পার্চিং নিয়ে বিভ্রান্তি, কীটনাশকে ভরসা

পার্চিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হলে কীটনাশকমুক্ত ফসল পাওয়া যায়। কিন্তু খেতের পোকা দমনে এ পদ্ধতি অনুসরণে আগ্রহী নন কৃষক।

  • জমিতে গাছের মরা ডাল, কঞ্চি বা বাঁশের আগা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থার নাম ‘পার্চিং’।

  • পার্চিংয়ে পাখি বসার সুযোগ পেলে তার দৃষ্টিসীমায় কোনো ক্ষতিকর পোকা দেখামাত্রই সেটি সে ধরে খেয়ে ফেলবে।

ফাইল ছবি
প্রথম আলো

আবদুল হামিদ কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার শিমুলকান্দি ইউনিয়নের শিমুলকান্দি গ্রামের কৃষক। এবার তিনি ছয় বিঘা জমিতে রোপা আমন আবাদ করেছেন। এক বিঘা জমিতে চার স্থানে পার্চিং করার পরামর্শ ছিল উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তার। কিন্তু তিনি এখনো কোনো স্থানে পার্চিং করেননি। করবেন বলে এতটুকু ইচ্ছাও নেই।

ফসলের জমিতে গাছের মরা ডাল, কঞ্চি বা বাঁশের আগা পুঁতে পাখি বসার ব্যবস্থা করার নাম ‘পার্চিং’। পার্চিংয়ে পাখি বসার সুযোগ পেলে তার দৃষ্টিসীমায় কোনো ক্ষতিকর পোকা দেখামাত্রই সেটি সে ধরে খেয়ে ফেলবে। এভাবে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে ধানখেতের পোকার আক্রমণ কমিয়ে বেশি ফলন পাওয়ার আশায় কৃষি বিভাগ ফসলের খেতে শতভাগ পার্চিং করার পরামর্শ দিয়ে থাকে।

অনাগ্রহের কারণ জানতে কথা হয় হামিদ মিয়ার সঙ্গে। প্রসঙ্গটিতে তুলতেই হেসে ফেলেন তিনি। পরে বলেন, ‘ডাল দেই, কিন্তু থাহে না। খড়ি করতে লোকজন উঠাইয়া নিয়া যায়। কত আর দিমু। অহন ডালে আর বিশ্বাস নাই, বিষেই ভরসা পাওয়া যায়।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শুধু হামিদ মিয়া নন, উপজেলার প্রায় সব কৃষকের মধ্যেই পদ্ধতিটি ব্যবহারে একধরনের অনাগ্রহ কাজ করছে। বিপরীতে কীটনাশক প্রয়োগে পোকা দমনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন তাঁরা। বিষয়টি নিয়ে কৃষি বিভাগের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা এখন উদ্বিগ্ন।

গত সোমবার উপজেলার শিমুলকান্দি, গজারিয়া ও শিবপুর ইউনিয়নের বেশ কয়েকটি ব্লক ঘুরে দু–একটি জমি ছাড়া আর কোথাও পার্চিংয়ের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। খেয়াল করা গেছে, কৃষকদের মধ্যে এ নিয়ে কথার বলা ও জানার আগ্রহও কম।

আবদুর রহমান শিমুলকান্দি ইউনিয়নের ব্লকের অধীন একজন কৃষক। শিমুলকান্দি নাথপাড়া তাঁর বাড়ি। পার্চিং নিয়ে তিনি বেশ বিরক্ত। রহমান জানালেন, পার্চিং দিয়ে পোকা দমন করা গেলে তাঁরই লাভ। আবার বিষমুক্ত ফসলও পাওয়া যায়। সমস্যা হলো, এলাকায় পাখিই কমে গেছে। ডালে খুব বেশি পাখি বসে না। আবার বসলেও পোকা ধরতে দেখা যায় না। এমন পর্যবেক্ষণে তাঁর মনে হয়েছে, কেবল পার্চিংয়ে ভরসা করলে সমস্যা আছে।

শিমুলকান্দি ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ড নিয়ে শিমুলকান্দি ব্লক। এ ব্লকে মোট জমি ৪২২ হেক্টর। এর মধ্যে আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ৩১৫ হেক্টর। এবার রোপা আমন হয়েছে ৯০ হেক্টরে।

ব্লকটির উপসহকারী কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা রাশিদা আক্তার জানালেন, এত বোঝানোর পরও পার্চিংয়ে কৃষকদের মন নেই কেন সেটাই তিনি বুঝতে পারছেন না।

কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, এখন রোপা আমন মৌসুম চলছে। ভৈরবে এবার রোপা আমনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২ হাজার ২৩০ হেক্টর। এরই মধ্যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪০ হেক্টর বেশি জমিতে রোপা আমন হয়েছে। রোপা আমনে সবচেয়ে বেশি আক্রমণ করে মাজরা পোকা। এ অঞ্চলে তিন ধরনের মাজরা পোকার মধ্যে হলুদ মাজরা পোকার আক্রমণ বেশি। এ পোকা ধানের গোছার নিচের দিকে আক্রমণ করে এবং শুরুতেই বড় ধরনের ক্ষতি করে দেয়। মাজরা পোকা দমনে পার্চিং অধিক কার্যকর। কিন্তু কৃষকেরা সেটা বুঝতে চান না।

উপজেলার শিবপুর ইউনিয়নের একাংশের পাশ ঘেঁষে ভৈরব-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়ক। লক্ষ করা গেছে, মহাসড়ক লাগোয়া জমিতে পার্চিং রয়েছে। অন্য জমিগুলোতে হাতে গোনা। স্থানীয় কৃষকের ভাষ্য, পার্চিং পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়েছে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে। কারণ, মহাসড়ক দিয়ে কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা আসা–যাওয়া করেন। মূলত তাঁদের নজর কাড়ার জন্যই বিশেষ কিছু স্থানে পার্চিং করা।

কথা হয় শিবপুর ইউনিয়নের জামালপুর ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মুসা মিয়ার সঙ্গে। এ ব্লকে আবাদি জমি ২৫০ হেক্টর। রোপা আমন করা হয়েছে ১৮৫ হেক্টরে। তার আগে আউশ করা হয় ৫০ হেক্টরে।

পার্চিং নিয়ে মুসা মিয়া জানালেন, কৃষকেরা সবকিছু দৃশ্যমান চান। প্রত্যক্ষ উপকার চান। পার্চিংয়ের ফলাফল এতটা দৃশ্যমান নয়। কারণ, পাখি পূর্ণাঙ্গ পোকা খায়। বিশেষ করে মাজরা পোকার পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে সময় লাগে। পাখি পোকা ধরছে, সেটা নাকি কৃষকেরা দেখেন না। এ কারণে পাতায় আক্রমণ টের পেলে কৃষক বিষ দিতে অস্থির হয়ে ওঠেন।

আকলিমা বেগম ভৈরব উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা। পার্চিং নিয়ে কৃষকের মধ্যে বিভ্রান্তি নিয়ে তিনিও বিব্রত। আকলিমা বেগম বলেন, প্রতিটি কর্মশালার শুরুতে পার্চিং নিয়ে কথা হয়। উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারাও তৎপর আছেন। তারপরও তাঁরা পার্চিং করতে চাইছেন না। পার্চিং নিয়ে কৃষকদের বিভ্রান্তি দূর করার জন্য আলাদা করে কিছু করার উদ্যোগ নেবেন তিনি।