কুড়িগ্রামের চরে যেসব কারণে মা ও শিশুমৃত্যু বেশি
দেশে সার্বিকভাবে অন্তঃসত্ত্বা মা ও শিশুমৃত্যু কমেছে। তবে কুড়িগ্রামের বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে এই চিত্র একটু অন্য রকম।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার চর আইরমারীর গৃহবধূ ছিলেন রুমানা বেগম (২২)। গত বছর এক রাতে ছেলের জন্ম দেন তিনি। এরপর রক্তক্ষরণের সঙ্গে শুরু হয় খিঁচুনি। দুর্গম চর থেকে পরের দিন সকালে নৌকায় করে সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান এই প্রসূতি। এদিকে সদর উপজেলার প্রথম আলো চরের সুলতানা বেগমের বিয়ে হয়েছিল ১৫ বছর বয়সে। বিয়ের বছরখানেক পর সন্তানের জন্ম দেন তিনি। তিন মাসের মধ্যে সেই সন্তান মারা যায়।
এই দুটি ঘটনা কুড়িগ্রামের চার শতাধিক চরে মা ও শিশুমৃত্যুর বিষয়ে একটি ধারণা দেয়। সার্বিকভাবে দেশে মা ও শিশুমৃত্যু পরিস্থিতি ভালো হলেও কুড়িগ্রামের বিচ্ছিন্ন চরগুলোতে এই চিত্র একটু অন্য রকম। সদর উপজেলার ঘোগাদহ ও যাত্রাপুর ইউনিয়ন, নাগেশ্বরী উপজেলার নুনখাওয়া ইউনিয়ন, উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ও সাহেবের আলগা ইউনিয়নের মোট ১২টি চরে ২৫ জুন থেকে ৩১ জুলাই পর্যন্ত মোট ৩৬ দিন ৬০০ মায়ের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। ৩০ মাসে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও সন্তানের জন্মের বিষয়ে কথা বলে জানা যায়, ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ৩০ মাসে সন্তান জন্মদানের সময় ৬ জন মা এবং ৫৯ নবজাতক মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে।
সুলতানার বাল্যবিবাহ, নবজাতকের মৃত্যু
মাত্র ১৫ বছর বয়সে বাল্যবিবাহের শিকার হন সুলতানা বেগম। বছর না যেতেই তিনি অন্তঃসত্ত্বা হন। ছেলের জন্মের পর পরিবারে যে আনন্দের ঝিলিক দেখা গিয়েছিল, সেটা বেশি দিন স্থায়ী হয়নি। তিন মাসের মধ্যেই তাঁর সন্তানটি মারা যায়। পরের দুই বছরে মৃত দুই সন্তানের জন্ম দেন তিনি।
সুলতানা বলেছিলেন, ‘আমার কপাল খারাপ। পরপর তিনটা ছাওয়া পেটে ধরলাম। কিন্তু মা ডাক শুনবার পাইলাম না।’ অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিক বা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গিয়েছিলেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, কমিউনিটি ক্লিনিকে যাননি। তবে সন্তান সুস্থ আছে কি না, জানতে একবার কুড়িগ্রামের একটি বেসরকারি ক্লিনিকে গিয়েছিলেন। সেখানে যাওয়া-আসা ও পরীক্ষা-নিরীক্ষায় অনেক টাকা খরচ হয় বলে আর কখনো যাননি।
পরিসংখ্যান যা বলছে
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) বলছে, ২০২২ সালে দেশে প্রতি ১ লাখ শিশুর জন্ম দিতে গিয়ে ১৫৬ জন প্রসূতি মারা গেছেন। প্রতি হাজার শিশুর জন্মের বিপরীতে ২৫ শিশু (নবজাতকসহ) এক বছর হওয়ার আগেই মারা গেছে।
কুড়িগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের ২০২১ থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত ৩০ মাসে মা ও শিশুর স্বাস্থ্যসেবাসংক্রান্ত পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই সময়কালে কুড়িগ্রামে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে প্রতি লাখে ৪২০ জন মা এবং প্রতি হাজারে ৩৮ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। অর্থাৎ বছরে গড়ে প্রতি লাখে ১৬৮ মা এবং প্রতি হাজারে ১৫ নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে।
৬০০ মায়ের সঙ্গে প্রথম আলো কথা বলে জানতে পারল, কুড়িগ্রামের চরে মা ও শিশুর মৃত্যুহার জাতীয় ও জেলা পর্যায়ের হিসাবের চেয়ে বেশি।
রক্তক্ষরণ-খিঁচুনিতে রুমানার মৃত্যু
রুমানার স্বামীর নাম আলী হোসেন। সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে স্ত্রীর মৃত্যুর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, গত বছরের ১৭ জুলাই দুপুরে রুমানার প্রসবব্যথা ওঠে। তখন আলী হোসেন মাছ ধরতে ব্রহ্মপুত্র নদে ছিলেন। খবর পেয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে তাঁর সন্ধ্যা হয়ে যায়। আশপাশে চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। রাতে সদর হাসপাতালে নেওয়ার মতো কায়দা করতে পারেননি। পল্লিচিকিৎসকের চিকিৎসা আর স্থানীয় ধাত্রীর (দাইমা) সহায়তায় গভীর রাতে ছেলের জন্ম দেন রুমানা। কিন্তু এর পর থেকে তাঁর রক্তক্ষরণ ও খিঁচুনি শুরু হয়। রাত পেরিয়ে দিনের আলো ফুটতে শুরু করলে তাঁকে নিয়ে নৌকায় করে হাসপাতালে রওনা হন পরিবারের লোকজন। কিছু পথ পাড়ি দিতেই রুমানার মৃত্যু হয়।
চোখের সামনে স্ত্রীর মৃত্যুর কথা ভুলতে পারেননি আলী হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমাগো চর থ্যাইকা এক ঘণ্টা নৌকায় গেলে জাহাজের আলগার চরে একটা কমিউনিটি ক্লিনিক আছে। দরকারের সময় লোক পাওয়া যায় না। পোয়াতি (অন্তঃসত্ত্বা) মানুষের সমস্যা তো বইল্যা কইয়া আসে না। শহরের হাসপাতালে যাওনে সময় তিন ঘণ্টার বেশি লাগে। খরচও ম্যালা।’
ভরসা দাইমায়ের ওপর
৬০০ নারীর সঙ্গে কথা বলার সময় জানতে চাওয়া হয়েছিল, অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও প্রসবকালের সেবা কোথা থেকে নেন চরের
মানুষ। এর উত্তরে পাওয়া তথ্যে দেখা গেছে, চরের একটি বড় অংশ নারীর গর্ভকালীন স্বাস্থ্যসেবার বিষয়ে সচেতন নয়। কোথায় গেলে এই সেবা পাবেন, সেই ধারণাও তাঁদের কম। কমিউনিটি ক্লিনিক যে এই সেবা দেয়, সেটি তাঁদের অজানা। আবার যাঁরা কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিতে যান, তাঁদের অনেকেই বলেছেন, পর্যাপ্ত জনবল ও স্বাস্থ্যসেবাসামগ্রীর ঘাটতি আছে।
ফলে চরের অন্তঃসত্ত্বা নারীরা দাইমায়ের ওপর ভরসা করেন। এমন এক দাইমা উলিপুর উপজেলার চর আইরমারীর আনোয়ারা বেগম। তিনি বলেন, তিনি তাঁর ফুফুর কাছ থেকে এই কাজ শিখেছেন। আনোয়ারার যখন বয়স ৪০, তখন ফুফু তাঁকে নিয়ে যেতেন। দেখে দেখে তিনি শিখেছেন। আনোয়ারা বলেন, ‘আমাগো চরের দেশে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কোনো ডাক্তার নাই, দাইমাও নাই। আমার ফুফু প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত দাইমা ছিলেন। তাঁর কাছেই শিখছি।’
প্রতি ছয় হাজার মানুষের জন্য একটি করে কমিউনিটি ক্লিনিক থাকার কথা। কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের জনসংখ্যা অনুযায়ী কমিউনিটি ক্লিনিক থাকার কথা ৮৩টি। এর বিপরীতে আছে ৫০টি। কমিউনিটি ক্লিনিক থাকলেও সেবা সম্পর্কে স্থানীয় মানুষের ধারণা কম থাকায় আগ্রহ কম, জনবল ঘাটতির পাশাপাশি আছে নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে যাতায়াতের অসুবিধা।
সিভিল সার্জন মো. মঞ্জুর-এ মুর্শেদ অবশ্য দাই দিয়ে বাসায় সন্তান জন্মদানের চেষ্টার বদলে কোনো প্রতিষ্ঠানের সেবা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এখন কমিউনিটি ক্লিনিকেই স্বাভাবিকভাবে সন্তান প্রসব হয়। কমিউনিটি ক্লিনিকে আমাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত লোক আছেন।’ তবে চরের অসচেতন মানুষের সচেতনতা কীভাবে বাড়ানো যায় কিংবা তাঁদের কীভাবে স্বাস্থ্যসেবা নিতে কমিউনিটি ক্লিনিকে আসতে উদ্বুদ্ধ করা যায়, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।