চট্টগ্রাম নগরের যানজট নিরসনে এ মুহূর্তে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে মেট্রোরেল কিংবা মনোরেল নির্মাণের প্রয়োজন নেই। এর পরিবর্তে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক বাস–ব্যবস্থা, বাস রুট পুনর্বিন্যাস (রুট র্যাশনালাইজেশন) এবং বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালুই হবে অধিক কার্যকর ও অর্থনৈতিকভাবে টেকসই সমাধান।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) প্রণীত খসড়া ট্রাফিক ও পরিবহন মহাপরিকল্পনায় এই সুপারিশ করা হয়েছে। মতামত, আপত্তি ও পরামর্শের জন্য এই খসড়া মহাপরিকল্পনা সম্প্রতি সবার জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে। ৬০ দিন এই খসড়া মহাপরিকল্পনার বিষয়ে মতামত নেওয়া হবে। এরপর ২৫ বছর মেয়াদি (২০২৫ থেকে ২০৫০) মহাপরিকল্পনা চূড়ান্ত করার কথা রয়েছে।
অতীতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নতি না করে ব্যয়বহুল উড়ালসড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সমালোচনা করা হয়েছে মহাপরিকল্পনায়। এতে বলা হয়, এসব অবকাঠামো নির্মাণে হাজার হাজার কোটি টাকা যেমন ব্যয় হয়েছে, তেমনি নিচের সড়ক সংকুচিত হয়েছে।
এবারের মহাপরিকল্পনায় বিপুল ব্যয়ের উড়ালসড়ক, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, মেট্রোরেল ও মনোরেলের চেয়ে সড়ক ব্যবস্থাপনা, গণপরিবহন ও পথচারীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণকে বেশি অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। কেননা মেট্রোরেল চালুর জন্য যে পরিমাণ যাত্রী দরকার, তা ২০৫০ সালের মধ্যে হওয়ার সম্ভাবনা নেই।
খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে এ মুহূর্তে মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা নেই। কেননা মেট্রোরেলের জন্য প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিকে অন্তত ১৮ হাজার যাত্রীর চাহিদা থাকতে হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামে এত যাত্রী নেই।
প্রকল্প পরিচালক ও উপপ্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আবু ঈসা আনছারী প্রথম আলোকে বলেন, চট্টগ্রামের জন্য প্রণয়ন করা নতুন ট্রাফিক ও পরিবহন মহাপরিকল্পনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে বন্দর নগর চট্টগ্রামের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদা মেটাতে একটি সমন্বিত, নিরাপদ ও পরিবেশবান্ধব যাতায়াতব্যবস্থা গড়ে তোলা। এতে যানজট ও দুর্বল অবকাঠামোর মতো সমস্যাগুলো দূর করতে স্মার্ট ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট, গণপরিবহনের আধুনিকায়ন, নৌপথ ও রেলপথের উন্নয়নে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মেট্রোরেলের বদলে ৭০০ আধুনিক বাস
চট্টগ্রাম নগরে মেট্রোরেল নির্মাণের প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাইসহ পরিবহন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে ৭০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্পের কাজ চলমান রয়েছে। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর পরিবহন মাস্টারপ্ল্যানসহ মেট্রোরেলের সমীক্ষার প্রিলিমিনারি সার্ভে কাজসংক্রান্ত’ শীর্ষক এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে। এতে অর্থায়ন করছে কোরিয়া ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (কোইকা)।
বিগত আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় অপরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উন্নয়নের নামে নগরকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক কিছু করা হয়েছে। তবে এখন এ শহরকে নান্দনিক ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।বেলায়েত হোসেন, চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)
প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চললেও এ মুহূর্তে চট্টগ্রামে মেট্রোরেল প্রয়োজন নেই বলে খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে। তার পরিবর্তে বাস–ব্যবস্থার আধুনিকায়নে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, চট্টগ্রামে এ মুহূর্তে মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা নেই। কেননা মেট্রোরেলের জন্য প্রতি ঘণ্টায় প্রতি দিকে অন্তত ১৮ হাজার যাত্রীর চাহিদা থাকতে হয়। বর্তমানে চট্টগ্রামে এত যাত্রী নেই। ২০১৬ সালে বিশ্বব্যাংকের উদ্যোগে ‘চট্টগ্রাম নগরের কৌশলগত পরিবহন মহাপরিকল্পনা’র সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০৫০ সাল পর্যন্ত এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব হবে না। তাই মেট্রোরেল আপাতত অলাভজনক হতে পারে। একই মত দিয়েছেন মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারাও।
যাত্রীচাহিদা না থাকা ছাড়াও মেট্রোরেল, মনোরেল অত্যন্ত ব্যয়বহুল প্রকল্প বলে মত দেওয়া হয়েছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়। এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে ২৫ থেকে ৩০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন। এই বিপুল ব্যয়ের কারণে মেট্রোরেল-মনোরেলের ভাড়া অনেক বেশি হবে। যাত্রীরা তা দিতে আগ্রহী হবেন না। তাই প্রকল্পের খরচ তুলে আনা কঠিন হবে।
এ ছাড়া কারিগরি কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম নগরের প্রধান সড়কগুলো বিশেষ করে সিডিএ অ্যাভিনিউ, বিমানবন্দর সড়কে উড়ালসড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। মূল সড়কগুলোর বিদ্যমান অবস্থায় মেট্রোরেল নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব। ভূগর্ভস্থ মেট্রোরেল নির্মাণ করা সম্ভব হলেও তা হবে অত্যন্ত ব্যয়বহুল, যা অর্থনৈতিকভাবে টেকসই হবে না। এ ছাড়া মেট্রোরেল বাস্তবায়ন সময়সাপেক্ষ ও জটিল প্রক্রিয়া।
তবে চট্টগ্রামে মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা আছে নাকি নেই—তাই এ মুহূর্তে বলা সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন ‘চট্টগ্রাম মহানগরীর পরিবহন মাস্টারপ্ল্যানসহ মেট্রোরেলের সমীক্ষার প্রিলিমিনারি সার্ভে কাজসংক্রান্ত’ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক মীর মোহাম্মদ কামরুল হাসান।
ডিটিসিএর এই কর্মকর্তা মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, কোরিয়ার পরামর্শক প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রামের জন্য পরিবহন মহাপরিকল্পনার খসড়া জমা দিয়েছে। এখন তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এরপর চলতি মাসের শেষের দিকে মেট্রোরেলের প্রাক্-সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য জরিপ কার্যক্রম শুরু হবে। জরিপ প্রতিবেদন পাওয়ার পর মেট্রোরেলের সম্ভাব্য নির্মাণ ব্যয় ও আয়ের তুলনা বিশ্লেষণ করে বোঝা যাবে চট্টগ্রামে মেট্রোরেল করা যাবে কি যাবে না। এর আগে এ মুহূর্তে প্রয়োজন নেই—তা বলা যাবে না।
খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের পরিবর্তে একটি সমন্বিত ‘বাস কোম্পানি’ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) চালু করলে সড়কে বর্তমান যে বিশৃঙ্খলা রয়েছে তা দূর হবে। এ জন্য প্রয়োজন ৭০০টি আধুনিক মানের বাস। বর্তমানে ১ হাজার ১০০ বাস চললেও এর বেশির ভাগ মানসম্মত নয়। এগুলোর যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাব রয়েছে এবং যানজট ও বায়ুদূষণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। নতুন বাস নামানো হলে লক্কড়ঝক্কড় বাসগুলোও তুলে দেওয়া হবে।
পুরো বাসসেবার আধুনিকায়নে খরচ হবে প্রায় আড়াই থেকে তিন হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে নতুন বাস, বাস টার্মিনাল, ডিপো, বাস বে এবং বাস স্টপের নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এ ছাড়া পুরো ব্যবস্থাকে কার্যকর ও নিরাপদ করতে ট্রাফিক ও পার্কিং ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে আরও ৩০০ থেকে ৫০০ কোটি টাকা প্রয়োজন। এই ব্যয়ের মধ্যে আধুনিক ট্রাফিক সংকেত, বহুতল বা নির্ধারিত পার্কিং ভবন ও পার্কিং লট নির্মাণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বাস রুট র্যাশনালাইজেশনের (বাস রুট পুনর্বিন্যাস) মাধ্যমে ২০৫০ সালের যাতায়াত চাহিদা মেটানো সম্ভব বলে খসড়া মহাপরিকল্পনায় মতামত দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ এই ব্যবস্থা আর্থিকভাবে অধিক টেকসই ও কার্যকর সমাধান।
এদিকে বিআরটি ব্যবস্থাকে মেট্রোরেলের তুলনায় অধিকতর সাশ্রয়ী ও উপযোগী উল্লেখ করা হয়েছে খসড়া মহাপরিকল্পনায়। বিআরটি চালুর ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য লাল, সবুজ ও নীল করিডর চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে সিডিএ অ্যাভিনিউ ও আরাকান সড়কে বাসের জন্য আলাদা সুনির্দিষ্ট লেন রাখার অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। বলা হয়, বিআরটি বা উন্নত বাস–ব্যবস্থা চট্টগ্রাম নগরের জন্য অনেক বেশি কার্যকর এবং স্থানীয় অবকাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। আর এই প্রক্রিয়া মেট্রোরেলের তুলনায় দ্রুত বাস্তবায়নযোগ্য এবং ভাড়াও সাধারণ মানুষের নাগালে থাকবে।
বাস–ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আনতে বিদ্যমান বাস অপারেটরদের একীভূত করে এক বা একাধিক কোম্পানি গঠন করবে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। এই কোম্পানিগুলো সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব (পিপিপি) আওতায় পরিচালিত হবে। সরকারি তদারকি থাকবে এবং বেসরকারি খাত আর্থিক ও পরিচালনা করবে।
উড়ালসড়ক-এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের সমালোচনা
খসড়া মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, অতীতে নতুন সড়ক বা সমন্বিত যাতায়াতব্যবস্থার বদলে উড়ালসড়ক-এক্সপ্রেসওয়ের মতো দৃশ্যমান প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। বহদ্দারহাট, মুরাদপুর, দেওয়ানহাট, বিমানবন্দর সড়কে এসব উড়ালসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়। বিপুল ব্যয়ে নির্মিত এসব অবকাঠামো নগরের সড়ক নেটওয়ার্ককে অসম্পূর্ণ ও বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
ট্রাফিক জট নিরসনের ক্ষেত্রে ফ্লাইওভার বা এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণকে ‘ব্যয়বহুল’ সমাধান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত ১৩ বছরে চট্টগ্রাম নগরে তিনটি উড়ালসড়ক এবং একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে ৫ হাজার ১৯৬ কোটি টাকা ব্যয় করেছে সিডিএ। এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরেও বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতি শহরের একটি ছিল চট্টগ্রাম।
২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ব্যুরো অব ইকোনমিক রিসার্চের প্রকাশিত একটি গবেষণা প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বের সবচেয়ে ধীরগতি শহরের প্রথমে ছিল ঢাকা। চট্টগ্রামের অবস্থান ছিল ১২তম। ১৫২টি দেশের ১ হাজার ২০০টির বেশি শহরে যান চলাচলের গতি বিশ্লেষণে করা এই তালিকা করা হয়েছিল।
উড়ালসড়ক-এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণে সিডিএর সমালোচনা করে মহাপরিকল্পনায় বলা হয়েছে, যানজট কমানোর প্রথম পদক্ষেপ হওয়া উচিত ছিল ট্রাফিক সিগন্যাল উন্নত করা এবং আইন কার্যকর করা। কিন্তু তা না করে উড়ালসড়ক ও এক্সপ্রেসওয়ে করা হয়েছে। উড়ালসড়কের পিলার বা র্যাম্পের কারণে নিচের রাস্তা সংকুচিত হয়েছে। যেমন আরাকান সড়কে উড়ালসড়কের পিলারের কারণে রাস্তা সরু হয়ে গেছে এবং বায়েজিদ বোস্তামী সড়কে উড়ালসড়কের র্যাম্পের কারণে জায়গার স্বল্পতা তৈরি হয়েছে। এ ছাড়া ইপিজেড ও বন্দরকেন্দ্রিক ট্রাফিক শহর এড়িয়ে চলাচলের জন্য এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। এটি সংযোগ উন্নত করলেও গণপরিবহন ও পথচারী সুবিধার অভাব এখনো রয়ে গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব অবকাঠামোর কারণে নগরের প্রধান করিডরগুলোতে মেট্রোরেল নির্মাণ করা প্রায় অসম্ভব বা প্রযুক্তিগতভাবে অত্যন্ত জটিল হয়ে পড়েছে। উড়ালসড়ক-এক্সপ্রেসওয়ের পরিবর্তে গুরুত্বপূর্ণ মোড়ের উন্নয়ন বা পার্কিং ব্যবস্থাপনা অনেক বেশি সাশ্রয়ী ও কার্যকর পদ্ধতি।
সিডিএ চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন বলেন, ‘বিগত আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনের সময় অপরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে চট্টগ্রাম নগরকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। উন্নয়নের নামে নগরকে ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক কিছু করা হয়েছে। তবে এখন এ শহরকে নান্দনিক ও সবুজ নগর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। বর্তমানে চট্টগ্রামের সব সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয় আছে।’
শহরে আরও পাঁচ বাস টার্মিনালের প্রস্তাব
চট্টগ্রাম ট্রাফিক ও পরিবহন মহাপরিকল্পনা (২০২৫-২০৫০) অনুযায়ী, যাত্রীসেবা উন্নত করতে ও যাতায়াতব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করতে শহরের ভেতরে নতুন পাঁচটি বাস টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে। প্রস্তাবিত নতুন বাস টার্মিনালগুলোর মধ্যে রয়েছে কালুরঘাট, শাহ আমানত সেতু, নিউমার্কেট, পতেঙ্গা ও কুলগাঁও। তবে কুলগাঁও এলাকায় নতুন বাস টার্মিনালের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এর কাজ দ্রুত শেষ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। নগরের কালুরঘাট ও শাহ আমানত সেতু এলাকা হচ্ছে শহরের প্রবেশদ্বার।
পর্যটন এলাকা হওয়ায় পতেঙ্গায় প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ গাড়ি আসে। এ ছাড়া টানেলের কারণেও চাপ বেড়েছে। তাই এখানে বাস টার্মিনালের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া নিউমার্কেট বাণিজ্যিক এলাকা হওয়ায় এখানে টার্মিনাল করা হলে যানজট কমবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে মহাপরিকল্পনায়।
নতুন টার্মিনাল নির্মাণের পাশাপাশি কদমতলী, বহদ্দারহাট ও হাটহাজারী বাস টার্মিনালগুলোকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসহ উন্নত করার কথা বলা হয়েছে। নতুন টার্মিনালগুলো এমনভাবে নকশা করতে হবে, যাতে যাত্রীরা সহজেই এক বাহন থেকে অন্য বাহনে (যেমন বাস থেকে সিএনজি বা টেম্পো) পরিবর্তন করতে পারেন। এই টার্মিনালগুলো নির্মাণ ও উন্নয়নের মূল দায়িত্বে থাকবে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। ইন্টেলিজেন্ট ট্রান্সপোর্ট সিস্টেম ব্যবহারের মাধ্যমে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন নিয়ন্ত্রণ, স্মার্ট পার্কিং সেন্সর এবং রিয়েল-টাইম তথ্যের মাধ্যমে যানজট কমানোর পদক্ষেপ নিতে হবে।
রেলপথের আধুনিকায়নের ব্যাপারে বর্তমান রেললাইন ব্যবহার করে শহরের ভেতরে (ষোলশহর থেকে পতেঙ্গা ও কালুরঘাট) ‘আরবান রেল’ এবং শহর থেকে উপজেলাগুলোতে (সীতাকুণ্ড, হাটহাজারী, পটিয়া) নিয়মিত ‘কমিউটার রেল’ সার্ভিস চালু করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে মহাপরিকল্পনায়। নগরের শাহ আমানত বিমানবন্দর থেকে শহরের মূল কেন্দ্রে (জিইসি, মুরাদপুর) যাতায়াতের জন্য বিশেষ ‘এয়ারপোর্ট শাটল বাস’ চালু করতে বলা হয়েছে। কর্ণফুলী নদীতে ওয়াটার বাস সার্ভিস এবং ঘাটগুলোর টার্মিনাল সুবিধা উন্নত করার কথাও রয়েছে।
খসড়ায় বলা হয়েছে, বে-টার্মিনাল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরের কারণে পণ্যবাহী যানবাহনের চাপ বাড়বে। এই চাপ সামলাতে আলাদা ‘ডেডিকেটেড ফ্রেইট রুট’ বা পণ্যবাহী রাস্তার নেটওয়ার্ক তৈরি করতে হবে। সীতাকুণ্ড, আনোয়ারা ও কর্ণফুলী এলাকায় ১০ হাজার ট্রাক ধারণক্ষমতাসম্পন্ন টার্মিনাল নির্মাণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
কোন মেয়াদে কী করতে হবে
মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে তিনটি মেয়াদ ধরা হয়েছে। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘ মেয়াদে বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। ২০২৫ থেকে ২০৩০ হচ্ছে স্বল্প মেয়াদ। এ সময় পথচারীদের জন্য ১৪০ কিলোমিটার নতুন ফুটপাত নির্মাণ করতে হবে। পথচারীদের পারাপারের জন্য ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা স্থাপন করতে হবে। এ ছাড়া গণপরিবহনব্যবস্থার আধুনিকায়নে চট্টগ্রাম আরবান ট্রানজিট কোম্পানি গঠন করা এবং বর্তমানের বিশৃঙ্খল বাস সার্ভিসকে একটি নির্দিষ্ট কোম্পানির অধীনে আনার আইনি ও প্রশাসনিক কাঠামো তৈরি করার কথা বলা হয়েছে । এ ছাড়া রয়েছে বাসের রুটগুলোকে পুনর্বিন্যাস, স্কুলশিক্ষার্থী ও পর্যটকদের জন্য আলাদা বাসের ব্যবস্থার কথা।
মহাপরিকল্পনার খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, নগরের গুরুত্বপূর্ণ রেল ক্রসিংগুলোতে পদচারী–সেতু নির্মাণ করা হবে। ষোলশহর থেকে জানালিহাট পর্যন্ত ৮ দশমিক ১৯ কিলোমিটার এবং ষোলশহর থেকে হাটহাজারী পর্যন্ত ৩৬ দশমিক ৬ কিলোমিটার রেললাইনকে দুই লেনে উন্নীত করা হবে। কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে পতেঙ্গা পর্যন্ত বিভিন্ন মোড়ে নতুন ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করা হবে।
২০৩০ থেকে ২০৪০ সালের মধ্যে মধ্য মেয়াদে মূলত বড় অবকাঠামোগত সংযোগ এবং উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এই মেয়াদে প্রায় ১৪০ কিলোমিটার নতুন রাস্তা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। বিদ্যমান প্রায় ২৪৫ কিলোমিটার সড়ককে ১০০ থেকে ১২০ ফুট পর্যন্ত প্রশস্ত করার কাজ এই ধাপে গুরুত্ব পাবে। শহরের সব প্রধান মোড়ে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিগন্যাল স্থাপন করার কাজ শেষ করতে হবে।
২০৪০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে দীর্ঘ মেয়াদে প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। দীর্ঘ মেয়াদে চট্টগ্রামকে একটি আধুনিক মেগা সিটি হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বড় ধরনের গণপরিবহন ও অবকাঠামোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মেট্রোরেল বা মনোরেল চালুর পরিকল্পনা। পণ্য পরিবহনের জন্য পৃথক সড়ক।
তদারকির জন্য কমিটি
চট্টগ্রাম ট্রাফিক ও পরিবহন মহাপরিকল্পনা (২০২৫-২০৫০) অনুযায়ী, সিডিএ এবং সিটি করপোরেশনের উন্নয়নমূলক কাজের তদারকি ও সমন্বয়ের জন্য মূলত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি এবং নির্দিষ্ট কিছু প্রশাসনিক কাঠামোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সমন্বিত ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট কমিটি নামের এই কমিটিতে প্রধান বা চেয়ারম্যান হিসেবে থাকবেন সিটি করপোরেশনের মেয়র। মূলত মহাপরিকল্পনা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন এবং বিভিন্ন সংস্থার কাজের সমন্বয় ও তদারকি করবে এই কমিটি।
সড়ক পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও পরিকল্পিত চট্টগ্রাম ফোরামের সহসভাপতি প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া প্রথম আলোকে বলেন, উড়ালসড়ক ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের ব্যাপারে নির্মাণকাজ শুরুর আগেই তাঁরা আপত্তি জানিয়েছিলেন। কিন্তু সিডিএ এসব আপত্তি আমলে না নিয়ে ক্ষমতার জোরে এসব অবকাঠামো নির্মাণ করেছে। এসব উড়ালসড়কের কারণে অনেক প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়েছে।
এ মুহূর্তে চট্টগ্রামে মেট্রোরেলের প্রয়োজন না থাকার বিষয়ে একমত পোষণ করেন প্রকৌশলী সুভাষ বড়ুয়া। তিনি বলেন, বিআরটি চালুর কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়নেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। কেননা মূল সড়কগুলোতে উড়ালসড়কের পিলারের কারণে সংকুচিত হয়েছে। নতুন করে বাস ৭০০ বাস নামানোর আগে নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজাতে হবে। বিশেষ করে বিদ্যমান বাস চলাচলের জন্য আলাদা সুনির্দিষ্ট লেন করতে হবে। মোড়গুলোর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করতে হবে। সড়ক থেকে প্রাইভেট কার, রিকশা ও অটোরিকশা কমাতে হবে। প্রতিটি সড়ক নিয়ে আলাদা আলাদা করে পরিকল্পনা ও নকশা করতে হবে। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম নগরের ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে সরকারকে সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে।