ হোসেন বলেন, ওই তরুণের বয়স ১৯ বছর হলেও তাঁকে ১৫ বছর দেখিয়ে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে। বয়সসংক্রান্ত বিষয়টি যাচাই করে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
অপ্রতিম গত শুক্রবার দুপুরে কুমিল্লার কোটবাড়ীর গন্ধমতী এলাকার ভাড়া বাসা থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়। পরদিন শনিবার দুপুরে সদর দক্ষিণ উপজেলার বিজয়পুর ইউনিয়নের সানন্দা গ্রামের লালমাই পাহাড়ের নির্জন জঙ্গল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সে কুমিল্লার বর্ডার গার্ড পাবলিক স্কুলের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।