ডিএনএ পরীক্ষায় নিখোঁজ ছয়জনের পরিচয় এক বছরেও মেলেনি

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে এমভি অভিযান-১০ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে মারা যান ৪৭ জন
ফাইল ছবি

ঝালকাঠির সুগন্ধা নদীতে লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিখোঁজ বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার ফজিলা আক্তার ওরফে পপির (২৫) এক বছরেও কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সে সময় পোড়া যাওয়া লাশ ও স্বজনদের ডিএনএ পরীক্ষা হলেও তাঁর সন্ধান পাওয়া যায়নি। এ কারণে মৃত্যুর সনদ না পাওয়ায় ফজিলা আক্তারের কর্মস্থল পোশাক কারখানার বকেয়া পাওনা ও সরকারের ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন স্বজনেরা। শুধু ফজিলা আক্তারই নন, এই নৌ দুর্ঘটনায় সিআইডির ডিএনএ পরীক্ষায় নিখোঁজ ২৩ জনের মধ্যে ছয়জনের পরিচয় এখনো মেলেনি।

নিখোঁজ ফজিলা আক্তার বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার চরদুয়ানী ইউনিয়নের ছোট টেংরা গ্রামের আফজাল হোসেনের মেয়ে। স্বজনেরা দুর্ঘটনার পর এমভি অভিযান-১০ লঞ্চসহ ঝালকাঠি ও বরগুনা সদর হাসপাতালের মর্গে এবং বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খোঁজখবর নিয়েও তাঁর সন্ধান পাননি।

সাত বছর আগে স্বামীর সঙ্গে ফজিলা আক্তারের বিবাহবিচ্ছেদ হয়। একমাত্র মেয়ে লামিয়ার (১১) লেখাপড়া ও জীবিকার তাগিদে সাভারের হেমায়েতপুরের একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন তিনি। গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর ঢাকা থেকে বরগুনাগামী অভিযান-১০ লঞ্চে বরগুনার উদ্দেশে রওনা হন ফজিলা। নিজ কর্মস্থলের পাশে হেমায়েতপুরের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মেয়েকে ভর্তি করানোর জন্য বাবার বাড়ি থেকে মেয়েকে নিতে আসছিলেন তিনি। কিন্তু নদীতে ওই লঞ্চে আগুন লাগে যারে নিখোঁজ হন ফজিলা। দুর্ঘটনার পর স্বজনেরা তাঁকে লঞ্চে, নদী, বিভিন্ন হাসপাতাল ও প্রশাসনের উদ্ধার করা লাশের মধ্যেও খুঁজে পাননি।

আরও পড়ুন

ফজিলা আক্তারের মা আমিনা বেগম বলেন, ‘একমাত্র মেয়ের আয়েই আমাদের সংসার চলত। তাঁর অবর্তমানে নাতনিকে নিয়ে আমরা অসহায় হয়ে পড়েছি। মৃত্যুর সনদ না পাওয়ায় গার্মেন্টসের বকেয়া পাওনা ও ক্ষতিপূরণের টাকাও পাচ্ছি না।’

এ বিষয়ে পাথরঘাটার চরদুয়ানী ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুর রহমান জুয়েল বলেন, ডিএনএ প্রতিবেদনে নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত ফজিলা আক্তার এখনো নিখোঁজ। তাই আইনগতভাবে তাঁর মৃত্যুর সনদ দেওয়া সম্ভব নয়।

গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর বিকেলে ঝালকাঠি সুগন্ধার তীরের পৌর মিনি পার্কে ঢাকা থেকে আসা তিন সদস্যের ফরেনসিক দল, বরিশালের সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট এবং ঝালকাঠি সিআইডির সদস্যরা স্বজনদের নমুনা সংগ্রহ করেন। এ ছাড়া বরগুনা থেকেও নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

ঝালকাঠি সিআইডির পরিদর্শক মো. ফারুক খান বলেন, ঢাকা সিআইডি কার্যালয়ে ডিএনএ পরীক্ষা-নিরীক্ষায় নিখোঁজ ২৩ জনের মধ্যে ১৭ জনের পরিচয় মিলেছে। শনাক্ত না হওয়া ব্যক্তিদের স্বজনদের আবারও নমুনা দিতে হবে।

আরও পড়ুন

গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর দিবাগত রাত ৩টার দিকে বরগুনাগামী এমভি অভিযান-১০ লঞ্চটি ঝালকাঠির সুগন্ধা নদী অতিক্রমকালে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ঘটনার পরের দিন শুক্রবার সকাল থেকে পুলিশ ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের যৌথ দল লঞ্চ থেকে ৩৬ জনের লাশ উদ্ধার করে। পরে সুগন্ধা ও বিষখালী নদী থেকে আরও পাঁচজনের লাশ উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যাওয়া আরও ছয়জনসহ লঞ্চে অগ্নিকাণ্ডে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ৪৭ জনে। এদের মধ্যে ২৩ জনের পরিচয় শনাক্ত না হওয়ায় তাঁদের বরগুনা সদরের পোটকাখালী গ্রামে খাকদোন নদীর তীরবর্তী গণকবরে দাফন করা হয়। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়, বিআইডব্লিউটিএ, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ও ঝালকাঠি জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আলাদা কমিটি গঠন করা হয়।

৩ জানুয়ারি নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন দাখিল করে মন্ত্রণালয়ে। এই প্রতিবেদনে অগ্নিকাণ্ডের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হয়েছে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে ২৫ দফা সুপারিশও করা হয়েছে। যাত্রীবাহী লঞ্চটির মালিকপক্ষের অবহেলা ও গাফিলতিকেও এই দুর্ঘটনার জন্য দায়ী বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।

এ ঘটনায় বরগুনা, ঝালকাঠি ও ঢাকায় তিনটি মামলা হয়েছে। গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর স্বজনহারা ব্যবসায়ী মনির হোসেন বাদী হয়ে ঝালকাঠি থানায় লঞ্চের মালিক হাম জালাল শেখসহ অজ্ঞাতনামা ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। এ বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি মামলাটি ঝালকাঠির আদালত থেকে ঢাকা নৌ আদালতে পাঠানো হয়। সেখানেই মামলাটি বিচারাধীন আছে। তবে এখন পর্যন্ত পুলিশ এ মামলায় আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেনি। এ ঘটনায় লঞ্চের মালিক আটক হলেও জামিনে মুক্তি পান।

মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা উপপরিদর্শক (এসআই) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, মামলার তদন্তকাজ এগিয়ে চলছে। অগ্নিকাণ্ডের প্রকৃত রহস্য উদ্‌ঘাটন করে দোষীদের নামে শিগগিরই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে।