গতকাল বুধবার বেলা তিনটা থেকে বিকেল চারটা পর্যন্ত মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার মুক্তারপুর পুরোনো ফেরিঘাট এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। সংঘর্ষে পুলিশ-সাংবাদিকসহ উভয় পক্ষের অন্তত ৭০ জন আহত হয়েছেন। আহত ব্যক্তিদের মধ্যে বিএনপির নেতা-কর্মী ৫০-৬০ জন, ৬ জন সংবাদকর্মী এবং ৭ থেকে ৮ জন পুলিশ সদস্য রয়েছেন।

আহত ব্যক্তিদের মধ্যে তিনজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। তাঁরা হলেন মুন্সিগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের কর্মী তারেক রহমান (২০), মুক্তারপুর ওয়ার্ড যুবদলের কর্মী শাওন খান (২২) ও বিএনপির সমর্থক জাহাঙ্গীর মাদবর (৩৮)। এর মধ্যে জাহাঙ্গীরের অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন। তাঁর একটি চোখ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

জ্বালানি তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং ভোলা ও নারায়ণগঞ্জে বিএনপির তিন নেতা-কর্মী নিহত হওয়ার প্রতিবাদে বিভিন্ন স্থানের মতো গতকাল মুন্সিগঞ্জ শহরের অদূরে মুক্তারপুরে বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করে বিএনপি। বিএনপির নেতাদের দাবি, পুলিশের ছোড়া কাঁদানে গ্যাস, গুলি ও রাবার বুলেটে তাঁদের ৫০-৬০ জন নেতা-কর্মী আহত হয়েছেন।

প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও দলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেলা তিনটার দিকে পূর্বনির্ধারিত সমাবেশে যোগ দিতে বিভিন্ন উপজেলা থেকে আসা বিএনপির নেতা-কর্মীরা মুক্তারপুর মোড়ে জড়ো হতে থাকেন। পুলিশ তাঁদের সেখানে জড়ো হতে নিষেধ করলে তাঁরা মুক্তারপুর থেকে ট্রাকে পুরোনো ফেরিঘাট এলাকায় যান। সেখানে বিভিন্ন এলাকা থেকে ছোট ছোট মিছিল নিয়ে নেতা-কর্মীরা আসতে শুরু করেন। তখন সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম একটি মিছিলের ব্যানার ধরে টান দিলে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন জানান, সংঘর্ষের শুরুর ১০ থেকে ১৫ মিনিট দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। এরপর পুলিশকে তিন দিক থেকে আক্রমণ করেন বিএনপির কয়েক শ নেতা-কর্মী। প্রায় ৩৫ মিনিট ধরে দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ চলে। একপর্যায়ে জীবন বাঁচাতে পুলিশের পাঁচ-ছয়জন সদস্য ধলেশ্বরী নদীতে ঝাঁপ দেন। বিকেল চারটার দিকে অতিরিক্ত পুলিশ এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

সংঘর্ষে সদর সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তারিকুজ্জামান, পরিদর্শক মোজাম্মেল হক, দৈনিক দিনকাল–এর জেলা প্রতিনিধি গোলজার হেসেন, সমকাল–এর জেলা প্রতিনিধি কাজী সাব্বির আহম্মেদসহ পুলিশের ২০-২৫ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া বিএনপির এক কর্মী গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর জখম হয়েছেন বলে নেতা-কর্মীরা দাবি করছেন।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে পুলিশের এক উপপরিদর্শক প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের ওপর অতর্কিত হামলা চালাল। আমরা তাদের অনেক অনুরোধ করলাম। তারা শুনলই না। বৃষ্টির মতো ইটপাটকেল ছুড়ল। আমরা নিজেদের রক্ষা করতে একপর্যায়ে পানিতে লাফ দিলাম। সেখানেও আমাদের মারতে শুরু করল।’

জেলা বিএনপির একজন জ্যেষ্ঠ নেতা প্রথম আলোকে বলেন, পুলিশের অনুমতি নিয়েই শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি শুরু হচ্ছিল। নেতা-কর্মীরা মিছিল নিয়ে মুক্তারপুরে আসছিলেন। তখন পুলিশ বিএনপির কর্মীদের মিছিল করতে নিষেধ করে। নেতা-কর্মীরা মিছিল বন্ধ করে দেন। সে সময় পুলিশের একজন কর্মকর্তা মিছিল থেকে ব্যানার টেনে ছিঁড়ে ফেললে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়।

মুন্সিগঞ্জ সদর থানার ওসি তারিকুজ্জামান বলেন, পুলিশ শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছিল। বিএনপির নেতা-কর্মীরা পূর্বপরিকল্পিতভাবে পুলিশের দিকে ইটপাটকেল ছুড়তে থাকেন। নিষেধ করায় পুলিশের ওপর হামলা করেন।

পুলিশ সুপার মাহফুজুর রহমান আল মামুন প্রথম আলোকে বলেন, জেলায় এত দিন বিএনপি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। একটি জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবদুল হাইয়ের পক্ষ। অন্যটি সদস্যসচিব কামরুজ্জামান রতনের পক্ষ। আজ দুই পক্ষ একত্র হয়ে কর্মসূচি পালন করতে এলে তাদের মধ্যে হাতাহাতি হয়। পুলিশ হাতাহাতি বন্ধ করতে গেলে দুই পক্ষ একত্র হয়ে পুলিশের ওপর হামলা চালায়। পুলিশ আত্মরক্ষায় রাবার বুলেট, কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে।

রাতে জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, গতকাল বিকেলের সংঘর্ষে সাত থেকে আটজন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।

এদিকে মুন্সিগঞ্জে কর্মসূচিতে বাধা ও পুলিশি হামলার প্রতিবাদে বরিশালে তাৎক্ষণিক ঝটিকা বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রদল। গতকাল সন্ধ্যা সাতটার দিকে নগরের লাইন রোড থেকে মিছিলটি বের হয়ে সদর রোড ও বিবির পুকুরপাড় হয়ে বিএনপির কার্যালয়ে গিয়ে শেষ হয়।

গত ২২ আগস্ট থেকে গতকাল ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৩০ দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে বিএনপির ৫২টি কর্মসূচিতে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। ২৭টি স্থানে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বাড়িঘর, গাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা-ভাঙচুর হয়েছে। আর একই স্থানে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সমাবেশ থাকায় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করেছে ১৮টি স্থানে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন