সাঁওতাল ভাষার প্রথম স্কুল
পরী টুডুর পাঠশালা বন্ধ
১৯৯৯ সালের ২০ মার্চ বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়েছিল। ২০০৫ সালের পর এর কার্যক্রম থেকে যায়।
‘আলে আড়া চালা মে দুমুর/ দুডুম মিয়ঞ গানডোরে/ বাসিকেয়া ইঞ আচোমে/ মুহুর হাড়োবেয়া ডাকেন’—সাঁওতাল ভাষার এই ছড়ার বাংলা অর্থ ‘আমার বাড়ি যাইও ভ্রমর/ বসতে দেব পিঁড়ে/ জলপান যে করতে দেব/ শালি ধানের চিড়ে’।
২৩ বছর আগের কথা। রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার বর্ষাপাড়া গ্রামের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় কানে ভেসে আসত সাঁওতাল ভাষার এই ছড়া। এটি ছিল সাঁওতাল ভাষায় দেশের প্রথম স্কুল ‘পরী টুডুর পাঠশালা’। এখন ওই গ্রামের শিশুরা আর সেই ছাড়া কাটে না। পাঠশালাটির অবকাঠামো রয়েছে। তবে পাঠদান বন্ধ হয়ে গেছে। সেই পাঠশালাতেই শিক্ষক পরী টুডুর নিঃসঙ্গ জীবন কাটছে। রাতদিন তিনি সেখানেই থাকেন। বর্তমানে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ।
মাতৃভাষায় সাঁওতাল শিশুদের শিক্ষার উদ্দেশ্যে রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের বর্ষাপাড়া গ্রামে ১৯৯৯ সালের ২০ মার্চ বিদ্যালয়টি স্থাপন করা হয়েছিল। জাতীয় আদিবাসী পরিষদের গ্রামীণ ট্রাস্ট এটির পরিচালনায় ছিল।
সাঁওতাল ভাষার দেশের প্রথম স্কুলের শিক্ষক ছিলেন পরী টুডুসহ তিনজন। প্রথম তিন বছর জাতীয় আদিবাসী পরিষদের গ্রামীণ ট্রাস্টের অধীনে থাকার সময় পরী টুডুকে মাসে ৬০০ টাকা করে ভাতা দেওয়া হতো। পরে গণস্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্ব নেয়। তখন তাঁদের তিনজনকে মোট ১ হাজার ২০০ টাকা করে দেওয়া হতো। গ্রামীণ ট্রাস্ট এই প্রকল্পের গবেষক হিসেবে জাতীয় আদিবাসী পরিষদের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক রবীন্দ্রনাথ সরেনকে নিয়োগ করা হয়। তিনি প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য সাঁওতাল ভাষায় রচনা করেন ‘গিদরীকোয়া: পীহিল পুথি’। পাণ্ডুলিপিটির পাঠযোগ্যতা যাচাই করার জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাঁওতাল সাহিত্যিক বীরেন্দ্রনাথ বাস্কের কাছে নিয়ে যান রাজশাহী সদর আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা। সেখানে পাণ্ডুলিপিটির প্রয়োজনীয় সংশোধন ও সংযোজন করা হয়। যাত্রা শুরু হয় দেশের সাঁওতাল ভাষার প্রথম স্কুলের।
২০০৪ সালে আদিবাসী সাংস্কৃতিক উৎসবে যোগ দিতে মুম্বাই যান পরী টুডু। তাঁদের কার্যক্রম নিয়ে দেশের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল এবং বিবিসির টেলিভিশনও খবর প্রচার করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৫ সালের ১৫ জুলাই প্রথম আলোর সাপ্তাহিক আয়োজন ‘অন্য আলো’য় ‘সাঁওতাল ভাষায় দেশের প্রথম স্কুল/পরী টুডুর পাঠশালা’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই সময় পরী টুডু জানিয়েছিলেন, এই পাঠশালা প্রতিষ্ঠার আগে বাংলা ভাষার বই পড়তে গিয়ে সাঁওতাল শিশুদের এক বছরের পড়া শেষ করতে তিন-চার বছর লেগে যেত। অনেকেই পড়তে না পেরে পড়া ছেড়ে দিত। মাতৃভাষায় পড়ার সুযোগ পাওয়ার পরে শিক্ষার্থীরা আর ঝরে পড়ছে না। তার পাঠশালায় প্রায় শতভাগ উপস্থিতি থাকে। তখন ছাত্রছাত্রীর সংখ্যা ছিল ১০১ জন।
২০০৫ সালের পর কোনো একসময় এই আয়োজন থেমে যায়। গ্রামীণ ট্রাস্টের পরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রও পাঠশালার দায়িত্ব ছেড়ে দেয়। গ্রামের সাঁওতাল ভাষার প্রথম শিক্ষিত নারী পরী টুডুকে একপর্যায়ে পরিবার থেকে বিয়ে দেওয়া হয়। তবে স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হয়নি। তাঁর সন্তানদের নিয়ে যান স্বামী।
এরপর পরী টুডুর জীবনে নেমে আসে অন্ধকার অধ্যায়। একাই পাঠশালায় বসে বসে তার দিন কাটে। তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ভাইয়ের সংসার থেকে তাঁর খাবার আসে।
জাতীয় আদিবাসী পরিষদের বর্তমান সভাপতি রবীন্দ্রনাথ সরেন বললেন, গ্রামীণ ট্রাস্টের অর্থায়নে ওই স্কুলটা চলত। পরে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র দায়িত্ব নিয়েছিল। তারাও পরে অর্থায়ন বন্ধ করে দিলে পরী টুডু আর পাঠশালাটি চালাতে পারেননি। স্বামী–সন্তানদের কেড়ে নিয়ে যান। তারপর একা একা থাকতে থাকতে মানসিক ভারসম্য হারিয়ে ফেলেন।
সম্প্রতি বর্ষাপাড়া গ্রামে গিয়ে পরী টুডুকে পাওয়া যায়। তিনি কথা বলতে চান না। পাঁচটা প্রশ্ন করলে একটার উত্তর দেন। স্কুলের ব্যাপারে শুধু বলেন, ‘আমি তো চালাতেই চাই। কেউ তো সহায্য করে না। সব তো পড়েই আছে।’