দুটি আহ্বায়ক কমিটি নিয়ে কোন্দল চরমে 

সম্প্রতি গৌরনদী ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। অর্থের বিনিময়ে কমিটি গঠন করার অভিযোগে একটি পক্ষ আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

বরিশাল জেলার মানচিত্র

নতুন কমিটি নিয়ে বরিশালের গৌরনদী উপজেলা বিএনপিতে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ প্রকট আকার ধারণ করেছে। সম্প্রতি বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপি গৌরনদী ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করে। ওই ঘোষণার পর একটি পক্ষ টাকা নিয়ে গঠনের অভিযোগ তুলে ওই দুই কমিটি বাতিলের দাবি জানানো হয়েছে। দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধের জেরে এবং ক্ষমতাসীন দলের হামলা-মামলার আতঙ্কে গৌরনদীতে ৯ বছর ধরে দলীয় কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে।

উপজেলা বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, ৮ ফেব্রুয়ারি বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক মো. শহিদুল্লাহ দেওয়ান ও সদস্যসচিব মিজানুর রহমান গৌরনদী উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করেন। সৈয়দ সরোয়ার আলমকে আহ্বায়ক ও জহীর সাজ্জাত হান্নান শরীফকে সদস্যসচিব করে উপজেলা বিএনপির ৪৪ সদস্যের এবং জাকির হোসেনকে আহ্বায়ক ও মো. ফরিদ মিয়াকে সদস্যসচিব করে ৩০ সদস্যের পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। ঘোষিত কমিটির অধিকাংশ সদস্য বিএনপির সাবেক তথ্য ও গবেষণাবিষয়ক সম্পাদক এম জহীর উদ্দিনের (স্বপন) অনুসারী।

পদ-বাণিজ্যের অভিযোগ তুলে কমিটি প্রত্যাখ্যান করেন কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সহসাংগঠনিক সম্পাদক আকন কুদ্দুসুর রহমান, সদস্য আবদুস সোবাহান ও গাজী কামরুল ইসলামের অনুসারীরা। তাঁদের অভিযোগ, আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব অর্থের বিনিময়ে এসব কমিটি করেছেন।

গৌরনদী উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি মঞ্জুর হোসেন বলেন, গৌরনদী উপজেলা আহ্বায়ক সৈয়দ সরোয়ার আলম ১৫ বছর ধরে স্থায়ীভাবে ঢাকায় বসবাস করছেন। সরোয়ারের ছোট ভাই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী সৈয়দ বদরে আলমের কাছ থেকে টাকাপয়সা নিয়ে তাঁকে আহ্বায়ক করেছে জেলা কমিটি। সদস্যসচিব জহীর সাজ্জাত স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সময়ে বিএনপি, ছাত্রদল ও যুবদলের নেতা-কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন।

বিরোধ শুরু যেভাবে

দলীয় সূত্র জানায়, ২০০৮ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আবদুস সোবহানের বিরুদ্ধে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন জহীর উদ্দিন। নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিজয়ী হন। এই পরাজয়ের জন্য দলের নেতা-কর্মীরা জহীর উদ্দিনকে দায়ী করেন। এরপর থেকে আবদুস সোবহান, আকন কুদ্দুসুর রহমান ও গাজী কামরুল ইসলামের সঙ্গে জহীর উদ্দীনের কর্মী-সমর্থকদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়।

উপজেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি আনোয়ার সাদাত বলেন, জেলা কমিটির সদস্যসচিব মিজানুর রহমান জাতীয় পার্টির (জাপা) ছাত্রসংগঠন ছাত্র সমাজের গৌরনদীর সভাপতি ছিলেন। তাই তিনি উপজেলা কমিটির আহ্বায়ক পদে সাবেক জাপা নেতা সৈয়দ সরোয়ার আলম, সদস্যসচিব পদে সাবেক জাপা নেতা জহীর সাজ্জাতের নাম ঘোষণা করেছেন। উপজেলা ও পৌর কমিটিতে দলছুট জাপার নেতাদের পদ দিয়ে পুনর্বাসিত করে বিএনপির ত্যাগী নেতাদের দল থেকে বিতাড়িত করেছেন। গৌরনদী বিএনপি বর্তমানে জাতীয়তাবাদী জাতীয় পার্টিতে পরিণত হয়েছে।

পৌর বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির সদস্য এস এম মনিরউজ্জামান ও গৌরনদী পৌর বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা শাহ আলম ফকির বলেন, আহ্বায়ক পদে জাকির হোসেন ও সদস্যসচিব পদে মো. ফরিদ মিয়াকে দিয়ে পৌরসভার পূর্ণাঙ্গ আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। জহীর উদ্দিনের অনুসারী হিসেবে জেলা কমিটির অর্থের বিনিময়ে তাঁদের আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের পদ দিয়েছেন।

গৌরনদী উপজেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক তাইফুর রহমান বলেন, বরিশাল উত্তর জেলা, গৌরনদী উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বাতিলের জন্য ১৬ ফেব্রুয়ারি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেছেন তাঁরা। 

নেতা–কর্মীরা জানান, উপজেলা ও পৌর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বাতিলের দাবিতে বরিশাল উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক শহিদুল্লাহ ও সদস্যসচিব মিজানুর রহমানের কুশপুত্তলিকা দাহসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে আসছেন পদবঞ্চিত নেতা-কর্মীদের পক্ষের লোকজন।

অর্থের বিনিময়ে কমিটি গঠনের অভিযোগ অস্বীকার করে উত্তর জেলা বিএনপির সদস্যসচিব মিজানুর রহমান বলেন, ‘পদ না পাওয়া নেতা-কর্মীরা আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে।’ কমিটির আহ্বায়ক শহিদুল্লাহ দেওয়ান বলেন, ‘গৌরনদীতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটিতে প্রভাবশালী চার নেতা রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে বিরোধ আছে। পদবঞ্চিতরা আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করছেন।’

এ বিষয়ে বরিশাল-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য এম জহীর উদ্দিন বলেন, ‘বিএনপি একটি বড় দল। অধিক যোগ্য নেতা ও নেতৃত্ব থাকায় বিরোধ আছে। কিন্তু সেটা বড় কোনো সমস্যা নয়। আর উপজেলা ও পৌর কমিটি ঘোষণা করার এখতিয়ার জেলা কমিটির, ঘোষিত কমিটির দায়দায়িত্ব তাদেরই। এ নিয়ে আমার কোনো মন্তব্য নেই।’

বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক বিলকিস জাহান শিরিন বলেন, এ ঘটনায় বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী সোহেলের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। ওই তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর সবাইকে নিয়ে সমন্বয়ের মাধ্যমে বিষয়টি সমাধান করা হবে।