পটুয়াখালীতে খালের পচা পানির দুর্গন্ধে দেড় যুগের ভোগান্তি
দুটি উপজেলার ৯টি গ্রামের প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ ভোগান্তিতে।
খালটির গভীরতা কমে যাওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা ও প্রবাহ কমেছে।
বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা এবং শুকনা মৌসুমে বদ্ধ খালের পচা পানির দুর্গন্ধে দেড় যুগ ধরে ভোগান্তি পোহাচ্ছেন পটুয়াখালী সদর ও দুমকী উপজেলার ৯টি গ্রামের প্রায় ৭৫ হাজার মানুষ। অপরিকল্পিতভাবে মৌকরণ খাল খনন এবং খালের পাশে বাঁধ নির্মাণের কারণে এমন অবস্থা হয়েছে। এতে খালের পানির প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। দেখা দিয়েছে পানিদূষণও।
অভিযোগ রয়েছে, পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বিবেচনায় না নিয়ে অপরিকল্পিতভাবে মৌকরণ খাল খনন করে। সেই সঙ্গে সরু কালভার্ট ও স্লুইসগেট নির্মাণ করায় পানিনিষ্কাশন বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে জলাবদ্ধতায় প্রতিবছর দুটি উপজেলার নয়টি গ্রামের কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
বদ্ধ খালের পচা পানি আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, আর শুকনা মৌসুমে পচা পানির দুর্গন্ধে আমরা অতিষ্ঠ।মো. সাগর আকন, বাসিন্দা, মৌকরণ এলাকা, পটুয়াখালী সদর উপজেলা
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মৌকরণ বাজার-সংলগ্ন এলাকায় মৌকরণ খালটির অবস্থান। এ খালের এক পারে মৌকরণ গ্রাম, আরেক পারে দুমকী উপজেলার লেবুখালী গ্রাম। এ ছাড়া খাল-সংলগ্ন আছে আরও সাতটি গ্রাম। জলাবদ্ধতা ও দূষিত পানির কারণে খাল-সংলগ্ন সদর উপজেলার মৌকরণ ও শ্রীরামপুর, দুমকী উপজেলার লেবুখালী, কার্তিপাশা, পূর্বকার্তিকপাশা, আঠারগাছিয়া, শ্রীরামপুর, কালিকাপুর ও জামলা গ্রামের মানুষ অতিষ্ঠ।
পটুয়াখালী পাউবো সূত্র বলছে, ২০০৮ সালে মৌকরণ খাল খনন ও বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হয়। প্রকল্পটির আওতায় ১ হাজার ফুট দৈর্ঘ্য ও ১০০ ফুট প্রস্থ খাল খননের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে ৩০ থেকে ৪০ ফুট প্রশস্ত করে খালটি খনন করা হয়। খালের মাঝামাঝি স্থানে তুলনামূলক ছোট একটি বক্স কালভার্ট এবং শেষাংশে ছোট একটি স্লুইসগেট নির্মাণ করা হয়েছে। এতে মূল খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।
মৌকরণ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক সদস্য দেলোয়ার হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, পাউবো বাঁধ নির্মাণের সময় পরিকল্পনার বাইরে গিয়ে পানিনিষ্কাশনের জন্য বিকল্প খাল ও স্লুইসগেট নির্মাণ করেছিল। ফলে খাল-সংলগ্ন গ্রামগুলোর পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ে। খালটি পরিকল্পনা অনুযায়ী, পুনঃখনন এবং বক্স কালভার্টটি পূর্ণাঙ্গভাবে নির্মাণ করা হলে সমস্যার সমাধান হতে পারে।
দীর্ঘদিন পানিপ্রবাহ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন গ্রামের বর্জ্য খালে জমে আছে। গরু ও মুরগির খামারের বর্জ্যও খালে ফেলা হয়। এতে পানি দূষিত হয়েছে।
৭ আগস্ট পূর্বকার্তিকপাশা গ্রামের খালে সরেজমিনে দেখা যায়, কচুরিপানায় খালের বড় অংশ ভরে গেছে। অনেক স্থানে ফসলি জমি ও খালের পানির স্তর প্রায় সমান। নিচু বসতবাড়ি ও রাস্তাঘাটও পানিতে তলিয়ে রয়েছে। খালের পানির রং কালো ও দূষিত। নাকে লাগছে উৎকট দুর্গন্ধ।
মৌকরণ এলাকার বাসিন্দা মো. সাগর আকন বলেন, ‘বদ্ধ খালের পচা পানি আমাদের জন্য বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে। বর্ষা মৌসুমে জলাবদ্ধতা, আর শুকনা মৌসুমে পচা পানির দুর্গন্ধে আমরা অতিষ্ঠ। খালের দুই পাশে অসংখ্য কৃষিজমি। সেই সঙ্গে আছে বসতবাড়ি। জলাবদ্ধতায় কৃষকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, আবার পানি পচে দুর্গন্ধ ছড়ানোয় পরিবেশও দূষিত হচ্ছে।’
খালে বাঁধ থাকায় মালামাল বহনকারী ট্রলার ও নৌকা মৌকরণ বাজারের ঘাটে ভিড়তে পারে না বলে জানান স্থানীয় ব্যবসায়ী খলিল আকন ও আমানুল ইসলাম। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন পানিপ্রবাহ বন্ধ থাকায় বিভিন্ন গ্রামের বর্জ্য খালে জমে আছে। খাল-সংলগ্ন গরু ও মুরগির খামারের বর্জ্যও খালে ফেলা হয়। এতে খালের পানি দূষিত হয়েছে। খালের পানি ব্যবহারে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। রোগ দেখা দিচ্ছে গৃহপালিত গবাদিপশুরও।
পাউবোর পরিকল্পনাবহির্ভূত খাল খনন প্রকল্পের কারণে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন। জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান করা উচিত।
সরেজমিনে মৌকরণ বাজার থেকে প্রায় ৮–৯ কিলোমিটার অংশ ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন শাখা খাল মৌকরণ খালের সঙ্গে মিশেছে। পানি জমে থাকার কারণে কোথাও কোথাও মুগডালসহ বিভিন্ন ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। স্থানীয় মানুষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত বৃষ্টির পানি কৃষিজমি ও লোকালয় থেকে পায়রা নদীতে নামতে না পারায় তৈরি হয়েছে জলাবদ্ধতা। স্থানীয় কৃষকদের প্রায় ৮০ শতাংশ ফসলি জমি পানিতে তলিয়ে গেছে।
মৌকরণ বাজার-সংলগ্ন খালটি সম্প্রতি পরিদর্শন করেছেন জানিয়ে পটুয়াখালীর পাউবো কার্যালয়ের সদ্যবিদায়ী নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব প্রথম আলোকে বলেন, খালটির গভীরতা কমে যাওয়ায় পানির ধারণক্ষমতা ও প্রবাহ কমেছে। ফলে এই এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে। তবে চলতি অর্থবছরের মধ্যে খালটি পুনঃখননসহ প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) পটুয়াখালীর সাধারণ সম্পাদক কাজী সামসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, পাউবোর পরিকল্পনাবহির্ভূত খাল খনন প্রকল্পের কারণে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে আসছেন। জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এ সমস্যার দ্রুত সমাধান করা উচিত।