তরুণ ভোটার ও আঞ্চলিক দলের ‘সমর্থন’ কার দিকে

সংসদ নির্বাচন নিয়ে নিজেদের ভাবনা ও প্রত্যাশার কথা বলেন তরুণ ভোটাররা। সম্প্রতি রাঙামাটি শহরের টিটিসি এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পার্বত্য চট্টগ্রামের রাঙামাটি আসনের সাত প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণে বড় ভূমিকা রাখবে নতুন হওয়া ভোটার এবং পাহাড়ি আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থন। তরুণ ও আঞ্চলিক দলের সমর্থন যেই প্রার্থীর দিকে যাবে, তাঁর জয় অনেকটাই সহজ হবে বলে মনে করছেন পাহাড়ের মানুষ ও পর্যবেক্ষকেরা।

এবারের নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না দুই আঞ্চলিক দল পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (জেএসএস) ও ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্রেটিক ফ্রন্ট (ইউপিডিএফ)। এই অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ওপর এই দুটি দলের প্রভাব রয়েছে। তাই নির্বাচনে আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থন পেতে প্রকাশ্যে ও গোপনে প্রার্থীরা তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন বলে ভোটারদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে।

২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী রাঙামাটি জেলায় জনসংখ্যা ৬ লাখ ৪৭ হাজার ৫৮৬। এর মধ্যে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মানুষ আছেন ৩ লাখ ৭২ হাজার ৮৭৫ জন। অন্যরা বাঙালি। ১০টি উপজেলা নিয়ে গঠিত এই আসনে এবার মোট ভোটার ৫ লাখ ৯ হাজার ২৬৭ জন। এর মধ্যে প্রায় ৩৫ হাজার ভোটার এবারই প্রথম ভোট দেবেন।

তরুণদের ক্ষোভ-প্রত্যাশা

২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসনে ভোটার ছিলেন ৪ লাখ ৭৪ হাজার ৩৫৪ জন। দুই বছরের ব্যবধানে এখন ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ৯ হাজার ২৬৭ জন। অর্থাৎ এই সময়ে ভোটার বেড়েছে ৩৪ হাজার ৯১৩ জন।

তাঁদের কয়েকজন হচ্ছেন রাঙামাটি সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী নিহির চাকমা, ম্যা ম্যা চিং মারমা, দিগন্ত তঞ্চঙ্গ্যা ও শ্রেয়সী চাকমা। পড়াশোনার জন্য রাঙামাটি শহরে থাকেন তাঁরা। গত শনিবার সন্ধ্যায় রাঙামাটি শহরের টিটিসি সড়ক এলাকায় কথা হয় তাঁদের সঙ্গে।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। এরপরেও রাঙামাটি আসনে জিততে পারেননি আওয়ামী লীগের প্রার্থী দীপংকর তালুকদার। জেএসএসের প্রার্থী ঊষাতন তালুকদারের কাছে হেরে যান তিনি।

ইংরেজি বিভাগের ছাত্রী ম্যা মা চিং বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের শিক্ষার খুব করুণ অবস্থা। দুর্গম এলাকাগুলোতে স্কুল নেই। আবার যেখানে স্কুল আছে সেখানে শিক্ষক নেই। এই কারণে পাহাড়ি ছেলেমেয়েরা পিছিয়ে যাচ্ছে।

বিলাইছড়ি উপজেলার পারুয়া গ্রামের বাসিন্দা দিগন্ত তঞ্চঙ্গ্যার ক্ষোভ অন্য জায়গায়। তাঁদের বাড়ি জেলা সদর থেকে অনেক দূরে। তাঁদের এলাকায় স্বাস্থ্যব্যবস্থা খুব শোচনীয়। কমিউিনিটি ক্লিনিকগুলোতে চিকিৎসক নেই। উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও চিকিৎসক থাকেন না।

প্রাণিবিদ্যা বিভাগের ছাত্রী শ্রেয়সী চাকমা বলেন, আগে যাঁরা এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরা উন্নয়ন বলতে বুঝিয়েছেন রাস্তাঘাট, সেতু ও ভবন নির্মাণকে। কিন্তু বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষকের ব্যবস্থা করা; হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক যাতে থাকেন তা নিয়ে তাঁদের কার্যকর কোনো উদ্যোগ ছিল না। যার খেসারত দিচ্ছেন পাহাড়ের মানুষ।

অতীতের জনপ্রতিনিধিদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করে নিহির চাকমা বলেন, ‘আগে তো অনেকজন এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন। তাঁদের শুধু দেখা মিলত নির্বাচনের আগেই। একবার নির্বাচিত হয়ে গেলে আর এলাকায় আসতেন না। ভোটারদের খবর নেওয়ারও প্রয়োজন মনে করেন না। এবারও কি তার ব্যতিক্রম হবে?’

আগে যাঁরা এমপি-মন্ত্রী হয়েছেন, তাঁরা উন্নয়ন বলতে বুঝিয়েছেন রাস্তাঘাট, সেতু ও ভবন নির্মাণকে। কিন্তু বিদ্যালয়গুলোতে প্রয়োজনীয় শিক্ষকের ব্যবস্থা করা; হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসক যাতে থাকেন তা নিয়ে তাঁদের কার্যকর কোনো উদ্যোগ ছিল না। যার খেসারত দিচ্ছেন পাহাড়ের মানুষ।
শ্রেয়সী চাকমা, শিক্ষার্থী, রাঙামাটি সরকারি কলেজ।

এই চার কলেজ শিক্ষার্থীর আরও দাবি রয়েছে আগামী দিনের নতুন সংসদ সদস্যের প্রতি। তাঁরা বলেন, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় বিচ্ছিন্নতাবাদীসহ বিভিন্ন ধরনের ‘ট্যাগ’ দিয়ে অপপ্রচার চালানো হয়। আবার পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর ‘আদিবাসী’ পরিচয় নিয়ে ধোঁয়াশা সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই এই অধিকার আদায় নিয়ে যিনি বেশি সোচ্চার থাকবেন তাঁর প্রতি সমর্থন থাকবে তাঁদের।

এর আগে গত শনিবার দুপুরে রাঙামাটির রিজার্ভ বাজার এলাকায় কথা হয় এবারের নতুন ভোটার কলেজছাত্র মো. তৌহিদুল ইসলাম ও মো. তানভীরুল ইসলামের সঙ্গে। তাঁদের প্রত্যাশা আবার ভিন্ন। তাঁরা বলেন, রাঙামাটিতে মাদক বড় একটি সমস্যা। এতে কিশোর-তরুণ বিপথে চলে যায়। সমাজে অশান্তি সৃষ্টি হয়। কিশোর গ্যাং রয়েছে। খেলাধুলার সুযোগ কম। নতুন জনপ্রতিনিধির এসব বিষয়ে নজর দিতে হবে। আর এমন প্রার্থীকে তাঁরা ভোট দেবেন, যিনি পাহাড়ের জাতি-ধর্মনির্বিশেষে সবার বিপদে ছুটে আসবেন। এলাকার শান্তি-সম্প্রীতি বজায় রাখবেন।

আঞ্চলিক দলের সমর্থন কোন দিকে

পার্বত্য চট্টগ্রামের তিন আসনে প্রার্থীদের জয়-পরাজয়ে প্রভাব রাখে আঞ্চলিক দলগুলো। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ চারটি নির্বাচনের তিনটিতেই জয়ী হয়েছিল আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ)। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয় বিএনপি। এই অঞ্চলে আলোচনা রয়েছে, এসব নির্বাচনে আঞ্চলিক দলগুলোর সমর্থন যেদিকে গেছে ওই দলের প্রার্থীদের জয় সহজ হয়েছিল।

২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করেছিল বিএনপি। এরপরেও রাঙামাটি আসনে জিততে পারেননি আওয়ামী লীগের প্রার্থী দীপংকর তালুকদার। জেএসএসের প্রার্থী ঊষাতন তালুকদারের কাছে হেরে যান তিনি।

পার্বত্য চট্টগ্রামে আঞ্চলিক দলগুলোর প্রভাব অস্বীকার করেননি প্রার্থীরা। এবারের নির্বাচনে স্বতন্ত্র হয়ে লড়ছেন একসময় জেএসএসের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকা পহেল চাকমা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর পুরোনো দল জেএসএস তাঁকে প্রার্থী হতে নিষেধ করেছিল। জেএসএস পরোক্ষভাবে বিএনপির প্রার্থী দীপেন দেওয়ানকে সমর্থন দেওয়ার বিষয়টি এখানে আলোচনায় আছে। অবশ্য পাহাড়ের আরেকটি আঞ্চলিক দলের সমর্থন তাঁর দিকে থাকবে।

বিএনপির প্রার্থী দীপেন দেওয়ান বলেন, বিএনপি বড় দল। নির্বাচনের মাঠে দলের অবস্থা ভালো। এ জন্য ভোটের লড়াইয়ে অনেকেরই সমর্থন পাবে। তবে আঞ্চলিক দল জেএসএসের সমর্থনের ব্যাপারে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। নির্বাচনের দিন জানা যাবে তারা কাকে সমর্থন দিয়েছে। তবে তিনি সবার সমর্থন চান।

দলের অবস্থান জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেএসএসের দুই নেতা প্রথম আলোকে বলেন, বৈশ্বিক, বাংলাদেশ ও পার্বত্য চট্টগ্রামের পরিস্থিতি অর্থাৎ ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এবার নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে না জেএসএস। নেতা-কর্মীরা আগামী নির্বাচনে কাকে ভোট দেবেন সে ব্যাপারে দলের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছেন। আগামী দিনের রাজনৈতিক কৌশলের কথাও চিন্তা করে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রাঙামাটির সম্পাদক এম জিসান বখতেয়ার প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচনে জয়-পরাজয় নির্ধারণে তরুণদের একটা ভূমিকা তো আছে। এর পাশাপাশি রাঙামাটিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখবে আঞ্চলিক দলগুলো। কেননা এখানে জাতীয় দলগুলোর রাজনীতি শহরকেন্দ্রিক। তৃণমূল পর্যায়ে একমাত্র আঞ্চলিক দলগুলোর সাংগঠনিক অবস্থান আছে। অতীতে দল যে প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে তাঁকে জিতিয়ে আনা হয়েছে।