পদ্মায় বাসডুবি: বাবা থেকেও নেই, মাকে হারিয়ে দিশাহারা শিশু আলিফ
পাঁচ বছর আগে মাকে ছেড়ে বাবা অন্যত্র চলে যাওয়ায় মা আর নানিই ছিলেন আলিফের বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়ায় পদ্মা নদীতে বাসডুবির ঘটনায় মা-হারা হয়ে পড়েছে শিশু আলিফ মোল্লা (৯)। গত বুধবার মায়ের সঙ্গে ঢাকায় যাওয়ার পথে এ দুর্ঘটনার শিকার হয় সে। বাস ডুবে যাওয়ার মুহূর্তে আলিফকে ধাক্কা দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরে বের করে দেন তার মা জোসনা খাতুন, নিজের জীবন দিয়ে বাঁচিয়ে দেন সন্তানকে।
বাসডুবিতে নিহত জোসনা খাতুন (৩৫) রাজবাড়ী সদর উপজেলার মিজানপুর ইউনিয়নের বড় চর বেনিনগর গ্রামের মান্নান মোল্লার সাবেক স্ত্রী। তিনি সাভারের আশুলিয়ার একটি পোশাক কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। আলিফ ছাড়াও তাঁদের আরেক ছেলে জিসান মোল্লা (১৮) রয়েছেন, যিনি ঢাকায় একটি কারখানায় টেইলরিংয়ের কাজ শিখছেন।
ঈদের ছুটিতে জোসনা খাতুন বাবার বাড়ি বড় চর বেনিনগরে এসেছিলেন। ছুটি শেষে ২৫ মার্চ বিকেলে শিশুসন্তান আলিফকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকার উদ্দেশে রওনা হন। তাঁদের বাসে তুলে দিতে রাজবাড়ী শহরের বড়পুলে এসেছিলেন জোসনার মা শাহিদা বেগম।
গতকাল সোমবার দুপুরে কথা হয় আলিফ, তার বড় ভাই জিসান মোল্লা ও নানি শাহিদা বেগমের সঙ্গে। শাহিদা বেগম বলেন, পাঁচ বছর আগে মান্নান মোল্লার সঙ্গে জোসনা খাতুনের বিচ্ছেদ হয়। এরপর দুই সন্তানকে নিয়ে তিনি বাবার বাড়িতেই থাকতেন। পরে সাভারের আশুলিয়ায় একটি পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। কয়েক মাস আগে আলিফকে জোসনার কাছে পাঠিয়েছিলেন শাহিদা। সেখানে আলিফকে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন জোসনা। ঈদের আগে মায়ের সঙ্গে আলিফ বাড়ি এসেছিল।
ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নানি শাহিদা আরও বলেন, ‘ঈদের কিছু মাংসসহ অনেক কিছু দিয়ে বুধবার বিকেল পৌনে চারটার দিকে জোসনা ও নাতি আলিফকে বড়পুল থেকে সৌহার্দ্য পরিবহনের বাসে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরি। কিন্তু আমার বুকের ভিতর কেমন যেন করছিল, মন মানছিল না। কিছুক্ষণ পর মেয়ে জোসনাকে ফোন করলে সে বলছিল, “মা, আলিফ কেমন যেন অনেক শুকিয়ে গেছে। আলিফ শসা খাইতে চাইছে, কিনে দিছি।” এই কথা বলতেই জোসনা চিৎকার করে বলে, “মা, আমাদের গাড়ি গাঙ্গে পড়ে যাচ্ছে।” এরপর আর ফোনে পাইনি। বারবার চেষ্টা করে জোসনার ফোন বন্ধ পাই। পদ্মা নদীতে বাসডুবির খবর পেয়ে ঘাটে গিয়ে আলিফকে পেলেও মাকে পাইনি। অনেক রাতে বাসের ভেতর থেকে আমার মেয়ের লাশ উদ্ধার করা হয়। এ সময় জোসনার হাতে ফোনটি ধরা অবস্থায় ছিল। আলিফকে ধাক্কা দিয়ে জানালা দিয়ে বের করে দিয়ে নিজেই শেষ হয়ে গেল। এখন আলিফ কিছুক্ষণ পরপর মাকে খুঁজে। আমি নিজে বুঝ নিতে পারছি না, আলিফকে বুঝ দেব কীভাবে।’
দুর্ঘটনা থেকে বেঁচে যাওয়া শিশু আলিফ মোল্লা বলে, ‘আমি ও আমার মা বাসের ভিতর একসাথে বসেছিলাম। হঠাৎ আমাদের বাসটি নদীর দিকে চলে যায়। বাস ডুবে যাওয়ার সময় মা আমারে ধাক্কা দিয়ে জানালা দিয়ে বের করে দেয়। মানুষের চাপাচাপিতে মা বের হতে পারেনি। আমি পানিতে ভাসতেছিলাম, তখন লোকজন গামছা দিয়ে বেঁধে আমারে ওপরে তোলে। আমি আমার মার জন্য অনেক কান্না করছিলাম। মাকে আর খুঁজে পাইনি।’
আলিফের বড় ভাই জিসান মোল্লা বলেন, ‘বাবার সঙ্গে মায়ের ছাড়াছাড়ি হওয়ায় ছোটবেলা থেকে অসহায় হয়ে পড়েছি। মা আমাদের জন্য গার্মেন্টসে কাজ নেয়। আমি নিজে একটি টেইলারে কাজ শিখছি। ছোট ভাই আলিফ নানির কাছে থাকত। ঈদের কয়েক মাস আগে মা আলিফকে নবীনগরের একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করে। মায়ের ইচ্ছা ছিল আলিফকে হাফেজ বানাবে। বাবা থাকতেও নেই, মাকে আল্লাহ দুনিয়া থেকে নিয়ে গেল। আমরা দুই ভাই এতিম হয়ে গেলাম। মায়ের ইচ্ছা পূরণ করতে পারি, সেই দোয়া করবেন।’