দুই নদী পেরিয়ে ছেলের সংবর্ধনায় বাবা
খুলনার সুন্দরবনসংলগ্ন দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে প্রিয়ন্ত রায়। ভর্তি হয়েছে খুলনার সরকারি ব্রজলাল কলেজে। গ্রাম থেকে শহরে এসে একটি মেসও ঠিক হয়েছে। তবে মেসে উঠে এখনো ক্লাস শুরু করতে পারেনি প্রিয়ন্ত। এরই মধ্যে যোগ দিয়েছে শিখো–প্রথম আলো জিপিএ-৫ প্রাপ্ত কৃতী শিক্ষার্থীদের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে।
বাবা পরিতোষ রায়ের সঙ্গে খুব ভোরে বাড়ি থেকে রওনা হয়ে ঘণ্টা তিনেক পর অনুষ্ঠানস্থলে পৌঁছায় প্রিয়ন্ত। পরিতোষ রায় বলেন, ছেলে কোনোভাবেই এই আয়োজন মিস করতে চায়নি। তার অনেক বন্ধু এসেছে। ভোরে বাড়ি থেকে ইজিবাইকে প্রথমে বাজুয়া, এরপর পশুর নদ পার হয়ে ভ্যানে এবং পরে বাসে খুলনার রূপসায় আসেন তাঁরা। সেখান থেকে রূপসা নদী পার হয়ে পৌঁছান খুলনা জিলা স্কুলে।
পরিতোষ রায় বলেন, ‘আসতে পথে অনেক কষ্ট হয়েছে। তবে এখানকার উৎসবমুখর আয়োজন দেখে ভালো লাগছে।’ প্রিয়ন্তর মতো দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে অনেক শিক্ষার্থীই এসেছিল সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে।
সকাল সাড়ে আটটা বাজার আগেই শিক্ষার্থীদের পদচারণে মুখর হয়ে ওঠে খুলনা জিলা স্কুলের মাঠ। তাদের হইহুল্লোড়ে পুরো ক্যাম্পাসে তৈরি হয় উৎসবের আমেজ। ছোট ছোট দলে চলছিল আড্ডা। স্কুলজীবনের কাছের বন্ধু ও সহপাঠীদের দেখে কেউ কেউ জড়িয়ে ধরছিল। কেউ আবার মুঠোফোনে সেলফি তুলে ধরে রাখছিল স্মৃতি।
প্রথম আলোর আয়োজনে ও শিক্ষার ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ‘শিখো’র পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত হচ্ছে জিপিএ–৫ প্রাপ্ত কৃতী সংবর্ধনা। ‘স্বপ্ন দেখো জীবন গড়ো’ স্লোগান নিয়ে সারা দেশে ২০২৬ সালে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ–৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের ৬৪ জেলায় এ সংবর্ধনা দেওয়া হচ্ছে।
আয়োজনটি পাওয়ার্ড বাই বিকাশ এবং সহযোগিতায় থাকছে কনকর্ড গ্রুপ, ফ্রেশ, সেভয় আইসক্রিম, কনকা–গ্রী, মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংক পিএলসি, কোয়ালিটি গ্রুপ, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, জিংক বি, অতীশ দীপঙ্কর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ইউসিএসআই ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ শাখা ক্যাম্পাস, আম্বার আইটি লিমিটেড, এটিএন বাংলা ও প্রথম আলো বন্ধুসভা।
সংবর্ধনার খুলনা পর্ব আজ শনিবার খুলনা জিলা স্কুলে অনুষ্ঠিত হয়। সকাল ১০টায় জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল অনুষ্ঠান। বন্ধুসভার সভাপতি স্বর্ণকমল রায়ের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলোর খুলনার নিজস্ব প্রতিবেদক উত্তম মণ্ডল।
অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে শিক্ষাবিদ অধ্যাপক আনোয়ারুল কাদির বলেন, ‘তোমাদের নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। নিজের শক্তির ওপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখতে হবে। মনে রাখবে, তারুণ্যই সবচেয়ে বড় শক্তি। এই তারুণ্যের শক্তিকে সঠিক পথে, মানুষের কল্যাণে এবং সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে কাজে লাগাতে হবে।’
খুলনা জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ ফারুকুল ইসলাম বলেন, তোমাদের মধ্য থেকেই আগামী দিনের নায়কেরা বেরিয়ে আসবে। পড়াশোনার কোনো বিকল্প নেই। তাই আরও বেশি মনোযোগী হতে হবে, আরও বেশি পরিশ্রম করতে হবে। শুধু জিপিএ-৫ পাওয়াই জীবনের বড় অর্জন নয়, তোমাদের একজন আলোকিত মানুষ ও সুনাগরিক হিসেবে গড়ে উঠতে হবে।
অনুষ্ঠানে কৃতী শিক্ষার্থীদের মাদক, মিথ্যা ও মুখকে ‘না’ বলতে শপথ করান প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ। তিনি বলেন, পাঠ্যবই পরীক্ষায় পাস করার জন্য; কিন্তু পৃথিবীকে জানার জন্য নানা ধরনের বই পড়তে হবে। উপন্যাসও পড়তে হবে, সিনেমা দেখতে হবে, গানও শুনতে হবে। এসব তোমাদের একজন মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সাহায্য করবে। এর পর কুইজ বিজয়ী ১০ কৃতী শিক্ষার্থীর হাতে পুরস্কার তুলে দেন সাজ্জাদ শরিফ।
বন্ধুদের সঙ্গে দেখা, নতুন নেটওয়ার্ক
ফুলতলার রহমানিয়া এলিমেন্টরি অ্যান্ড সেকেন্ডারি স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া মরিয়ম আক্তার বাবা শেখ মাহবুর হোসেনের সঙ্গে অনুষ্ঠানে আসে। এ ধরনের সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এবারই প্রথম অংশ নিয়েছে সে। মরিয়ম বলল, ‘প্রথমবারের মতো এমন কোনো সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এলাম। অন্য বন্ধুরাও এসেছে। স্কুলের অনেক বন্ধু অন্য কলেজে ভর্তি হয়ে গেছে, তাদের সঙ্গেও দেখা হয়েছে। খুবই ভালো লাগছে।’
পাইকগাছার শহীদ কামরুল মেমোরিয়াল হাইস্কুল থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া ফারদিন ইসলাম সিয়ামও এসেছিল দুই বন্ধুর সঙ্গে। একই স্কুলের এই তিন বন্ধু ভর্তি হয়েছে পাবলিক কলেজে। ফারদিন বলল, ‘অনেক ভালো লাগছে। অনেকের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। একটা নেটওয়ার্কও তৈরি হচ্ছে।’
মেয়ের মেয়েকে নিয়ে অনুষ্ঠানে আসেন বীথি সাধু। তাঁর নাতনি তিতলি দত্ত ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার কামারখালীর একটি স্কুল থেকে জিপিএ-৫ পেয়ে খুলনা মহিলা কলেজে ভর্তি হয়েছে। তিতলি বলল, ‘আমার বন্ধুদের বেশির ভাগই ফরিদপুরের কলেজে। পুরোনো বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হওয়ার সুযোগ নেই; কিন্তু নতুন বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হবে, কথা হবে, এটা একটা বড় বিষয়।’
শেষ মুহূর্তে উপহার পাওয়ার আনন্দ
খুলনা সরকারি বালিকা বিদ্যালয় থেকে জিপিএ-৫ পাওয়া মাহফুজা মালিয়াতও এসেছিল অনুষ্ঠানে। তবে ভুলে মুঠোফোন ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সঙ্গে না আনায় কিছুটা বিপাকে পড়ে সে। অন্যরা যখন উপহার নিচ্ছিল এবং উদ্যাপন করছিল, তখন মন খারাপ হয়ে যায় মাহফুজার।
মঞ্চের কাছে এসে সমস্যার কথা জানায় সে। মাহফুজা বলল, ‘সবাই উপহার নিচ্ছে, উদ্যাপন করছে, আমি পারব না ভেবে খুব খারাপ লাগছিল। খুব টেনশন হচ্ছিল। আমিও সব নিতে পারব জেনে ভালো লাগছে।’
অনুষ্ঠানের সাংস্কৃতিক পর্বে গান পরিবেশন করেন ঐন্দ্রিলা রায় উর্বি ও অ্যাথেনা রায়। জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীরাও গান ও আবৃত্তি পরিবেশন করেন। অনুষ্ঠানের শেষাংশে শিল্পী মিঠুন রায়ের গানে মাতে শিক্ষার্থীরা।