কাপাসিয়ার বাজার : ‘১৩টা কাঁডল বেইচ্চা ২ কেজি পেঁয়াজ কিনছি’
গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার ঘাগটিয়াচালা বাজারে কাঁঠাল নিয়ে বসে ছিলেন ভাওরাইদ গ্রামের মো. শাহজাহান (৫৫)। বড়-ছোট মিলিয়ে ১৩টি কাঁঠাল এনেছিলেন তিনি। বুধবার বিকেল থেকে সন্ধ্যা নাগাদ সব কাঁঠাল বিক্রি করে তিনি হাতে পেয়েছেন মাত্র ১০০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে বাজার থেকে দুই কেজি পেঁয়াজ কিনে বাড়ি ফিরেছেন তিনি। সেই হিসাবে গড়ে প্রতিটি কাঁঠালের দাম পড়েছে প্রায় সাড়ে ৭ টাকা।
হতাশা আর আক্ষেপ নিয়ে এই প্রতিবেদককে শাহজাহান বলেন, ‘১৩টা কাঁডল (কাঁঠাল) বেইচ্চা ২ কেজি পেঁয়াজ কিনছি, কাঁডল কিনে না কেউ।’
শাহজাহানের মতো একই বাজারে প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর তিনটি কাঁঠাল মাত্র ২০ টাকায় বিক্রি করেন ঘাগটিয়াচালা গ্রামের কফিল উদ্দিন (৬৫)। তবে ভাওরাইদ গ্রামের আবদুস সালাম সাতটি কাঁঠাল নিয়ে দুই ঘণ্টা বসে থেকেও সেদিন বিকেল পর্যন্ত একটিও বিক্রি করতে পারেননি। তাই ক্ষোভ প্রকাশ করে আবদুস সালাম বলেন, ‘কাঁডলের আর বাজার, হাইরা হস্তা (সস্তা)। আমি অনেকক্ষণ ধইরা লইয়া বইয়া রইছি, কাঁডল নেয় না কেউ।’
গাজীপুর তথা কাপাসিয়ার ঐতিহ্যবাহী ফল কাঁঠাল এবার যেন কৃষকের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। মিষ্টতা ও সুবাসের জন্য দেশজুড়ে সুনাম থাকা সত্ত্বেও বিপণন–সংকটে পড়ে হতাশ কাঁঠালচাষিরা। বাজারে কাঁঠালের স্তূপ থাকলেও ক্রেতার সংখ্যা একেবারেই কম। অনেক বাগানে পাকা কাঁঠাল গাছেই নষ্ট হচ্ছে; কিন্তু বিক্রির আগ্রহ দেখা যাচ্ছে না।
কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় ১ হাজার ৭৬০ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭৩ হাজার ৫২৪ টন। ২০২৫ সালে গাজীপুরের কাঁঠাল ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতিও পেয়েছে; কিন্তু এত অর্জনের পরও বাজারে কাঁঠালের দরপতনে হতাশ স্থানীয় চাষিরা।
উপজেলার গিয়াসপুর গ্রামের কৃষক আবদুল কুদ্দুস বলেন, এবার কাঁঠালের উৎপাদন প্রচুর হয়েছে। কিন্তু দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে যত সংখ্যক পাইকার আসার কথা ছিল, তা আসেনি। ফলে অধিকাংশ কৃষক তাঁদের কাঁঠাল ন্যায্যমূল্যে বিক্রি করতে পারছেন না।
একই কথা জানান চৌক্কারচালা গ্রামের আমজাদ হোসেন। তিনি জানান, তাঁদের এলাকার সাপ্তাহিক কাঁঠালের হাটে এবার পাইকারের সংখ্যা খুবই কম, যার সরাসরি প্রভাব পড়েছে বিক্রি ও সরবরাহব্যবস্থায়।
কাঁঠালের পাইকারি ব্যবসায়ী মোজাম্মেল হক প্রতি সপ্তাহে কাঁঠাল কিনে ট্রাকে করে সিলেট ও নোয়াখালীতে পাঠান। তিনি বলেন, এবার আকারভেদে প্রতি ১০০টি কাঁঠাল কিনছেন ১ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার টাকায়। অথচ গত বছর একই সংখ্যক কাঁঠাল কিনতে হয়েছে আড়াই হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা দরে।
আরেক পাইকার আবদুস সাত্তার বলেন, আগে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে অনেক পাইকার কাপাসিয়ায় কাঁঠাল কিনতে আসতেন। এবার সেই সংখ্যা অনেক কমে গেছে। স্থানীয় পাইকাররাই মূলত কিনছেন, তাই দামও কম। তার ওপর প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই এবার কাঁঠাল ফলেছে বলে খুচরা বিক্রিও কমে গেছে।
তবে এই বিপুল উৎপাদনকে সংকট নয়, সম্ভাবনা হিসেবে দেখছেন শিক্ষক ও লেখক মিশকাত রাসেল। তাঁর মতে, কাঁঠালের বহুমুখী ব্যবহার ও রপ্তানি বাড়ানো গেলে গাজীপুরের এই ঐতিহ্যবাহী ফল দেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
মিশকাত রাসেল বলেন, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা গেলে চাষিরা ভালো বাজারমূল্য পেতেন। পাশাপাশি আগাম জাতের কাঁঠাল চিহ্নিত করে চাষ সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া গেলে ফলটি দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে আরও বেশি অবদান রাখতে পারত।
কাপাসিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আউলিয়া খাতুন বলেন, উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন বাজারে কাপাসিয়ার কাঁঠাল রপ্তানি হয়ে থাকে। সম্প্রতি একটি চীনা প্রতিনিধিদলের সঙ্গে বৈঠকে কাপাসিয়ার কাঁঠাল চীনে রপ্তানির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উৎপাদিত কাঁঠালের সংরক্ষণ ও বহুমুখী ব্যবহারের ব্যবস্থা করা গেলে বাজারমূল্য বাড়বে। এ বিষয়ে শিগগিরই প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।