পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম বলেছেন, রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকট সমাধানে বাংলাদেশ মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। বাংলাদেশ এমন পরিস্থিতি তৈরি করতে চায়, যাতে রোহিঙ্গারা নিরাপত্তা ও মর্যাদার সঙ্গে নিজ দেশে ফিরে যেতে পারেন।
গতকাল সোমবার কক্সবাজার শহরে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের এক গোলটেবিল বৈঠকে তিনি এ কথা বলেন। শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী এই বৈঠকের আয়োজন করে বাংলাদেশ সরকার ও নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল (এনআরসি)। মিয়ানমারের রাখাইনে গণহত্যা থেকে প্রাণে বাঁচতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার ৯ বছর পূর্তি উপলক্ষে এ বৈঠকের আয়োজন করা হয়।
‘দ্য রোহিঙ্গা এক্সোডাস: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড দ্য ফিউচার অব দিস প্রোট্র্যাক্টেড ক্রাইসিস’ শীর্ষক দুই দিনব্যাপী গোলটেবিলের প্রথম দিন ছিল গতকাল। উদ্বোধনী আলোচনায় পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম প্রধান অতিথি ছিলেন। এতে সভাপতিত্ব করেন শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান।
বৈঠকে রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন দেশি ও বিদেশি সহায়তা সংস্থার প্রতিনিধি ও বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও জীবিকার সুযোগ বাড়ানোর তাগিদ দেন। একই সঙ্গে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর তৈরি হওয়া চাপ কমাতে দীর্ঘমেয়াদি সহায়তা ও সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দেন।
রোহিঙ্গা সংকট দশম বছরে প্রবেশ করায় তাদের প্রয়োজনের ধরনও বদলেছে বলে মন্তব্য করেন নরওয়েজিয়ান রিফিউজি কাউন্সিল (এনআরসি) বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর দীপঙ্কর দত্ত। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জরুরি সহায়তার পাশাপাশি শিক্ষা, দক্ষতা ও জীবিকার সুযোগ এবং বহু বছর মেয়াদি অর্থায়নের প্রয়োজন রয়েছে।
এনআরসির বিশেষজ্ঞ ইজ্জাতুল্লাহ রাজী আশ্রয়শিবিরের আবাসন, ভূমি ও সম্পত্তি-সংক্রান্ত চ্যালেঞ্জগুলো তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্যের প্রসঙ্গে টেনে রোহিঙ্গা কো-অর্ডিনেশন প্ল্যাটফর্মের (আরসিপি) প্রিন্সিপাল কো-অর্ডিনেটর ইগর চিওবানু বলেন, রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী বাস্তুচ্যুতির নতুন ও জটিল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে এখন।
ফরেন কমনওয়েলথ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অফিসের (এফসিডিও) মানবিক সহায়তা বিভাগের প্রধান এলি মুডি বলেন, প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরি না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষার সময়টিকে কাজে লাগিয়ে শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে হবে। এ ছাড়া স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রয়োজনও বিবেচনায় রাখতে হবে।
নরওয়ে দূতাবাসের ডেপুটি হেড অব মিশন আলেক্সান্ডার ফাল্ক বিলডেন বলেন, রোহিঙ্গারা যত দিন বাস্তুচ্যুত থাকবে, তত দিন তাদের প্রাসঙ্গিক শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি।
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর কক্সবাজারের সাব অফিস প্রধান মার্চেল কোলোম বলেন, রোহিঙ্গারা যেন পর্যাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিজেরাই প্রত্যাবাসনের সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, সেই পরিবেশ তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সক্ষমতা ও সহনশীলতা জোরদারে কাজ করতে হবে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্তি ও সংঘর্ষ অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সাজ্জাদ সিদ্দিকী বলেন, শুধু রাজনৈতিক সমাধানের অপেক্ষা না করে বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষা ও আয়বর্ধক সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
বৈঠকে দা ডেইলি ওয়াদার সম্পাদক ও সাবেক অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রেস সচিব শফিকুল আলম রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মুসলিমপ্রধান দেশগুলোর সম্পৃক্ততা বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের একটি প্রজন্ম যেন হারিয়ে না যায়।
বৈঠকে বক্তব্য দেন দা ডেইলি স্টারের হেড অব ক্রাইম জামিল খান, স্থানীয় বেসরকারি সংস্থা পালসের নির্বাহী পরিচালক আবু মোরশেদ চৌধুরী, আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থা হিউম্যানিটি অ্যান্ড ইনক্লুসনের (এইচআই) কান্ট্রি ডিরেক্টর সিবগাতুল্লাহ আহমেদ,এনআরসি বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রাম মাইনুল ইসলাম এবং ইউনাইটেড কাউন্সিল অব রোহিঙ্গার প্রেসিডেন্ট প্যানেল মেম্বার ও রোহিঙ্গা কমিউনিটি নেতা মো. শোয়াইফ।
বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় আরআরআরসি কার্যালয়ের মাঠে দুই দিনব্যাপী চিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম। প্রদর্শনীতে রোহিঙ্গা ছেলেমেয়েদের হাতে আঁকা ছবি, রাখাইনে সংগঠিত গণহত্যার বিবরণ তুলে ধরে হাতে লেখা চিঠি, গণহত্যার ভয়াল দিনগুলোর ছবিসহ শতাধিক আলোকচিত্র ঠাঁই পায়।