চুয়েটে উপাচার্য বদলে এত ক্ষোভ কেন
উপাচার্যকে ফিরিয়ে আনার দাবিতে আন্দোলনে নেমেছেন চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) শিক্ষার্থীরা। সেই আন্দোলনেই আটকে গেছে তাঁদের পরীক্ষা। ইতিমধ্যে অন্তত ছয় বিভাগের বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। ক্লাসও বন্ধ। শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন। তবু আন্দোলনকারীরা বলছেন, দাবি পূরণ না হওয়া পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে ক্ষোভের অন্তত চারটি কারণ জানা গেছে। এগুলোর একটি অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম শিক্ষার্থীদের কথা সরাসরি শুনতেন। বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে তাঁর যোগাযোগের সুবাদে শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা ও চাকরির সুযোগ পেয়েছেন। বাকি তিনটি হলো চুয়েটের বাইরে থেকে উপাচার্য নিয়োগ; মাত্র ৫৬ দিনের মাথায়, কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই উপাচার্যকে সরানো; নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে ‘বিতর্ক’।
এর মধ্যে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম দায়িত্ব নিয়েছেন। তবে আন্দোলনের কারণে ক্যাম্পাসে যেতে পারেননি।
২১ সেপ্টেম্বর উপাচার্য পরিবর্তনের প্রজ্ঞাপন জারির রাতেই শিক্ষার্থীরা মিছিল করে উপাচার্য ভবনে তালা দেন। পরদিন মূল ফটক আটকে শুরু করেন সর্বাত্মক ‘শাটডাউন’। সরকারি ছুটির দিনেও চলে অবস্থান ও গণস্বাক্ষর সংগ্রহ। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম জানিয়েছেন, ইতিমধ্যে ছয় বিভাগে বিভিন্ন বর্ষ ও সেমিস্টারের চূড়ান্ত পরীক্ষা হওয়ার কথা ছিল। সেগুলো নেওয়া যায়নি।
চুয়েটের যাত্রা শুরু ১৯৬৮ সালে প্রকৌশল কলেজ হিসেবে। পরে এটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি বা বিআইটি হয়। ২০০৩ সালের ১ সেপ্টেম্বর পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে কার্যক্রম শুরু করে। বিশ্ববিদ্যালয়টির ১৮ বিভাগে শিক্ষার্থী ৬ হাজার ৩৬৭ জন, শিক্ষক ৩৬১ জন। উপাচার্য নিয়োগ নিয়ে বিরোধ দীর্ঘ হওয়ায় তাঁদের শিক্ষা ও গবেষণার কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
কেন আন্দোলন-বিক্ষোভ
গত ২৭ জুলাই চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান বিশ্ববিদ্যালয়টির যন্ত্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। পরদিন দায়িত্ব নেন। ২১ সেপ্টেম্বর তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নতুন উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হয়। পরিবর্তনের কারণ প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ ছিল না। সিদ্ধান্তটির কথা আগে থেকে জানতেন না বলে সেদিন প্রথম আলোকে জানান আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম।
***২৭ জুলাই: অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম চুয়েটের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পান। পরদিন দায়িত্ব নেন। *** ২১ সেপ্টেম্বর: অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমকে নিয়োগ দেওয়া হয়। রাতেই শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ শুরু। *** ২২ সেপ্টেম্বর: মূল ফটকে তালা দিয়ে সর্বাত্মক শাটডাউন শুরু করেন শিক্ষার্থীরা। *** ২৪ সেপ্টেম্বর: আন্দোলনের মধ্যে ক্যাম্পাসে না এসে দায়িত্ব নেন নতুন উপাচার্য। *** ২৬ সেপ্টেম্বর: নতুন উপাচার্যের একটি বক্তব্যের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের প্রতীকী লাল কার্ড প্রদর্শন। *** ২৭ সেপ্টেম্বর: শাটডাউনের ষষ্ঠ দিনে ‘৫৬ দিনেই কেন?’ প্রশ্ন তুলে শিক্ষার্থীদের প্রশ্নযাত্রা।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের সঙ্গে তাঁদের সম্পর্ক উপাচার্য হওয়ার পর তৈরি হয়নি। তিনি নিজেও চুয়েটের স্নাতক। ২০০৫ সালে এখানে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। পরে জাপানের হোক্কাইডু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর এবং অস্ট্রেলিয়ার সেন্ট্রাল কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করেন। শিক্ষক হিসেবে তাঁর সহায়তায় চুয়েটের শিক্ষার্থীরা নরওয়ে, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় বৃত্তি পেয়েছেন। ইতালির শিল্পপ্রতিষ্ঠান ড্যানিয়েলিতে পাঁচ প্রাক্তন শিক্ষার্থীর চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকার কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীরা।
পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী তুষার আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন উপাচার্য যখন শিক্ষার্থীদের কথা শুনতে চান, তখন তাঁর সঙ্গে কাজ করার একটা আস্থা তৈরি হয়।’ ওই আস্থার জায়গা থেকেই তাঁরা আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে আবার দায়িত্বে দেখতে চান বলে জানান।
হঠাৎ করে উপাচার্য বদলের ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। একজনকে নিয়োগ দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রকাশ্যে না এনে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কাম্য ছিল না। অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগে আইনি বাধা নেই। তবে বাইরে থেকে আসা একজন শিক্ষকের বিশ্ববিদ্যালয়টির সমস্যা বুঝতে সময় লাগবে। সরকার সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। আর আগের উপাচার্যকে সরানোর পেছনে কোনো কারণ থাকলে, সেটি প্রকাশ্যে জানানো উচিত।
কম্পিউটার বিজ্ঞান ও কৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী ওমর ফাইয়াজ অনিম বলেন, ‘তিনি (আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম) বেশ কিছু কাজ শুরু করেছিলেন, কিছু পরিকল্পনাও করেছিলেন। আমরা মনে করি, তাঁকে আরও সময় দেওয়া উচিত ছিল।’ যন্ত্রকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী যুলক্বার নাঈন মিহাদের প্রশ্ন, আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের কাজে কোনো ভুল থাকলে তা কেন জানানো হলো না।
দায়িত্ব নেওয়ার পর আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অফিস চালু, গবেষণার সুযোগ বাড়ানো এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ কাজের পরিকল্পনা জানিয়েছিলেন আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, বিশ্ববিদ্যালয় দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন তাঁদের মধ্যে সাড়া ফেলেছিল। ভাষাশিক্ষা কেন্দ্র চালু ও সমাবর্তন আয়োজনের পরিকল্পনার কথাও বলেছেন তাঁরা।
চুয়েট শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মো. আবুল হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘অল্প সময় কাজের সুযোগ দিয়ে ব্যাখ্যা ছাড়া আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরানো তাঁদের কাছে অপমানজনক মনে হয়েছে। তাঁর কার্যক্রম খুবই ভালো ছিল। তিনি অনেক কাজ করছিলেন। এসব দিক বিবেচনা করেই আমরা তাঁর পক্ষে অবস্থান নিয়েছি।’
শিক্ষার্থীরা কেন আন্দোলন করছেন, তা তাঁদের নিজস্ব বিষয় বলে এ নিয়ে মন্তব্য করতে চাননি মো. আবুল হাসান। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রকল্যাণ অধিদপ্তরের পরিচালক অধ্যাপক সাইফুল ইসলামও আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে সমর্থন দিয়েছেন। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের আন্দোলন যৌক্তিক।
নতুন উপাচার্যের আগের দায়িত্বকাল নিয়েও প্রশ্ন
নতুন উপাচার্য শেখ শরীফুল আলম চুয়েটেরই সাবেক শিক্ষার্থী। এখান থেকে ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক হওয়ার পর ইতালিতে স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি করেন। শিক্ষকতা করেছেন কুয়েটে। চুয়েটে নিয়োগ পাওয়ার আগে তিনি কুয়েটের সহ–উপাচার্য ছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ২০২৪ সালের ৪ ডিসেম্বর কুয়েটের সহ–উপাচার্য নিয়োগ পান অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলম। নিয়োগের ৪ মাস ২১ দিনের মাথায়, আন্দোলনের মুখে ২০২৫ সালের ২৫ এপ্রিল তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
কেন অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল, সেটি জেনে নেওয়া যাক। গত বছরের ১৮ ফেব্রুয়ারি কুয়েটে ছাত্ররাজনীতি বন্ধের দাবিকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষে শতাধিক শিক্ষার্থী আহত হন। এরপর ক্যাম্পাসে আন্দোলন ও অচলাবস্থা শুরু হয়। সংঘর্ষের ঘটনায় ৩৭ শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্তের পর উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিও জোরালো হয়। সেই আন্দোলনের মধ্যে গত বছরের এপ্রিলে উপাচার্য অধ্যাপক মুহাম্মদ মাছুদ ও সহ-উপাচার্য শেখ শরীফুল আলমকে অব্যাহতি দেয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়।
চুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের একাংশের প্রশ্ন, কুয়েটে আন্দোলনের মধ্যে সহ-উপাচার্যের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পাওয়া একজনকে চুয়েটের উপাচার্য করা হলো কেন। তবে আন্দোলনের শুরুতে শিক্ষার্থীরা বলেছিলেন, নতুন নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিকে নিয়ে তাঁদের আপত্তি নেই; আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে সরানোর ব্যাখ্যাই তাঁরা চান।
চুয়েটের উপাচার্যদের তালিকা অনুযায়ী, অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষককে এখানে উপাচার্য নিয়োগের ঘটনা এটি দ্বিতীয়। প্রথমজন ছিলেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মীর শহিদুল ইসলাম। বিআইটি থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পর তৎকালীন পরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক প্রথম উপাচার্যের দায়িত্ব পালন করেন। এরপর ২০০৪ সালের ২৫ জুলাই দায়িত্ব নেন মীর শহিদুল ইসলাম। তিনি দায়িত্ব পালন করেছিলেন ২০০৭ সালের ২৫ জুলাই পর্যন্ত।
শেখ শরীফুল আলমসহ চুয়েটে এ পর্যন্ত নয়জন শিক্ষক উপাচার্যের দায়িত্ব পেয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় দায়িত্বে ছিলেন তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক কৌশল বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ রফিকুল আলম। ২০১৬ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত আট বছরের বেশি সময় তিনি এই পদে ছিলেন।
বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে শেখ শরীফুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, বিভাগীয় প্রধান, ডিন ও পরিচালকদের সঙ্গে আলোচনা করছেন তিনি। বিভিন্ন ব্যাচ ও ক্লাবের প্রতিনিধি হয়েও শিক্ষার্থীরা তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। সবাইকে আশ্বস্ত করতে পারলে দ্রুত ক্যাম্পাসে যাবেন বলে জানান তিনি।
তবে আন্দোলনের মধ্যে ক্যাম্পাসে না এসে শেখ শরীফুল আলমের দায়িত্ব নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ আবু কাউছার। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘উপাচার্য পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত শিক্ষকদেরও মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে। অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে এই সরকারই নিয়োগ দিয়েছিল। তাঁর কাজে আপত্তি থাকলে সেটি জানানো যেত।’ এ পরিস্থিতিতে নতুন উপাচার্য দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানাতে পারতেন বলেও মনে করেন মোহাম্মদ আবু কাউছার। তাঁর আশঙ্কা, শেষ পর্যন্ত ক্ষতিটা শিক্ষার্থীদেরই হবে।
শিক্ষক সমিতির অবস্থান ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলন নিয়ে জানতে চাইলে স্থাপত্য ও পরিকল্পনা অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ রাশিদুল হাসান মন্তব্য করতে রাজি হননি। যন্ত্রকৌশল ও উৎপাদন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ মিজানুর রহমানকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি।
এদিকে আন্দোলনের মধ্যে তাঁর কোনো ইন্ধন নেই বলে জানিয়েছেন আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েম। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, শিক্ষক, কর্মকর্তা বা কর্মচারী কাউকে কর্মসূচি নিতে বলেননি। শিক্ষার্থীদের সামনে উচ্চশিক্ষা ও কাজের সুযোগ তুলে ধরার চেষ্টা করেন তিনি। শিক্ষকতাই তাঁর একমাত্র কাজ।
বন্ধ পরীক্ষার চাপ, বাড়ছে বিরোধ
আন্দোলনকারীদের মধ্যেও পড়াশোনার ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ আছে। ইতিমধ্যে পুরকৌশল, যন্ত্রকৌশল, পেট্রোলিয়াম ও মাইনিং ইঞ্জিনিয়ারিংসহ ছয় বিভাগের পরীক্ষা স্থগিত হয়েছে। পুরকৌশল বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী এজাজ মাহমুদ প্রথম আলোকে বলেন, তাঁদের অনেকের পরীক্ষা চলছিল। শাটডাউন দীর্ঘ হলে শিক্ষাবর্ষ পিছিয়ে যেতে পারে। পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মঈনুল ইসলাম জানান, শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শিক্ষকেরাও আন্দোলনে থাকায় পরীক্ষা নেওয়া যাচ্ছে না। স্থগিত পরীক্ষার নতুন সূচি ঘোষণা করা হয়নি।
এর মধ্যে নতুন উপাচার্য অধ্যাপক শেখ শরীফুল আলমের সঙ্গেও আন্দোলনকারীদের বিরোধ বেড়েছে। তিনি ক্যাম্পাসে না এসে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁকে প্রত্যাখ্যানের ঘোষণা দেন শিক্ষার্থীরা। অন্য একটি গণমাধ্যমে আন্দোলনকারীর সংখ্যা নিয়ে তাঁর বক্তব্যের প্রতিবাদে গত শনিবার তাঁকে প্রতীকী লাল কার্ড দেখান তাঁরা।
গতকাল রোববার টানা ষষ্ঠ দিনের মতো শাটডাউন চলে। বেলা দুইটায় শহীদ মিনারে ‘৫৬ দিনেই কেন?’ লেখা প্ল্যাকার্ড নিয়ে ‘প্রশ্নযাত্রা’ কর্মসূচি পালন করেন শিক্ষার্থীরা। সেখান থেকে মিছিল করে স্বাধীনতা চত্বর ঘুরে আবার শহীদ মিনারে এসে অবস্থান নেন তাঁরা।
তবে নতুন উপাচার্যকে কাজের সুযোগ দেওয়া উচিত বলে মনে করেন চুয়েট ছাত্রদলের সভাপতি ওয়াসিফ রাশেদ। তিনি দাবি করে বলেন, ‘আমরা এই আন্দোলনের পক্ষে নই। বরং আমরা সরকারি সিদ্ধান্তের পক্ষে। এই আন্দোলন আওয়ামী সুবিধাভোগী শিক্ষক, সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ও সক্রিয় শিবির কর্মীদের সরাসরি ইন্ধনে হচ্ছে। অল্প কিছু সাধারণ শিক্ষার্থী আছে। তাঁদের আবেগকে ব্যবহার করা হচ্ছে। আর নতুন উপাচার্য যথেষ্ট যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ।’
ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মো. তৌফিক হাসান চৌধুরী বলেন, ‘নতুন উপাচার্যের কাজ দেখার আগেই তাঁকে প্রত্যাখ্যান করা ঠিক হচ্ছে না। তিনি অন্যায় বা ভুল করলে তখন আন্দোলন করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে আমরাও আন্দোলনকারীদের পাশে থাকব।’
চুয়েট আইন, ২০০৩ অনুযায়ী চার বছরের জন্য উপাচার্য নিয়োগ দেন রাষ্ট্রপতি, যিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য। আইনের ১০(২) ধারায় প্রয়োজন মনে করলে যেকোনো সময় কারণ দর্শানো ছাড়াই উপাচার্যকে অব্যাহতি দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে আচার্যের। তবে আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা জানতে চাইছেন, অধ্যাপক আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমের ক্ষেত্রে মাত্র ৫৬ দিনের মাথায় সেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো কেন।
তবে হঠাৎ করে উপাচার্য বদলের ঘটনায় সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করেন চুয়েটের প্রথম উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একজনকে নিয়োগ দেওয়ার দুই মাসের মধ্যে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রকাশ্যে না এনে আরেকজনকে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত কাম্য ছিল না। অন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উপাচার্য নিয়োগে আইনি বাধা নেই। তবে বাইরে থেকে আসা একজন শিক্ষকের বিশ্ববিদ্যালয়টির সমস্যা বুঝতে সময় লাগবে।
মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক বলেন, ‘সরকার সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করতে পারে। আর আগের উপাচার্যকে সরানোর পেছনে কোনো কারণ থাকলে সেটি প্রকাশ্যে জানানো উচিত।’