সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় পেয়ে গেলাম একটি ব্যান্ড দলকে। অরণ্যের নীরবতা ভেঙে তারা ঢোল-মাদল বাজিয়ে একের পর এক সিঁড়ি বাইতে লাগল। বাদ্যের তালে তালে আমরাও ভুলে গেলাম সিঁড়ি ভাঙার অনভ্যাসের ক্লান্তি। আমাদের সঙ্গে ছিল শত শত পুণ্যার্থী ও পর্যটক। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ এসেছেন মনস্কামনা পূর্ণ করতে, কেউ এসেছেন সন্তানের অন্নপ্রাশনে। আর কেউ এসেছেন লোকালয়ের ধোঁয়া–ধূলি থেকে কিছুক্ষণ দূরে থাকতে করলডাঙার সবুজের মায়ায়।

default-image

ওপরে ওঠার পর জমকালো ফটক পেরিয়ে চোখে পড়ল কারুকার্যময় দেবী চণ্ডীর মূল মন্দির। এই মন্দিরের এক পাশে একটি কক্ষে ভক্তদের প্রণাম নিচ্ছেন বুলবুলানন্দ মহারাজ। সাদরে তাঁর কক্ষে আমাদের বসতে দিলেন। জানালেন আশ্রমের মহিমার কথা, ইতিহাস–ঐতিহ্যের কথা। পাশাপাশি ভক্তদের আশীর্বাদ করছেন। দুজন শিশুর মুখে অন্ন দিয়ে অন্নপ্রাশনের আনুষ্ঠানিকতাও সারলেন। তিনি বলেন, ‘আনুমানিক পাঁচ হাজার বছর আগে মেধস মুনি এখানে সাধনা শুরু করেন। এখন তো সহজে সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলেন। সিঁড়ি তো হয়েছে ২০ বছর আগে। আগেকার দিনে মুনিঋষি আর ভক্তরা এই পাহাড়ের চূড়ায় গাছের লতা বেয়ে ওপরে উঠতেন।’

বুলবুলানন্দ মহারাজ জানান, হাজার বছর আগের এ আশ্রম নতুন করে খুঁজে পান বেদানন্দ স্বামী নামের এক যোগী পুরুষ। তিনি একটি প্রাচীন পুথিতে মর্ত্যলোকে দেবী দুর্গার প্রথম পূজার স্থান মেধস মুনির আশ্রমের অবস্থান সম্পর্কে ইঙ্গিত পান। পবিত্র এ স্থান খুঁজে পেতে তিনি হিমালয় থেকে কন্যাকুমারিকা পর্যন্ত সমগ্র ভারতবর্ষ ভ্রমণ করেন।

বুলবুলানন্দ মহারাজ বলতে থাকেন, বেদানন্দ স্বামী অবশেষে সীতাকুণ্ডের চন্দ্রনাথ পাহাড়ে আসেন। সেই পাহাড়ে যোগসাধনা শুরু করেন। সাধনার সময় পুথিতে প্রাপ্ত সূত্র বা ইঙ্গিত অনুপুঙ্খ মিলিয়ে মেধস আশ্রমের অবস্থান চিহ্নিত করেন। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের অগ্নিকোণে চট্টগ্রাম থেকে ২০ কিলোমিটার দূরে কর্ণফুলী নদী পার হয়ে বোয়ালখালী থানার পূর্ব দিকে করলডাঙা পাহাড়ের অঞ্চলে তিনি খুঁজে পান মেধস আশ্রম। এটা ১৯০০ সালের ঘটনা। আজ থেকে ১২২ বছর আগে। বুলবুলানন্দ মহারাজ বলেন, শরতে দুর্গাপূজার উৎসবে এখানে অনেক জায়গা থেকে পুণ্যার্থীরা আসেন।

default-image

স্থানীয় অধিবাসীরা বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের দোসরেরা পুরো আশ্রম জ্বালিয়ে দিয়েছিল। কামানের গোলায় এর অবকাঠামো গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। মূল্যবান প্রত্নসম্পদ লুট করে নিয়ে যায় তারা। এরপর প্রায় সাত বছর সব কার্যক্রম বন্ধ ছিল।

দেবী চণ্ডীর মন্দিরের পাশের আরেক দিকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে পাওয়া গেল সীতার পুকুর। তারও পেছনে রয়েছে ঝরনা। আমরা একে একে ভিন্ন ভিন্ন কক্ষে দেখলাম দুর্গামূর্তি, কামাখ্যামূর্তি, কালীমূর্তি, শিব, তারা, রামকৃষ্ণ ও গঙ্গামূর্তি। সব কটি মন্দিরেই ভক্তদের ভিড়। আর আশ্রমের বাইরে খোলা চত্বরে চলছিল বড় বড় চুল্লিতে রান্নার আয়োজন। তারই পাশে প্রসাদের জন্য দীর্ঘ লাইন ধরে বসে আছেন ভক্তকুল। জানতে চাইলাম, এত মানুষের খাবার জোগায় কারা? তাঁরা বলেন, ভক্তরা বিভিন্ন উপলক্ষে এখানে খাবারের আয়োজন করেন। নিজেরা রান্না করে নিজেরাই খান। চণ্ডীমন্দিরের পাশে একটি গাছের চারপাশে ধূপকাঠি ও মোমবাতি জ্বালিয়ে রাখছেন অনেকে। সেই গাছের নিচে ১০ থেকে ১২টি রঙিন কচ্ছপ। তাদের খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন কেউ কেউ। চণ্ডীমন্দিরের পাশে আছে অতিথিশালা। দূর থেকে আসা পুণ্যার্থীরা এখানে অবস্থান করতে পারেন।

default-image

মাঝেমধ্যে উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্যি, মানুষের কোলাহল, পুণ্যার্থীদের আরাধনা—সব মিলিয়ে উৎসবের আমেজ। বহু ওপর থেকে নিচের দিকে নামার সময় দেখলাম, একজন দৃষ্টি প্রতিবন্ধী বংশীবাদক একটি বালকের হাত ধরে ওপরে উঠছেন। এখানকার চিরহিরৎ বনের শোভা, ফুল, কক্ষে কক্ষে সাজিয়ে রাখা দেবদেবীর মূর্তি—কিছুই তিনি দেখছেন না। তবু তাঁর সুর উৎসবকে আরও মধুর করে তুলছে। তিনিও এই উৎসবের অংশ। তাঁর কথাও কখনো ভুলতে পারব না।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন