‘ঘরে বয়ে থাকলে চলব ক্যামনে, ঝড়বৃষ্টি তো আর খাওন দিব না’

বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে সবজি বিক্রি করছিলেন বৃদ্ধ হেলাল উদ্দিন। আজ বুধবার সকালে জামালপুর শহরের বানিয়া বাজার এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

তিন চাকার ভ্যানে করে সবজি নিয়ে পথে নেমেছেন হেলাল উদ্দিন (৬৫)। বৃষ্টিঝড় উপেক্ষা করে আজ বুধবার ভোরে এক হাতে ছাতা ও অন্য হাতে ভ্যান ঠেলে তিনি রওনা হন জামালপুর শহরে। এক দিন বসে থাকলে তাঁর ঘরে চুলায় আর আগুন জ্বলবে না। তাই ভিজে ভিজেই সবজি বিক্রির চেষ্টা করছেন।

আজ সকাল সাড়ে ১০টার দিকে জামালপুর শহরের বানিয়া বাজারসংলগ্ন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কথা হয় হেলাল উদ্দিনের সঙ্গে। তাঁর বাড়ি জামালপুরের সীমান্তবর্তী শেরপুর সদর উপজেলার রামেরচর এলাকায়। জামালপুর শহর থেকে তাঁর বাড়ির দূরত্ব প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার। প্রায় প্রতিদিনই ভ্যানে করে তিনি সবজি নিয়ে জামালপুর শহরে বিক্রি করতে আসেন।

হেলাল উদ্দিন জানান, তাঁর দুই মেয়ে ও এক ছেলে। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন, ছেলেও বিয়ের পর আলাদা থাকছেন। এই বয়সেও তাঁকে প্রতিদিন পরিশ্রম করে সংসার চালাতে হয়। অল্প পুঁজির ব্যবসা। তাই এক দিন বসে থাকলে আর সংসার চলে না। চাষের জমিজমাও নেই। সবজি বিক্রির আয়ের ওপর নির্ভর করে সব খরচ।

দীর্ঘ সময় বৃষ্টিতে ভেজায় একপর্যায়ে ঠান্ডায় কাঁপছিলেন হেলাল উদ্দিন। এই প্রতিবেদক জানতে চাইলে মুচকি হেসে তিনি বলেন, ‘বাপু, ৩ হাজার ২০০ টেহার পুঁজি। ঘরে বয়ে থাকলে চলব ক্যামনে? ঝড়বৃষ্টি তো আর খাওন দিব না। এই বাও-বাজারে দিনরাত খাইটেও সংসার চলবার চায় না।’

একটু থেমে হেলাল উদ্দিন আবার বলেন, ‘ফজরের নামাজ পড়ে বৃষ্টির মইধ্যে ভ্যান নিয়া পাইকেরি বাজারে গেছি। উনথন ভিইজা ভিইজা সবজি কিনছি। আবার টাউনে বেচতে আনছি। বাইত ফিত্তে ফিত্তে রাইত ১২ডা বাজব। এর মইধ্যে কাপড়ও হুকায়ে যাইব। এডাই আমগো জীবন। বুঝমান হইবার পর থেইক্যা এইভাবেই চলতাছে। এহন তো জীবন শেষের দিকেই।’

হেলাল উদ্দিন প্রতিদিন পাইকারি বাজার থেকে দুই-তিন হাজার টাকার বিভিন্ন সবজি কেনেন। ওই সবজিবাহী ভ্যান ঠেলে জামালপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করেন। এতে অনেক সময় তাঁর ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় হয়। সারা দিন তাঁর ১০০ থেকে ১৫০ টাকা খাবার বাবদ খরচ হয়। বাকি টাকা নিয়ে বাড়িতে ফিরে যান।

ওই আয় দিয়ে সংসার কীভাবে চলে, এমন প্রশ্নে হেলাল উদ্দিন কিছুক্ষণ নীরব থেকে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। এরপর বলেন, ‘আল্লাহ যেমনে চালায়! কোনো রহমে ডাইল-ভাত খেয়ে দিন চলে। ঈদ ছাড়া একটুকরা গরুর মাংস কিনবার সাহস করি না। এক ঈদে মাংস খাইছি—এহন সামনের কোরবানির ঈদে কপালে জুটলে আবার খামু। তবে মধ্যে মধ্যে বাজার থাইক্যা মাছ কিনি। বেচে যাওয়া তরকারি দিয়া রান্না কইরা খাওয়াদাওয়া চলে।’

বাজারের প্রসঙ্গ উঠতেই ক্ষোভ আর হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘বাজারের সব জিনিসপত্রে তো আগুন। এডা শুধু আমার অবস্থা না, প্রতিডা গরিব মানুষের একই কষ্ট।’

ছেলে থাকতেও এ বয়সে কষ্ট করার কারণ জানতে চাইলে হেলাল উদ্দিন বলেন, ‘পোলাডার নিজেরই দিন চলে না। সেও বাজারে বইস্যা ফল বিক্রি করে। বাজারের যে অবস্থা, তার নিজের সংসারই চলে না—আমাগো আর কী দেখাশোনা করব? তাই নিজেরডা নিজেই কইরা খাই।’

কথার ফাঁকে হেলাল উদ্দিনের চোখে–মুখে ক্লান্তি দেখা গেলেও তা প্রকাশ করতে চান না তিনি। জীবনের কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়ে বলে ওঠেন, ‘যত দিন শরীর ভালা আছে, তত দিন এমনেই চলব। পরে কী হইব, সেটা তো আর জানি না।’