দীর্ঘমেয়াদি ও বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা নিলে ফিরতে পারে চকরিয়া সুন্দরবন

‘ হারিয়ে যাওয়া সুন্দরবন ফিরে পাওয়ার পথ কী’ শিরোনামে প্রথম আলো আয়োজিত আলোচনা সভায় উপস্থিত অতিথিরা। আজ বিকেল ৪টায় কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষেসৌরভ দাশ

বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া গেলে চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধার সম্ভব বলে মনে করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন। তাঁর মতে, লবণ চাষ নিয়ন্ত্রণ করে প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতি ফিরিয়ে আনতে পারলে ধীরে ধীরে পুনর্জন্ম হতে পারে এই ম্যানগ্রোভ বনের।

আজ শনিবার বিকেল ৪টায় চকরিয়া উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে ‘হারিয়ে যাওয়া সুন্দরবন ফিরে পাওয়ার পথ কী’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় এ কথাগুলো বলেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন। প্রথম আলো আয়োজিত এ সভায় স্থানীয় বাসিন্দা, গবেষক, পরিবেশকর্মীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। আলোচনা সভায় অংশ নেন প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম, প্রথম আলোর উপসম্পাদক লাজ্জাত এনাব মহছি, চকরিয়া উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) রূপায়ন দেব, জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা, গবেষক সৈয়দ মঈনুল আনোয়ার প্রমুখ।

সভায় অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, ম্যানগ্রোভ বন শুধু গাছের সমষ্টি নয়; এটি একটি জটিল বাস্তুসংস্থান। এই বাস্তুতন্ত্র উপকূলকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দেয়, মাটির লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ করে এবং জীববৈচিত্র্যের জন্য নিরাপদ আবাস তৈরি করে। কিন্তু দীর্ঘদিন চিংড়ি চাষের কারণে চকরিয়া সুন্দরবনের মাটির গঠন ও লবণাক্ততার মাত্রা ব্যাপকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। এতে স্বাভাবিকভাবে গাছ জন্মানোর পরিবেশ নষ্ট হয়েছে।

স্মৃতিচারণা করে অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, ‘ছাত্র অবস্থায় সেই আশির দশকে এ বনে এসেছিলাম। আবার শিক্ষক হিসেবেও এসেছি। বনটি চোখের সামনেই হারিয়ে গেল।’

পুনর্বনায়নের প্রথম শর্ত হিসেবে তিনি প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ ও জোয়ার-ভাটার স্বাভাবিক ছন্দ ফিরিয়ে আনার ওপর গুরুত্ব দেন। অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন বলেন, শ্বাসমূলীয় উদ্ভিদ লবণাক্ত পরিবেশে টিকে থাকতে পারে, কিন্তু অতিরিক্ত লবণাক্ততা ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তাদের বৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করে। তাই ধাপে ধাপে মাটির লবণাক্ততা কমানো, পলি জমার স্বাভাবিক প্রক্রিয়া পুনরুদ্ধার এবং স্থানীয় প্রজাতির গাছ—সুন্দরী, গেওয়া ও গরান—রোপণের উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে কয়েক বছর এলাকা মানবীয় হস্তক্ষেপমুক্ত রাখা জরুরি, যাতে প্রাকৃতিকভাবে চারা জন্মাতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, সরকার সারা দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এই কর্মসূচিকে কার্যকর করতে হলে উপকূলীয় অঞ্চলে ম্যানগ্রোভ পুনরুদ্ধারকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। পরিকল্পিতভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় স্থানীয় প্রজাতির গাছ লাগানো গেলে তা শুধু বনভূমি বাড়াবে না; লবণাক্ততা নিয়ন্ত্রণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগের ক্ষতি কমাতেও ভূমিকা রাখবে।

চকরিয়া সুন্দরবন পুনরুদ্ধারে ‘উল্টো পথে যাত্রা’ প্রয়োজন বলেও মন্তব্য করেন অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ইজারার মাধ্যমে চিংড়ি চাষ বা অন্য কাজে ব্যবহৃত জমিগুলো ধীরে ধীরে বন ব্যবস্থাপনায় ফিরিয়ে আনতে হবে। তবে এর আগে স্থানীয় মানুষের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা জরুরি। জীবিকার নিশ্চয়তা ছাড়া জমি ইজারামুক্ত করা বাস্তবসম্মত নয়।

মোহাম্মদ আল আমীন আরও বলেন, গবেষণার মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে কত দ্রুত মাটির ভৌত ও জীববৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব। দীর্ঘদিন লবণাক্ত পানির প্রভাবে মাটির ওপর শক্ত লবণের স্তর বা ‘সয়েল প্যান’ তৈরি হয়েছে। এই স্তর ভেঙে মাটিকে এমন অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হবে, যাতে বীজ পড়লে অঙ্কুরোদ্‌গম হয় এবং অণুজীবের স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরায় শুরু হতে পারে। মাটি, পানি ও অণুজীবের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ার মধ্য দিয়েই ধীরে ধীরে একটি কার্যকর বাস্তুসংস্থান গড়ে উঠবে।

তবে পুরো প্রক্রিয়াটি সহজ নয় বলে মনে করেন তিনি। দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন গোষ্ঠী এসব জমি থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হয়েছে এবং সময়ের সঙ্গে জমির দখল হাতবদল হয়েছে। ফলে বর্তমান ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে জমি ফিরিয়ে নেওয়া একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। এ কারণে বিকল্প জীবিকা ও ক্ষতিপূরণের বিষয়টি স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নীতিনির্ধারক ও রাজনীতিবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং নৈতিক সদিচ্ছা অপরিহার্য।

জাতীয় পর্যায়ে এই বনের গুরুত্ব কতটা অনুধাবন করা হচ্ছে এবং জমির বর্তমান ব্যবহারকারীদের কীভাবে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে—এ বিষয়গুলোও বিবেচনায় নেওয়ার কথা বলেন অধ্যাপক আল আমীন। এসব প্রশ্নের সমাধান হওয়ার পরই পুনরুদ্ধারের মূল কাজ শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন।

আল আমীন বলেন, শুরুতে লবণসহিষ্ণু ঘাস ও জলাভূমির উদ্ভিদ দিয়ে ভূমিকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। এরপর পর্যায়ক্রমে সাইট-স্পেসিফিক পরিকল্পনার ভিত্তিতে উপযোগী প্রজাতি নির্বাচন, চারা উৎপাদন, রোপণ এবং সুরক্ষার ব্যবস্থা নিতে হবে।

অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীনের মতে, পুরো প্রক্রিয়ায় অনিশ্চয়তা থাকলেও পরিকল্পিত গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতি এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা গেলে চকরিয়ার হারিয়ে যাওয়া সুন্দরবনের অন্তত একটি অংশ পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হতে পারে।

‘ হারিয়ে যাওয়া সুন্দরবন ফিরে পাওয়ার পথ কী’ শিরোনামে আলোচনা সভায় বক্তব্য দেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ আল আমীন
ছবি: সৌরভ দাশ

বনের করুণ ইতিহাস

উপমহাদেশের প্রাচীন ম্যানগ্রোভ বা শ্বাসমূলীয় বনের একটি ছিল চকরিয়া সুন্দরবন। এক সময়ের ঘন সুন্দরবন চকরিয়ার চতুর্দিক ছিল মোটামুটি এমন: পূর্বদিকে আরাকান সড়ক, উত্তর-পূর্ব দিকে জনবসতি, কৃষিভূমি, লবণ মাঠ, সোজা দক্ষিণ দিকে মহেশখালী চ্যানেল। মাতামুহুরী নদীর পশ্চিম পাশের সুন্দরবন রামপুর এলাকা নামে পরিচিত ছিল এবং পূর্ব পাশে ছিল চরণ-দ্বীপ।

চট্টগ্রাম থেকে কক্সবাজার শহরে যাওয়ার পথে চকরিয়া উপজেলা শহর। চকরিয়ার দুই পাশে অসংখ্য দোকানপাট। রাস্তার ডান পাশ দিয়ে বদরখালী সড়ক। এ সড়ক ধরে বদরখালী যাওয়ার সময় দুই পাশে যত দূর পশ্চিমে যাওয়া যায়, শুধু লবণের ঘের।

এই বন নিয়ে গত বছরের ২৪ জুলাই ‘যে বনে একটি মাত্র গাছ’ শিরোনামে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে প্রথম আলো। প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়ার পর বনটি নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়।

প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এককালে কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় প্রায় ২১ হাজার ১০২ একর আয়তনজুড়ে বিস্তৃত ছিল এই বন। কিন্তু গত কয়েক দশকের ‘অবিবেচক’ উন্নয়ন ও মানুষের সীমাহীন লোভের বলি হয়ে আজ এটি এক ‘লবণ মরুভূমিতে’ পরিণত হয়েছে। বর্তমানে সেখানে মাত্র একটি সুন্দরী গাছ অবশিষ্ট আছে, যা হারিয়ে যাওয়া বনের এক নীরব ও করুণ সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই বন ধ্বংসের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল গত শতাব্দীর সত্তরের দশকের মাঝামাঝি সময়ে। মূলত বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ভুল উন্নয়ন দর্শন এবং ঋণের ফাঁদে পড়ে সরকার এই প্রাকৃতিক সম্পদকে রপ্তানিমুখী চিংড়ি চাষের জন্য ইজারা দিতে শুরু করে। আশির দশকে বনের বড় অংশ উজাড় করে কয়েক শ চিংড়ি ঘের তৈরি করা হয়। দাতা সংস্থাগুলোর দাবি ছিল এটি জলাবদ্ধতা দূর করবে এবং অর্থনীতিতে গতি আনবে, কিন্তু বাস্তবে তা এক দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত বিপর্যয় ডেকে আনে। ১৯৯৫ সালের মধ্যে বনের পরিমাণ কমে দাঁড়ায় মাত্র ৮৬৬ একরে, যা বর্তমানে শূন্যের কোঠায়।

বনের এই মৃত্যু কেবল গাছপালার বিনাশ নয়, বরং একটি সমৃদ্ধ বাস্তুসংস্থানের অপমৃত্যু। একাধিক গবেষণায় দেখা গেছে, বন ধ্বংসের ফলে অন্তত ৪ লাখ মানুষ তাঁদের ঐতিহ্যগত পেশা ও জীবিকা হারিয়েছে। প্রায় ২০ প্রজাতির মাছ এবং বাঘ, হরিণ, কুমিরসহ অসংখ্য বন্য প্রাণী এলাকা থেকে চিরতরে হারিয়ে গেছে। বর্তমানে চকরিয়ার মাটিতে লবণাক্ততা এতটাই বেড়েছে যে সেখানে ধান বা সবজি চাষ প্রায় অসম্ভব। এর ফলে বছরে অন্তত ১ কোটি ৬০ লাখ ডলার সমমূল্যের প্রতিবেশ পরিষেবা থেকে দেশ বঞ্চিত হচ্ছে।

সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে জনস্বাস্থ্যের ওপর। আইসিডিডিআরবির গবেষণায় দেখা গেছে, বন উজাড় হওয়ায় স্থানীয় তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় ওই এলাকার নারীদের গর্ভপাতের ঝুঁকি ২৫ শতাংশ বেড়েছে। এ ছাড়া শিশুদের শ্বাসকষ্ট ও কিডনি রোগের হারও আশঙ্কাজনক। ১৯৯১ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড়ে যে লক্ষাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, তার অন্যতম কারণ ছিল এই প্রাকৃতিক বর্মটির অনুপস্থিতি।

গবেষকেরা বলছেন, আজও চাইলে চকরিয়ার বন ফিরিয়ে আনা সম্ভব, তবে তা অত্যন্ত জটিল। এর জন্য প্রয়োজন সরকারের দৃঢ় রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং চিংড়ি ঘেরের ইজারা বাতিল করে কয়েক বছর বনকে নিরুপদ্রব রাখা।