জলবায়ু পরিবর্তন চট্টগ্রামসহ সারা দেশে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। এ কারণে প্রতি বছর নিত্যনতুন রোগ দেখা দিচ্ছে। তবে আধুনিক প্রযুক্তি, সঠিক ওষুধ এবং বৈজ্ঞানিক প্রটোকল নিশ্চিত করলে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি কমবে। এ জন্য টিকাদান কার্যক্রম নিরবচ্ছিন্ন রাখা, সংক্রামক রোগের ওপর নজরদারি এবং রোগের তথ্য ডিজিটাল মাধ্যমে সংরক্ষণ করতে হবে।
প্রথম আলো, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) ও বাংলাদেশ সোসাইটি অব মেডিসিনের উদ্যোগে গোলটেবিল বৈঠকে এসব কথা বলেন বক্তারা। আজ সোমবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের মিনি কনফারেন্স হলে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়। আগামীকাল মঙ্গলবার বিশ্ব স্বাস্থ্যদিবস সামনে রেখে এই গোলটেবিলের আয়োজন করা হয়। বিশ্ব স্বাস্থ্য দিবসের এবারের প্রতিপাদ্য ‘স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞান, সুরক্ষিত সকল প্রাণ’।
প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক বিশ্বজিৎ চৌধুরীর সঞ্চালনায় প্রতিপাদ্যের ধারণা তুলে ধরেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, এবারের প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে বিশেষ গুরুত্ব পাচ্ছে ‘ওয়ান হেলথ সিস্টেম’। এটি মানুষের স্বাস্থ্য, পশুপাখি ও পরিবেশের স্বাস্থ্য একত্রে রক্ষা করার একটি সমন্বিত পদ্ধতি। যদি এই তিন ক্ষেত্রের স্বাস্থ্য সঠিকভাবে রক্ষা না করা যায়, সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যব্যবস্থা বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।
বিভাগের স্বাস্থ্যব্যবস্থার চিত্র তুলে ধরেন চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও নগরায়ণ সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কার্যকর টিকাদান ও নজরদারি ব্যবস্থা জনস্বাস্থ্য সুরক্ষার ভিত্তি। বাংলাদেশ জাতীয় টিকাদান কর্মসূচির মাধ্যমে হাম, ডিপথেরিয়া ও পলিও নিয়ন্ত্রণে সাফল্য পেয়েছে। তবে নতুন উদীয়মান রোগ প্রতিরোধে শক্তিশালী নজরদারি, তথ্য বিশ্লেষণ ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া প্রয়োজন।
গোলটেবিল বৈঠকে গুরুতর রোগীর চিকিৎসায় সমন্বিত ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি নিয়ে কথা বলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক অনিরুদ্ধ ঘোষ। তিনি বলেন, অ্যাকিউট মেডিসিন বা ইমার্জেন্সি মেডিসিনে প্রটোকল অনুসরণ করলে রোগীর জীবন বাঁচানো যায়। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এই প্রশিক্ষণ সীমিত। শিক্ষার্থীদের রোগ নির্ণয়, চিকিৎসা ও রোগী ব্যবস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক মনোভাব তৈরি করা জরুরি।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং ও জীবপ্রযুক্তি বিভাগের অধ্যাপক আদনান মান্নান বলেন, স্বাস্থ্যব্যবস্থা সমন্বিত হলে তার কার্যকারিতা বাড়ে। বাংলাদেশের সংক্রামক রোগ যেমন ডেঙ্গু ও চিকনগুনিয়া নিয়ন্ত্রণে গবেষণা ও প্রস্তুতি নেই। তিনি উল্লেখ করেন, উন্নত দেশে চিকিৎসক, মাইক্রোবায়োলজিস্ট, জনস্বাস্থ্যবিদ, এআই–বিশেষজ্ঞ ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারের সমন্বয়ে স্বাস্থ্যব্যবস্থা পরিচালনা হয়; কিন্তু বাংলাদেশে এই অন্তর্ভুক্তিমূলক পদ্ধতি এখনো গড়ে ওঠেনি।
চট্টগ্রাম মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ওমর ফারুক ইউসুফ বলেন, উন্নত দেশে স্বাস্থ্য গবেষণায় জিডিপির প্রায় ৩ শতাংশ খরচ করা হয়। বাংলাদেশেও স্বাস্থ্য গবেষণায় বেশি বিনিয়োগ করা দরকার। মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সরাসরি সেবা না দিলেও শিক্ষা দিয়ে ভবিষ্যতের চিকিৎসক তৈরি করছে, তাই শিক্ষাতেও বিনিয়োগ জরুরি।
গোলটেবিলে জানানো হয়, চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলায় ১১টি সদর হাসপাতাল, ১০২ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ২ হাজার কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও মানুষ সরাসরি নগরকেন্দ্রিক হাসপাতালে আসে। এতে চমেক হাসপাতালে চাপ বেড়ে যায়। চমেক হাসপাতালের শয্যাক্ষমতার চেয়ে দ্বিগুণ রোগী ভর্তি থাকে।
স্বাস্থ্যসেবায় রেফারেল চিকিৎসার গুরুত্ব তুলে ধরেন চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক মোহাম্মদ একরাম হোসেন। তিনি বলেন, রেফারেল চিকিৎসা বলতে বোঝায় উপজেলা, জেলা ও বিশেষায়িত হাসপাতালে ধাপে ধাপে চিকিৎসাসেবা। মধ্যস্তরের হাসপাতালে কার্যকর মডেলের পাশাপাশি টেলিমেডিসিন (টেলিযোগাযোগ সুবিধা ব্যবহার করে স্বাস্থ্যসেবা) সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রোগীর চাপ কমানো সম্ভব বলে তিনি উল্লেখ করেন।
চমেক হাসপাতালের গাইনি ও প্রসূতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ফাহমিদা ইসলাম চৌধুরী বলেন, নিরাপদ মাতৃত্ব নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্যসেবায় বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি প্রয়োজন। মাতৃমৃত্যুর হার কমাতে ডাক্তার, নার্স, মিডওয়াইফ ও পুষ্টিবিদ সমন্বিত টিম গঠন অপরিহার্য।
হাসপাতালের শিশুস্বাস্থ্য বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মোহাম্মদ মুছা মিঞা শিশুদের সুস্থতা নিশ্চিত করতে টিকাদান ও পুষ্টির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, এক্সক্লুসিভ ব্রেস্টফিডিং শিশুকে সংক্রমণ ও মৃত্যুর ঝুঁকি থেকে রক্ষা করে। টিকাদান কার্যক্রম ও স্বাস্থ্যবিধি শিশু মৃত্যুর হার কমাতে কার্যকর।
হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক মো. আবদুস সাত্তার বলেন, অসংক্রামক রোগ নিয়ন্ত্রণে প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসা অপরিহার্য। রোগগুলো জীবনের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং দীর্ঘমেয়াদি। নিয়মিত স্ক্রিনিং, নির্দিষ্ট লক্ষ্য অনুযায়ী চিকিৎসা এবং জীবনধারার পরিবর্তন রোগের ঝুঁকি কমায়।
চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ মো. আবদুর রব বলেন, অনুষদ উন্নয়নের মাধ্যমে ডাক্তার ও স্বাস্থ্যকর্মীর দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। চট্টগ্রাম শহর এবং পটিয়া অথবা সীতাকুণ্ডে দুটি সার্ভিস হাসপাতাল তৈরি করলে চমেকে তিন থেকে চার হাজার রোগীর চাপ কমবে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
স্বাস্থ্য নীতি ও পরিকল্পনার জন্য নির্ভরযোগ্য, ধারাবাহিক ও মানসম্মত তথ্য অপরিহার্য বলে গোলটেবিল বৈঠকে উল্লেখ করেন এশিয়ান ইউনিভার্সিটি ফর উইমেনের সহকারী অধ্যাপক তুহিন বিশ্বাস। তিনি বলেন, নীতি নির্ধারণ ও নতুন নীতি প্রণয়নের জন্য ধারাবাহিক ও মানসম্মত তথ্য থাকা জরুরি। বাংলাদেশের তথ্য ব্যবস্থায় সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
একই প্রসঙ্গে মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রাশেদ মীরজাদা সংক্রামক রোগ মোকাবিলায় নির্ভরযোগ্য তথ্যের অভাবকে প্রধান চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সংক্রামক রোগের আউটব্রেকে আইসোলেশন ওয়ার্ড অপরিহার্য, যা এখনো নেই। মধ্যম স্তরের প্রাইভেট হাসপাতাল তৈরি ও ডিজিটাল তথ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করলে রোগীদের সেবা দ্রুত ও কার্যকরভাবে দেওয়া সম্ভব।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বলেন, মানব স্বাস্থ্য, জেনেটিক ও পরিবেশগত রোগের মধ্যে সম্পর্ক বোঝা গুরুত্বপূর্ণ। বিভিন্ন রোগের ব্যাকটেরিয়ার ওষুধ প্রতিরোধী (অ্যান্টি–মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স) হওয়া ঠেকাতে ফার্মেসিতে ওষুধ বিক্রি নিয়ন্ত্রণ জরুরি বলে তিনি জানান।
রোগীদের কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগের সারমর্ম তুলে ধরে চমেক হাসপাতাল রোগীকল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক অভিজিৎ সাহা বলেন, সরকারি হাসপাতালে আসা অনেক রোগীর দারিদ্র্য ও সচেতনতার অভাবের কারণে চিকিৎসকের দায়িত্ব শুধু রোগ নিরাময় নয়। রোগীর আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে চিকিৎসাব্যবস্থা নিতে হবে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য কর্মকর্তা হোসনা আরা বেগম বলেন, চট্টগ্রামের ৫৮ লাখের বেশি মানুষের মধ্যে অনেক রোগী দরিদ্র। ওষুধ বা পরীক্ষা খরচ বহন করতে অক্ষম তাঁরা। স্বাস্থ্যসেবায় বিজ্ঞানভিত্তিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রোগীর আর্থিক সীমাবদ্ধতা অনুযায়ী বিকল্প ব্যবস্থাও গ্রহণ জরুরি।
গোলটেবিল বৈঠকে বৈজ্ঞানিক সহযোগী হিসেবে ছিল এরিস্টোফার্মা লিমিটেড। এরিস্টোফার্মা লিমিটেডের বিক্রয় ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ রবিউল হোসেন বলেন, মানসম্মত ওষুধ ও যৌক্তিক ব্যবহার নিশ্চিত করা স্বাস্থ্যসেবার জন্য অপরিহার্য। তিনি অ্যান্টি-মাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স ও নকল ওষুধ নিয়ন্ত্রণের গুরুত্ব উল্লেখ করেন।