পুরোনো বছর বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে পাহাড়ে এখন চলছে সাজ সাজ রব। উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে নানা আয়োজন। বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু ও চাংক্রান উৎসব ঘিরে পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত পাহাড়িরা মিলিত হচ্ছে মিলনমেলায়। প্রাণের এই উৎসবে রং লেগেছে সব বয়সের মানুষের মনে।
আগামীকাল বুধবার থেকে শুরু হচ্ছে পাহাড়িদের প্রধান এই সামাজিক উৎসব। এই উৎসব ঘিরে সব সম্প্রদায়ের কৃষ্টি, ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধন ঘটছে। তাই এই উৎসবকে প্রাণের উৎসব হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। এক সপ্তাহ আগে থেকে জেলা শহর, পাড়া ও গ্রামে নানা আয়োজন শুরু হয়েছে। বাংলার পুরোনো বছর বিদায় ও নতুন বছরকে বরণ করতে উৎসবে মেতে উঠছেন প্রতিটি সম্প্রদায়ের মানুষ।
সম্প্রদায়ভেদে উৎসবকে চাকমারা বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসু বা বৈসুক, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, অহমিয়ারা বিহু এবং চাক, ম্রো, বম, খুমিরা চাংক্রান নামে পালন করেন। সমতলের লোকজনের কাছে এই উৎসব বৈসাবি নামে পরিচিত। বৈসুর বৈ, সাংগ্রাইয়ের সা ও বিজুর বি থেকে বৈসাবি শব্দের উৎপত্তি।
তবে ‘বৈসাবি’ শব্দে অন্য সম্প্রদায়ের জনগোষ্ঠীর উৎসবের কথা উঠে আসে না। ফলে পাহাড়ি সামাজিক সংগঠনগুলো সব জনগোষ্ঠীর নামে মেলা কিংবা উৎসব আয়োজন করে যাচ্ছে। পার্বত্য অঞ্চল আদিবাসী ফোরামের সভাপতি প্রকৃতি রঞ্জন চাকমা বলছিলেন, ‘আমরা বৈসাবি শব্দটি এখন আর ব্যবহার করি না। কারণ, সেখানে শুধু পাহাড়ে তিন সম্প্রদায়ের উৎসবের কথা উঠে আসে। উৎসবের মধ্যে পার্বত্য অঞ্চলের যেন সব সম্প্রদায়ের কথা আসে, সেই ব্যবস্থা করা হয়। পাহাড়ে বসবাসরত বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, কৃষ্টি ধরে রাখার জন্য উৎসব আয়োজন করে থাকি।’
৩ এপ্রিল থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত রাঙামাটি সাংস্কৃতি ইনস্টিটিউটের উদ্যোগে ও জেলা পরিষদের সহযোগিতায় রাঙামাটিতে বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু ও বিহু মেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্প করপোরেশনের (বিসিক) উদ্যোগে ৮ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত মেলা আয়োজন করা হয়।
অন্যদিকে গতকাল সোমবার থেকে বুধবার (১০ থেকে ১২ এপ্রিল) পর্যন্ত বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, বিহু ও চাংক্রান উৎসব আয়োজন করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম আদিবাসী ফোরাম প্রতিবছর এই উৎসব পালন করে আসছে। গতকাল উৎসবের উদ্বোধনী আলোচনা ও শোভাযাত্রায় পাহাড়ি ঐতিহ্যবাহী পোশাক পড়ে অংশ নেন পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের চেয়ারম্যান জ্যোতিরিন্দ্র বোধিপ্রিয় লারমা (সন্তু লারমা)। জেলার বিভিন্ন উপজেলা শহর, গ্রাম এবং খাগড়াছড়ি-বান্দরবানেও এই উৎসব চলছে।
বুধবার চাকমা সম্প্রদায়ের ফুল ভাসানোর মধ্যদিয়ে মূল উৎসব শুরু হবে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য জনগোষ্ঠীর উৎসবও হবে। চাকমাদের মূল উৎসব চলবে তিন দিন। তবে সম্প্রদায়ভেদে তিন থেকে সাত দিন ধরে উৎসব হয়। ইতিমধ্যে পার্বত্য চট্টগ্রামজুড়ে উৎসবের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে।
চাকমাদের বিজুর প্রথম দিনের আনুষ্ঠানিকতায় থাকে খাল, নদী, হ্রদে ফুল ভাসানো। দ্বিতীয় দিন মূল বিজুতে অতিথি আপ্যায়ন ও খানাপিনা। তৃতীয় দিন বিভিন্ন ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পূজা–অর্চনা করা হবে। ১৩ এপ্রিল ত্রিপুরাদের তিন দিনব্যাপী বৈসু উৎসব শুরু হবে। উৎসবের প্রথম দিনে পূজা–অর্চনা ও বাড়িঘর সাজানো-পরিষ্কার করা হয়। দ্বিতীয় দিনে অতিথি আপ্যায়ন ও খানাপিনা। তৃতীয় দিনে হাঁস-মুরগি ও পশুপাখিদের খাবার দেওয়া, গরাইয়া নৃত্য ও বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হয়ে থাকে।
১৪ এপ্রিল এলাকাভেদে মারমাদের সাংগ্রাই উৎসব শুরু হবে। প্রথম দিনে ঘরবাড়ি সাজানো ও ফুল ভাসানো হবে। মারমাদের মতো ম্রো, খুমি, বম ও খিয়াংসহ অন্যান্য জনগোষ্ঠীর উৎসব হবে একই সময়ে। ম্রোরা শনিবার ফুল সংগ্রহ করবে। ওই দিন ছড়া থেকে মাছ-চিংড়ি ধরে উৎসব আয়োজন করা হয়। পরে খানাপিনা-অতিথি আপ্যায়ন, পূজা–অর্চনা দল পিঠা তৈরি উৎসব আয়োজন করে এসব সম্প্রদায়। পাহাড়ি লোকজন পুরোনো বছরের সব দুঃখ, কষ্ট-গ্লানি মুছে ও নতুন বছরজুড়ে সুখ-শান্তি আনন্দে যেন থাকতে পারা যায়, সে জন্য এই উৎসব আয়োজন করা হয়।
ত্রিপুরা উৎসবের বিষয়ে বাঘাইছড়ি উপজেলা হেডম্যান ও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য জৈপুই থাং ত্রিপুরা প্রথম আলোক বলেন, ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের আগামী বৃহস্পতিবার থেকে উৎসব শুরু হবে। তিন দিনের উৎসবে থাকছে ঘর সাজানো, খাবারের আয়োজন, গরাইয়া নৃত্য ও বয়োজ্যেষ্ঠদের কাছ থেকে আর্শিবাদ নেওয়া।
পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও বান্দরবান সদর উপজেলার টংগাবতী ইউনিয়নের চিনিপাড়া গ্রামের কাইংওয়াই ম্রো বলেন, ‘আমাদের ১৩ এপ্রিল থেকে উৎসব শুরু হবে। সেই দিন তরুণ-তরুণীরা দলবেঁধে বন থেকে ফুল সংগ্রহ করে ঘর সাজাবেন। পরের দিন খানাপিনা ও অতিথি আপ্যায়ন।’
শিক্ষাবিদ ও গবেষক মংসানু চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, চাকমা সম্প্রদায়ের উৎসব যেদিন শেষ হবে, সেই দিনে মারমাদের উৎসব শুরু হয়। মারমাদের সাংগ্রাই উৎসবের প্রথম দিনে পূজা–অর্চনা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের গোসল করানো এবং ফুল দিয়ে ঘরবাড়ি সাজানো হয়। দ্বিতীয় দিনে খানাপিনা ও অতিথি আপ্যায়ন। এলাকাভেদে তৃতীয় দিনে পানি উৎসব আয়োজন করা হয়। তবে ৭০ দশকের দিকে পানি উৎসব এমন ছিল না। তখন নতুন বছরে পরিশুদ্ধ হওয়ার জন্য একে অন্যের মধ্যে জামপাতা দিয়ে পানি ছিটানো উৎসব করা হতো।