কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে জনসমুদ্র
পাকিস্তান আমলে ময়মনসিংহ জেলা থেকে হেঁটে কিশোরগঞ্জের ঐতিহাসিক শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ পড়তে আসতেন আলী আকবর আকন্দ (৭২)। এবারও তিনি ঐতিহাসিক এ ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়েছেন। ৫৭ বছর ধরে শোলাকিয়ায় আসছেন। তাঁর কাছে শোলাকিয়া একটি আবেগের নাম। এই মাঠে ঈদের নামাজ আদায় না করলে ঈদ–আনন্দ অপূর্ণ থেকে যায়।
পেশায় কৃষক আলী আকবরের বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার তারাকান্দা উপজেলা সদরে। জানালেন, তাঁর বয়স যখন ১৪-১৫ বছর, তখন থেকে চাচা এহেন আলীর হাত ধরে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ হেঁটে শোলাকিয়া ঈদগাহ মাঠে নামাজ পড়তে আসতেন। প্রতিবারই দু–এক দিন আগে তিনি নামাজ পড়ার জন্য চলে আসেন। এবারও আসেন এক দিন আগে।
স্মৃতিচারণা করে আকবর আলী বলেন, ‘শোলাকিয়া একটা আবেগ। সেই ছোটবেলায় যখন বড়দের সঙ্গে ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পথ হেঁটে চলে আসতাম, এত আনন্দ লাগত যে দীর্ঘ পথ হেঁটে আসলেও ক্লান্তি লাগত না। সেই ১৪ বছর বয়স থেকে শুরু করেছিলাম। আল্লাহর ইচ্ছায় এখনো আসছি। তবে এখন আর আগের মতো হাঁটতে পারি না। আর যাতায়াতব্যবস্থা ভালো থাকায় হাঁটতেও হয় না।’
৭০ বছর বয়সী ইদ্রিস আলী। তিনিও ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার দক্ষিণ বালিপাড়া থেকে শোলাকিয়ায় নামাজ পড়তে এক দিন আগেই কিশোরগঞ্জে চলে এসেছেন। ঐতিহাসিক এ মাঠে তাঁর প্রথম ঈদের নামাজ পড়া হয় পাকিস্তান আমলে। ইদ্রিস আলী বলেন, প্রথম যখন তিনি শোলাকিয়ায় এসেছিলেন, তখন তাঁর বয়স হবে আনুমানিক ১৫ বছর। সবকিছু স্পষ্ট মনে না থাকলেও এটা মনে আছে, বাড়ি থেকে বড়দের সঙ্গে শোলাকিয়ার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পরে বেশির ভাগ পথই হেঁটে আসতে হয়েছিল। অল্প কিছুটা জায়গা প্যাডেলের রিকশায় এসেছিলেন। ২০ টাকা সঙ্গে নিয়ে এই আসা-যাওয়া, খাওয়া সব খরচ হয়ে যেত। এবারও তিনি এসেছেন প্রতিবেশী হাতেম আলীকে নিয়ে। হাতেম আলী প্রায় ২০ বছর ধরে শোলাকিয়া ঈদগাহ আসার তাঁর সঙ্গী।
শোলাকিয়া ঈদগাহে প্রতিবছর যেমন পুরোনো মুসল্লিরা সমবেত হন, তেমনি যোগ হন নতুনেরা। এবারই ঐতিহাসিক এ ঈদগাহে প্রথমবার ঈদের নামাজ পড়তে এসেছেন নরসিংদীর পলাশের বাছির উদ্দিন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরের দুলাল মিয়া, ময়মনসিংহের তারাকান্দার রইছ উদ্দিন, লালচান, জহির উদ্দিন, মহর উদ্দিন। তাঁরা সবাই এক দিন আগে এসে চর শোলাকিয়া বাগে জান্নাত মসজিদে ওঠেন। শোলাকিয়ায় ঈদের নামাজ আদায় করতে পেরে খুব খুশি তাঁরা।
এবার শোলাকিয়ায় ছিল ১৯৯তম ঈদুল ফিতরের জামাত। নামাজ শুরু হয় সকাল ১০টায়। জেলা শহরের বড় বাজার মসজিদের খতিব মুফতি আবুল খায়ের মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ নামাজের ইমামতি করেন। নামাজ শেষে বিশ্ব মুসলিম উম্মাহর শান্তি, সমৃদ্ধি এবং দেশের সার্বিক কল্যাণ কামনা করে দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
শোলাকিয়া ঈদগাহ কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, এবার কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় লাখ লাখ মুসল্লি উৎসাহ–উদ্দীপনা ও স্বস্তিতে নামাজ আদায় করেছেন। শোলাকিয়ায় প্রতিবারের মতো এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। মুসলিম উম্মাহর শান্তি কামনায় লাখো মুসল্লির ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মুখরিত ছিল ময়দান।
সরেজমিনে দেখা যায়, ভোর হতে দূরদূরান্ত থেকে দলে দলে মুসল্লিরা আসতে শুরু করেন। সকাল ৯টার দিকে মাঠ কানায় কানায় ভরে যায়। নামাজে অংশগ্রহণকারীদের অনেকেই বলেন, এবার ঐতিহাসিক শোলাকিয়া ঈদগাহে রেকর্ড পরিমাণ মুসল্লি হয়েছে। প্রায় তিন লাখ মানুষের ধারণক্ষমতাসম্পন্ন কিশোরগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী শোলাকিয়া ঈদগাহ ময়দান পরিপূর্ণ হয়ে চারপাশের রাস্তা এবং আশপাশের মাঠ জনস্রোতে রূপ নেয়। এবার ছয় থেকে সাত লাখ মুসল্লি হয়েছে শোলাকিয়ায়।
শোলাকিয়া মাঠের রেওয়াজ অনুযায়ী বন্দুকের ফাঁকা গুলির মাধ্যমে সকাল ১০টায় জামাত শুরু হয়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে নামাজ শেষে আল্লাহর সন্তুষ্টিতে মোনাজাত করে যাঁর যাঁর বাড়িতে ফেরেন মুসল্লিরা। জামাতে পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী কিশোরগঞ্জ-৬ আসনের সংসদ সদস্য মো. শরীফুল আলম, কিশোরগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. মাজহারুল ইসলামসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অংশ নেন।
প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম বলেন, এবারের নির্বাচনের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরে পাওয়ায় ভয়ের পরিবেশ দূর হয়েছে। জাতি ধর্ম-বর্ণ নির্বশেষে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এখন আনন্দমুখর পরিবেশে ঈদের আনন্দ উপভোগ করছে।
২০১৬ সালের ঈদুল ফিতরের দিনে অপ্রত্যাশিত জঙ্গি হামলার বিষয়টি মাথায় রেখে এবারও দেশের সবচেয়ে বড় ঈদগাহ শোলাকিয়ায় বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। মোতায়েন ছিল সেনাবাহিনী, র্যাব, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন), রেঞ্জ রিজার্ভ ফোর্স (আরআরএফ), পাঁচ প্লাটুন বিজিবি এবং জেলা পুলিশের ১১ সদস্য।
মাঠের ভেতর ও বাইরে ছিল অর্ধশতাধিক সিসিটিভি ক্যামেরা, পুরো মাঠ পর্যবেক্ষণের জন্য ছিল কয়েকটি ড্রোন। ছয়টি পর্যবেক্ষণ টাওয়ারের মাধ্যমে আগত মুসল্লিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। এ ছাড়া মাঠের ভেতর-বাইরে পুলিশ বাহিনীকে সহায়তায় ছিল স্বেচ্ছাসেবক দল। নিরাপত্তার স্বার্থে মাঠে কাউকে ছাতা বা কোনো ধরনের ব্যাগ নিয়ে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। শুধু পাতলা জায়নামাজ নিয়ে নামাজ আদায় করেন মুসল্লিরা। মুসল্লিদের যাতায়াতে দুটি বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছিল।
জনশ্রুতি আছে, মোগল আমলে এখানকার পরগনার রাজস্ব আদায়ের পরিমাণ ছিল শ লাখ টাকা। মানে এক কোটি টাকা। কালের বিবর্তনে শ লাখ থেকে বর্তমান শোলাকিয়া হয়েছে। অন্য আরেকটি বিবরণে আছে, ১৮২৮ সালে শোলাকিয়া ঈদগাহে সোয়া লাখ মুসল্লি একসঙ্গে ঈদের নামাজ আদায় করেন। সেই থেকে ঈদগাহটি একসময় শোয়ালাকিয়া ঈদগাহ মাঠ হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। ‘কিশোরগঞ্জের ইতিহাস-ঐতিহ্য’ বইয়েও এ দুটি বর্ণনা আছে।