তিস্তার চরে বাদাম চাষে সমৃদ্ধির ঝিলিক
একসময়ের খরস্রোত তিস্তা এখন মৃতপ্রায়। শীত মৌসুমে তিস্তা নদীর বুকে জেগে ওঠে ছোট–বড় বেশ কিছু চর। এই সময় চরগুলোর জমিতে চাষ করা হয় বাদাম। রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলায় তিস্তার চর রয়েছে। প্রতিবছরের মতো এবারও এই চরের কৃষকেরা বাদাম লাগিয়েছেন। এই আবাদ দিন ফিরিয়েছে অনেক চাষির। একসময় শ্রমিকের কাজ করতেন তাঁরা বাদাম চাষ করে বড় কৃষক হয়ে গেছেন। তাঁদের বাড়িতে এখন পাকা ঘর। সংসারে এসেছে সচ্ছলতা। ছেলেমেয়েরা লেখাপড়া করে শিক্ষিত হচ্ছেন।
বাদাম চাষের কারণে চরে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। ধান চাষের চেয়ে লাভজনক হওয়ায় অনেকেই বাদাম চাষে ঝুঁকছেন।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বাদাম চাষের কারণে চরে ব্যাপক অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়েছে। ধান চাষের চেয়ে লাভজনক হওয়ায় অনেকেই বাদাম চাষে ঝুঁকছেন। বাদাম চাষের কারণে চরের জমির দামও কয়েক গুণ বেড়েছে।
কৃষক ও কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৫ বছর আগেও গঙ্গাচড়ায় এভাবে বাদামের চাষ হতো না। বেলে-দোআঁশ মাটিতে বাদাম চাষ যে অনেক বেশি লাভজনক, সে বিষয়টি প্রথমে বুঝতে পারেন গঙ্গাচড়ার মিয়াজীপাড়া গ্রামের লাল মিয়া (৫৫)। তাঁর সাফল্য দেখে বাদাম চাষে এগিয়ে আসেন অনেকেই। আগে যাঁরা চরে ধানসহ অন্য ফসলের চাষ করতেন, তাঁরাও বাদাম চাষে ঝুঁকে পড়েন। লাভ বেশি হওয়ায় এ উপজেলার অনেক কৃষকই বাদাম চাষ শুরু করেছেন। গোটা উপজেলায় এখন ৩৬৫ হেক্টর জমিতে বাদামের চাষ হচ্ছে।
উপজেলা সদর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে মিয়াজীপাড়া গ্রামের লাল মিয়ার বাড়ি। কাঁচা-পাকা পথ ধরে তাঁর বাড়ি যাওয়ার পথে মাঠের পর মাঠজুড়ে বাদামখেতের দৃশ্য নজর কাড়ে। সামনে-পেছনে যে দিকে চোখ যায় বাদাম আর বাদাম। কেউ রাস্তার পাশে বাদাম শুকাতে ব্যস্ত, কেউ জমি থেকে তুলছে গাছসহ বাদাম। কেউ বা শিকড় থেকে বাদাম আলাদা করছেন। গত সোমবার অন্যদের মতো লাল মিয়াও দিনমজুর নিয়ে বাড়ির পাশে চরে শিকড় থেকে বাদাম ছাড়াচ্ছেন। সাংবাদিক পরিচয় শুনে বাড়ির উঠানে বসতে দিয়ে শোনান বাদাম চাষের গল্প।
১৯৫৫ সালে জন্ম লাল মিয়ার। তাঁর বাবার নাম জব্বার মিয়া। ছয় ভাই বোনের মধ্যে তিনি মেজ। বাবার অভাবের সংসার, তাই লেখাপড়া করা হয়নি। গ্রামে ঘুরে হাঁস-মুরগির ডিম সংগ্রহের পর তা বাজারে বিক্রি করে অনেক কষ্টে সংসার চালাতেন। ২০০৯ সালে তিনি ডিম সংগ্রহের জন্য লালমনিরহাট জেলার পাটগ্রাম উপজেলার ঘোনাবাড়ি গ্রামে যান। তাঁর কষ্টের কথা শুনে ওই গ্রামের মেহের উদ্দিন তাঁকে বাদাম চাষের পরামর্শ দেন।
২০০৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে লাল মিয়া অন্যের ২৭ শতক জমি বর্গা নিয়ে মেহের উদ্দীনের কাছ থেকে বীজ এনে বাদাম চাষ করেন। ১২০ দিনের মাথায় বাদাম ধরে। ফলন দেখে লাল মিয়ার মুখে হাসি ফোটে। এ বাদাম বিক্রি করে আয়ও আসে ৬ হাজার ৯৫০ টাকা। এরপর পুরোপুরি বাদাম চাষে লেগে পড়েন। প্রথম বছরের লাভের টাকা দিয়ে পরের বছরে অন্যের ৬০ শতক জমি বর্গা নিয়ে বাদাম লাগান। এবারও তাঁর বাদামের ফলন ভালো হয়। বাদাম বিক্রি করে খরচ বাদে আয় করেন ১৫ হাজার টাকা।
বাদাম চাষ করে লাল মিয়া তিন মেয়েকে লেখাপড়া শিখিয়ে বিয়ে দিয়েছেন। গড়ে তুলেছেন বড় বাড়ি। কিনেছেন ৩৫ শতক আবাদি জমি। আছে ছয়টি গাভি। এবারে দেড় একরে করেছেন বাদাম চাষ। ইতিমধ্যে জমি থেকে বাদাম তুলে রোদে শুকাচ্ছেন। এ বাদাম বিক্রি করলে খরচ বাদে আয় হবে ১ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
মিয়াজীপাড়া গ্রামের লাল মিয়ার মতো উপজেলার কোলকোন্দ, সিংগীমারী, লোহানী, বিনবিনার চর, লক্ষ্মীটারী, মুটুকপুর, ঢাকেরচর, খালারচরের অনেকেই বাণিজ্যিকভাবে বাদাম চাষ করে ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়েছেন। বিনবিনার চরের সফিকুল ইসলাম (৬৫) বলেন, ‘১০ বছর আগে লাল মিয়ার দেখে বাদাম চাষে উৎসাহিত হই। তিন সন্তানের মধ্যে আমার দুই সন্তানেই বাদাম চাষ নিয়ে আছে। দেড় একর জমি, পাকা বাড়ি হয়েছে। অন্য ফসলের চেয়ে লাভ বেশি হয় বলে এবার তিন একরে বাদামের চাষ করেছি।’
বাদামে অন্য ফসলের চেয়ে লাভ বেশি। তাই এ মৌসুমে অন্য ফসলের বদলে বাদামের চাষ করি। অন্যান্য মৌসুমে বৃষ্টির জন্য পারি না। তা না হলে বাদাম চাষই করতাম।
প্রতিবছরের মতো এবারও এক একর জমিতে বাদাম চাষ করেছেন মিয়াজীপাড়া গ্রামের কৃষক লাবু মিয়া (৪৫)। দিনমজুরদের সঙ্গে বিনবিনার চরে বাদাম তুলতে ব্যস্ত তিনি। জানতে চাইলে লাবু মিয়া বলেন, ধানের চেয়ে বাদাম চাষে লাভ দ্বিগুণ। এক একর জমিতে বোরো ধান চাষ করতে ব্যয় হয় ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা। উৎপাদিত ধান বিক্রি হয় ৫০ থেকে ৫৩ হাজার টাকা। এতে লাভ হয় ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। কিন্তু এক একরে বাদাম চাষ করতে ব্যয় হচ্ছে ২২ থেকে ২৫ হাজার টাকা। উৎপাদিত বাদাম কম করে হলেও বিক্রি হয় ১ লাখ ২০ হাজার টাকা। এতে খরচ বাদে বাদাম চাষ করে আয় আসে ৭৫ হাজার টাকা। তাই ধানের পরিবর্তে বাদাম চাষ করি।
বোল্লারপাড় গ্রামের আদর্শ কৃষক হাফিজুর রহমান বলেন, ২০১৬ সালে তিনি বাদামের চাষ শুরু করেন। চাষ শুরু হয় প্রথমে ২০ শতক জমিতে। হিসাব-নিকাশ করে লাভ দেখে পরের বছর চাষ করেন এক একরে। এবার তিন একর জমিতে বাদাম লাগিয়েছেন। হাফিজুর রহমান বলেন, ‘বাদামে অন্য ফসলের চেয়ে লাভ বেশি। তাই এ মৌসুমে অন্য ফসলের বদলে বাদামের চাষ করি। অন্যান্য মৌসুমে বৃষ্টির জন্য পারি না। তা না হলে বাদাম চাষই করতাম। বাদামের কল্যাণে আমরা মোটামুটি ভালোভাবে বাঁচতে পারছি।’
ঘোনটারী গ্রামের আলেফ উদ্দিন বলেন, ডিসেম্বর-ফেব্রুয়ারি মাসে আমন ধান ওঠার পরপরই বাদামের চাষ শুরু হয়। মাটির নিচে ফলন হওয়ায় পোকামাকড়ের আক্রমণ কম। ফলে অল্প খরচে বাদাম চাষ করা যায়। অথচ আয় হয় অন্য ফসলের তুলনায় দ্বিগুণ। প্রতি একরে খরচ হয় ২২ থেকে ২৩ হাজার। খরচ বাদে আয় হয় ৯০ থেকে ৯৫ হাজার টাকা। মে-জুলাই মাসে বাদাম তোলা হয়। একরে ২৯ থেকে ৩০ মণ বাদাম উৎপাদিত হয়। দুবার রোদে দেওয়ার পর প্রতি মণ বাদাম সাড়ে তিন হাজার থেকে চার হাজার টাকা মণ বিক্রি হয়।
কোলকোন্দ ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য শরিফুল ইসলাম বলেন, তিস্তার চরের চাষাবাদ গঙ্গাচড়ার নদীভাঙনে নিঃস্ব মানুষের আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। বাদাম চাষ এখানকার জমিকে মূল্যবান করেছে। ১৫ বছর আগে যে জমি এক হাজার টাকা শতক বিক্রি হতো বাদাম চাষের কারণে তা এখন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা শতকে বিক্রি হচ্ছে। তিস্তা চরের বাসিন্দাদের দিনবদলের হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বাদাম।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মারুফা ইফতেখার সিদ্দিকা মুঠোফোনে বলেন, চরের জমি এখন সম্পদে পরিণত হয়েছে। কৃষি বিভাগের সহযোগিতায় বাদাম চাষ করে কৃষকেরা লাভবান হচ্ছেন। বাদাম চাষে খরচ কম লাভ বেশি হওয়ায় এ উপজেলার হাজারো কৃষক বাদাম চাষে জড়িয়ে পড়েছেন। এবারে ৩৬৫ হেক্টর জমিতে চিনাবাদাম চাষ হয়েছে। এ বাদাম ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় যাচ্ছে।