ইটভাটার শ্রমিক থেকে সফল কৃষি উদ্যোক্তা সীতাকুণ্ডের জাহাঙ্গীর
কাজের সন্ধানে পিরোজপুরের ভান্ডারিয়া থেকে সীতাকুণ্ডে প্রায় তিন দশক আগে চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে এসেছিলেন জাহাঙ্গীর আলম। ২৪ বছর ধরে ইটভাটায় কাজ করে সংসার চালাচ্ছিলেন। ১৪ হাজার টাকা বেতনে ৪ সদস্যের পরিবারের ভরণপোষণ কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে ইটভাটার কাজের পাশাপাশি পাহাড়ের ঢালে ছোট আকারের সবজিখেত করেন তিনি।
২০২০ সালে করোনার প্রকোপের সময় চাকরি চলে যায় তাঁর। চাকরি হারিয়ে প্রথমে দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন তিনি। তবে হাল ছেড়ে দেননি। পুরোপুরি কৃষক বনে যান তিনি। এরপর এই কয়েক বছরে নিজের চেষ্টায় সেই ছোট খেতকে বড় কৃষি খামারে রূপান্তর করেন তিনি। ইটভাটার শ্রমিক থেকে তিনি এখন সফল কৃষি উদ্যোক্তা।
১৬ একরের কৃষিজমিতে জাহাঙ্গীর আলম গ্রীষ্মকালীন শিম, কলা, পেঁপে, বেগুন, মরিচ, লাউসহ নানা সবজির আবাদ করেছেন। তাঁর কৃষি খামারে কাজ করেন আটজন শ্রমিক।
যাঁদের প্রতি মাসেই বেতন দেন তিনি ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে বছরে ছয় লাখ টাকার মতো আয় হয় তাঁর। সফল এই কৃষি উদ্যোক্তা সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নের মোহাম্মদপুর গ্রামে থাকেন। ভাড়া ঘর ছেড়ে এখন উঠেছেন নিজের কেনা ছয় শতক জমির ওপর তৈরি করা আধপাকা ঘরে।
সীতাকুণ্ডের কুমিরা ইউনিয়নে রেলওয়ের পরিত্যক্ত টিবি হাসপাতালে পাশ দিয়ে কিছু দূর গেলেই দুটি টিলার ওপর জাহাঙ্গীর আলমের কৃষি খামার। সম্প্রতি সেখানে গিয়ে দেখা গেল, মাচায় ঝুলছে থোকায় থোকায় বেগুনি রঙের রূপবান শিম। শিমখেত পেরোলেই ছোট একটি পেঁপেবাগান। প্রতিটি গাছে ধরে আছে পেঁপে। একটু বড় হলেই কাঁচা পেঁপে সবজি হিসেবে বাজারে বিক্রি করা হয়। পেঁপেগাছের নিচে সাথি ফসল হিসেবে লাগানো হয়েছে কাঁচা মরিচ। আর পেঁপেবাগান পেরোলেই বড় কলাবাগান।
কলাবাগানের ভেতরে অনেকগুলো কলাগাছ কাটা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। যেগুলো থেকে কলার ছড়া বাজারে বিক্রি করা হয়েছে। তিনজন শ্রমিক পেকে ওঠা কলার ছড়া কেটে আনার কাজ করছেন। কলাবাগানের ঠিক উত্তর পাশে বেগুন, মরিচ, বরবটি, লাউসহ বিভিন্ন সবজিখেত। পাহাড়ের দুটি টিলার মধ্যে সৃষ্ট ডোবায় জমে থাকা পানিতে করা হয়েছে মাছের চাষ।
খামারেই কথা হয় এই কৃষি উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, তাঁদের বাড়ি ছিল পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলায়। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে তিনি বড়। বাবা কৃষি কাজ করে সংসার চালাতেন। খরচ জোগাতে পারেননি বলে অষ্টম শ্রেণিতে ওঠার পর পড়ালেখা বন্ধ করে দেন। বেশি কিছুদিন বাবার সঙ্গে কাজ করেছেন।
১৯৯৪ সালে তিনি ভান্ডারিয়া থেকে সীতাকুণ্ডে এসেছিলেন কাজের সন্ধানে। তখন ছিলেন তিনি ২৩ বছরের তরুণ। সীতাকুণ্ডের বিভিন্ন স্থানে কাজ খুঁজে না পেয়ে প্রথমে তাঁর এক পরিচিত মামার হাত ধরে কুমিরার একটি ইটভাটায় দৈনিক ভিত্তিতে শ্রমিকের কাজ শুরু করেন।
শুরুতে সব মিলিয়ে চার হাজার টাকা বেতন পেতেন জাহাঙ্গীর। এরপর ১৯৯৬ সালে ইটভাটায় অপারেটর হিসেবে চাকরি স্থায়ী হয় তাঁর। এর পর থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ওই ইটভাটায় কাজ করেছেন তিনি। সর্বশেষ তাঁর বেতন হয়েছিল ১৪ হাজার টাকা। করোনা দেখা দেওয়ার পর কিছুদিনের মধ্যে তাঁর চাকরি চলে যায়। এর পর থেকে তিনি কৃষিতে মনোনিবেশ করেন।
২০০৬ সালে ইটভাটা কাজ করার সময় বিয়ে করেন তিনি। তাঁর স্ত্রী রুমা আক্তারের বাড়িও ভান্ডারিয়া উপজেলায়। দুই সন্তানের জনক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, সংসার যখন বাড়তে শুরু করে, তখন তাঁর খরচ বেড়ে যায়। ইটভাটায় কাজ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে সংসার চলছিল না। ২০১৬ সালে ইটভাটার পাশের পাহাড়ের ঢালে ছোট্ট পরিসরে কৃষি কাজ শুরু করেন।
তাঁর চিন্তা ছিল, যেহেতু জিনিসপত্রের দাম দিন দিন বাড়ছে, অন্ততপক্ষে শাকসবজিগুলো যেন তাঁকে বাইরে থেকে কিনতে না হয়। নিজের খেতে উৎপাদিত বিষমুক্ত সবজি পাবেন পাশাপাশি বেতনের টাকা সংসারের অন্য কাজে লাগাতে পারবেন। করোনার সময়ে চাকরিটা চলে যায় তাঁর। এরপর দিশাহারা হয়ে পড়েন তিনি। তবে ভেঙে পড়েননি। পুরোপুরি কৃষিকাজে মনোনিবেশ করেন তিনি।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, তিনি যেখানে চাষ করেন, তাঁর পাশে আরও কিছু জমি নিয়ে ২০২০ সালে সবজি চাষ বাড়ান। প্রথমবারেই তিনি সবজির ভালো দাম পান। এ বছর তাঁর ১৬ একর জমিতে চাষাবাদ রয়েছে। এর মধ্যে ৩ একর গ্রীষ্মকালীন শিম, ৫ একরে কলা চাষ, এক একরে পেঁপে চাষ, চার একরে বেগুন, মরিচ, লাউ ও বরবটি চাষ করেছেন। ৩ একর জমি এখন চাষের জন্য উপযোগী করেছেন।
এখন তাঁর কৃষি খামারে এখন আটজন শ্রমিক নিয়মিত কাজ করেন। মাসিক ভিত্তিতে তাঁদের মজুরি দেওয়া হয়। একেকজন শ্রমিকের বেতন ২১ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। প্রতি মাসের শ্রমিকদের বেতন দিতে হয় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। তাঁর মূলধন এখন ৩০ লাখ টাকা।
জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এই কৃষি কাজ করে গত তিন বছরে তিনি ছয় শতক জমি কিনেছেন। টিনশেড সেমিপাকা ঘর করেছেন। বড় ছেলে মোহাম্মদ আলী মারুফ এবার এসএসসি পরীক্ষায় এ প্লাস পেয়েছে। তাকে এবার নৌবাহিনী স্কুল অ্যান্ড কলেজে একাদশ শ্রেণিতে বিজ্ঞান বিভাগে ভর্তি করিয়েছেন। ছোট ছেলে আরিয়ান হামজাকে আগামী বছর স্কুলে ভর্তি করাবেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, সীতাকুণ্ড যে কয়জন বড় কৃষক রয়েছেন, তাঁর মধ্যে জাহাঙ্গীর আলম একজন। কৃষি বিভাগের পক্ষ থেকে তাঁকে পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দিয়ে সহযোগিতা করা হচ্ছে। উপজেলা কৃষি বিভাগের দৃষ্টি রয়েছে তাঁর দিকে।