দুই হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়টি চলে সৌরবিদ্যুতে, রয়েছে এসি-কম্পিউটার ও শতাধিক ফ্যান
সকাল আটটা। বিদ্যালয়ের মাঠে শিক্ষার্থীদের কোলাহল। শ্রেণিকক্ষেও চলছে পাঠদানের প্রস্তুতি। কোথাও ফ্যান ঘুরছে, কোথাও কম্পিউটারে চলছে কাজ। আবার বিদ্যালয়টির একটি কক্ষে চালু রয়েছে শীতাতপনিয়ন্ত্রণ যন্ত্র (এসি)। বিদ্যালয়টির এসব বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের প্রায় পুরোটায় চলছে সৌরশক্তি দিয়ে।
সম্প্রতি চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ বৌদ্ধ উচ্চবিদ্যালয়ে (জেবি স্কুল) দেখা যায় এ চিত্র। বিদ্যালয়ের তিনটি ভবনের দুটির ছাদে সৌর প্যানেলের সারি। ১২ কিলোওয়াট ক্ষমতার এই ব্যবস্থা দিয়ে শতাধিক ফ্যান, প্রায় ১২০টি বাতি, একাধিক কম্পিউটারসহ প্রয়োজনীয় বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম চালানো হচ্ছে।
বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তিন বছর আগে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর বিদ্যালয়টিতে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের ভোগান্তি কমেছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিলও আগের মতো দিতে হচ্ছে না। তিন বছর আগে মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হতো। এখন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বিদ্যুতের জন্য খরচ হয়।
মিরসরাই উপজেলা সদর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে জোরারগঞ্জ বাজারের মুহুরী প্রজেক্ট সড়কের পাশে বিদ্যালয়টির অবস্থান। সম্প্রতি বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, প্রশস্ত মাঠ ঘিরে তিনটি পাকা ভবন। এর দুটির ছাদে বসানো সৌর প্যানেল। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবেই শ্রেণিকক্ষে পাঠদান চলছে।
তিন বছর আগে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর বিদ্যালয়টিতে বিদ্যুৎ-বিভ্রাটের ভোগান্তি কমেছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ বিলও আগের মতো দিতে হচ্ছে না। তিন বছর আগে মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হতো। এখন চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা বিদ্যুতের জন্য খরচ হয়।
বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতা তুষার কান্তি বড়ুয়া। তিনিই এ প্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি জানান, মিরসরাইয়ে মানসম্পন্ন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ার লক্ষ্যেই ১৯৮৮ সালে জোরারগঞ্জ বাজারের পাশে তাঁদের পারিবারিক এক একর জায়গায় ‘শিশু কানন’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। অভিভাবকদের অনুরোধ ও এলাকায় শিক্ষার প্রসারে ১৯৯২ সালে সেটি পূর্ণাঙ্গ উচ্চবিদ্যালয়ে রূপ নেয়।
বর্তমানে বিদ্যালয়টিতে শিশু ও মাধ্যমিক মিলিয়ে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। এতে ৫৮ জন শিক্ষক ও ১০ জন কর্মচারী রয়েছেন। শিক্ষার্থী বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যালয়ের ভবন ও শ্রেণিকক্ষও বেড়েছে। এখন শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক মিলনায়তন, বিভিন্ন দাপ্তরিক কক্ষসহ প্রায় ৪৫টি কক্ষে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয়। এসব কক্ষে বৈদ্যুতিক পাখা ও বাতি রয়েছে। প্রধান শিক্ষকের কক্ষে রয়েছে এসি। হিসাবরক্ষণ কক্ষে দুটি কম্পিউটার রয়েছে। এসব সৌরবিদ্যুতেই চলে।
সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকায় গরমেও ক্লাস নিতে কষ্ট হয় না। শিক্ষার্থীরাও স্বস্তিতে পড়াশোনা করতে পারে। চলতি বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে মিরসরাই উপজেলায় সেরা হয়েছে এই বিদ্যালয়।
বিদ্যালয়টির ল্যাবে আটটি কম্পিউটার রয়েছে। ল্যাবে যখন একসঙ্গে অনেক শিক্ষার্থী আসে, তখন সৌরবিদ্যুৎ দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা কঠিন হয়ে যায়। বিদ্যালয়ে থাকা পল্লী বিদ্যুতের সংযোগটিও ব্যবহার করতে হয়। এ ছাড়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে, যখন রোদের আলো থাকে না, তখনো পল্লী বিদ্যুতের সংযোগটি ব্যবহার করা হয়। বর্ষকাল ও শীতকালে পল্লী বিদ্যুতের সংযোগটি বেশি ব্যবহারের প্রয়োজন পড়ে বলে জানান শিক্ষকেরা। এতে মাসে গড়ে পাঁচ হাজার টাকার মতো বিদ্যুৎ বিল খরচ হয়।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তুষার কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘তিন বছর আগে বিদ্যুৎ বিলের চাপ কমানোর চিন্তা থেকেই সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নিই। বিদ্যালয়ের তহবিল থেকে ২৪ লাখ টাকা খরচ করে ঢাকার একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ১২ কিলোওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ব্যবস্থা স্থাপন করা হয়।’
তুষার কান্তি বড়ুয়া বলেন, ‘এখন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার দিন ছাড়া প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ নিরবচ্ছিন্নভাবে পাওয়া যায়। আগে মাসে গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল দিতে হতো। এখন তা পাঁচ হাজার টাকার নিচে নেমে এসেছে। সৌরবিদ্যুৎ না থাকলে বর্তমান হিসাবে মাসে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা বিল দিতে হতো।’
বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক টুইংকেল বড়ুয়া বলেন, ‘সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের পর থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ থাকায় গরমেও ক্লাস নিতে কষ্ট হয় না। শিক্ষার্থীরাও স্বস্তিতে পড়াশোনা করতে পারে। চলতি বছর মাধ্যমিক পরীক্ষার ফলাফলে মিরসরাই উপজেলায় সেরা হয়েছে এই বিদ্যালয়।’
বিদ্যালয়ের এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন মিরসরাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সোমাইয়া আক্তার। তিনি বলেন, সৌরবিদ্যুৎ–ব্যবস্থা সাশ্রয়ী ও স্বস্তির। সরকারও নানা ধরনের প্রণোদনা দিয়ে নবায়নযোগ্য শক্তি ব্যবহারে উৎসাহ দিচ্ছে। জোরারগঞ্জ বৌদ্ধ উচ্চবিদ্যালয় পুরো বিদ্যালয়কে সৌরবিদ্যুতের আওতায় এনে অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বোর্ড পরীক্ষায়ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভালো ফল করছে।