দেশসেবার সুযোগ পেলে চাঁদাবাজদের অস্তিত্ব রাখব না: কুমিল্লায় জামায়াত আমির
জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান বলেছেন, ‘জুলাইয়ের পর কেউ কেউ চাঁদাবাজি ও লুটপাটের রাজনীতি শুরু করেছে। তারা চাঁদা নেয় আবার সাবধান করে যায়, “খবরদার কাউকে বলবা না আমি যে চাঁদা নিয়েছি।” তারা শিল্পপতিদের রাতবিরাতে ফোন দিয়ে রাতের ঘুম হারাম করে দেয়। হুমকি দিয়ে চাঁদা চায়। আমরা কথা দিচ্ছি, আল্লাহ পাক যদি আমাদেরকে দেশসেবার সুযোগ দেন, তাহলে আমরা চাঁদাবাজদের কোনো অস্তিত্ব রাখব না, আমরা দুর্নীতিবাজদের অস্তিত্ব রাখব না।’
শুক্রবার রাত ৯টার দিকে কুমিল্লা নগরের ঐতিহাসিক টাউন হল মাঠে মহানগর জামায়াত আয়োজিত নির্বাচনী জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
জামায়াতের আমির বলেন, ‘চাঁদাবাজদের বলছি, ভাই তোমরা হারাম কাজ করো না। যা করেছ তওবা করো, পারলে মানুষের হক ফিরিয়ে দাও। এরপর যদি তোমাদের কিছু না থাকে, তাহলে আল্লাহ পাক আমাদের যা রিজিক দিয়েছেন, সেটা আমরা তোমাদের নিয়ে ভাগ করে খাব। তবু আল্লাহর ওয়াস্তে তোমরা চাঁদাবাজি কোরো না। আমরা তোমাদেরকে প্রশিক্ষিত করে তুলব, তোমরাও ইনশা আল্লাহ মর্যাদার কাজ করতে পারবে।’
যুবসমাজ বেকার ভাতা পাওয়ার জন্য নয়, নিজেদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্যই রাজপথে নেমেছে বলে মন্তব্য করে শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই যুবকেরাই আগামী দিনের দেশ গড়ার কারিগর হবে। তাদের হাত ধরেই একটি ইনসাফভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ে উঠবে ইনশা আল্লাহ। আমরা প্রত্যেকটা যুবকের হাতকে, প্রত্যেকটা মেয়ের হাতকে দেশ গড়ার হাতে পরিণত করব। তারপর মর্যাদার কাজ তাদের হাতে তুলে দেব।’
অনেকে এখন সন্ত্রাসের পরিবেশ সৃষ্টি করছে উল্লেখ করে জামায়াতের শীর্ষ নেতা বলেন, ‘আমার মায়েদের বেশি ভয় দেখানো হচ্ছে। আমি মায়েদের বলব, আপনারা সেই মা, যাঁরা শহীদ ওসমান হাদিকে জন্ম দিয়েছেন। আপনারা ওই মা, যাঁরা আববার ফাহাদকে জন্ম দিয়েছেন, ওই মা যাঁরা আবু সাঈদকে জন্ম দিয়েছেন। যদি কেউ ভয় দেখাতে আসে, চোখে চোখ রেখে বলবেন, “এটি আমার অধিকার, এটি আমার দায়িত্ব। ভোট দিতে আমি যাব, তুমি পারলে ঠেকাবা।”’
একটা শ্রেণি মানবতা–ভদ্রতা ভুলে গেছে উল্লেখ করে জামায়াতের আমির বলেন, ‘আজকে আমি ফেনীতে গিয়েছিলাম। শহীদ পরিবারের মায়েরা, বোনেরা, সন্তানেরা সেখানে এসেছিল। আমি তাদের প্রতি সহানুভূতি জানানোর একপর্যায়ে একজন বয়স্ক মা হঠাৎ করে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। তিনি কান্না শুরু করেছেন, আমি তো তাঁকে ছুড়ে ফেলে দিতে পারি না। তিনি তো জাতির মা, আমার মা—তাঁকে সম্মান করা আমার দায়িত্ব। এ নিয়ে একশ্রেণির ইতর দেখলাম বিরূপ মন্তব্য শুরু করেছে। তোদের কি মা নেই?’
জনসভায় প্রধান বক্তার বক্তব্যে জামায়াতের নায়েবে আমির ও কুমিল্লা-১১ আসনের প্রার্থী সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের বলেন, ‘বিএনপির চেয়ারপারসন মরহুম বেগম খালেদা জিয়া ছিলেন দেশনেত্রী। আমার ইচ্ছে হয় আজকের প্রধান অতিথি আমিরে জামায়াত হবেন আমাদের দেশনেতা। আজ কুমিল্লার এই বিশাল মহাসমাবেশ থেকে আমাদের মানবিক নেতা ডা. শফিকুর রহমানকে আমি দেশনেতা হিসেবে সম্বোধন চাই। অনেক নেতার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ৫৬ বছর পরিচালিত হয়েছে; কিন্তু আমরা পরিপূর্ণ সফলতা অর্জন করতে পারিনি। ৩৬ জুলাইয়ের বিপ্লবের পরে নতুন বাংলাদেশ গড়ার যেই মহান কারিগর আজ রাজপথ চষে বেড়াচ্ছেন, সেই নেতার নেতৃত্বে ইনশা আল্লাহ নতুন বাংলাদেশ গড়ে উঠবে।’
আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের আরও বলেন, ‘এই নির্বাচন ক্ষমতার পালাবদলের সাধারণ কোনো নির্বাচন নয়। এই নির্বাচন এই দেশের জাতির ভাগ্যনির্ধারণী নির্বাচন। আমরা কি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গড়ব, নাকি আবার দুর্নীতিতে চতুর্থবার চ্যাম্পিয়ন হব, সেই ফয়সালা এই নির্বাচনে হবে। বিএনপিকে আজ জাতির কাছে পরিষ্কার করতে হবে, তারা ক্ষমতায় গেলে হাওয়া ভবন থাকবে কি না। আরও দুটি প্রশ্নের জবাব তাদের দিতে হবে। তবে সেই প্রশ্ন আজকে রাখব না, নির্বাচন আরও কাছে আসলে রাখব।’
জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘দেশের মানুষ এখন পরিবর্তন চায়। অনেকে এখন পরিবর্তনের কথা বলে। কিন্তু তাদের দিয়ে পরিবর্তন সম্ভব নয়। যাঁরা স্বাধীনতার পর বারবার ক্ষমতায় গিয়ে দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দিয়েছেন; দলীয়করণ করেছেন, ভিন্নমত দমন করেছেন, তাঁদের দিয়ে কখনো পরিবর্তন সম্ভব হবে না। তাই পরিবর্তনের অঙ্গীকার নিয়ে আমরা এগারোটি দল এক হয়েছি। আমরা একটি নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণ করব ইনশা আল্লাহ।’
কুমিল্লা-৬ (সদর) আসনে ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী ও কুমিল্লা মহানগর জামায়াতের আমির কাজী দ্বীন মোহাম্মদের সভাপতিত্বে নির্বাচনী জনসভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্য দেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা এ টি এম মাছুম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক এবং কুমিল্লা-৪ (দেবীদ্বার) আসনে ১১–দলীয় ঐক্যের প্রার্থী হাসনাত আবদুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদের ভিপি সাদিক কায়েম, জামায়াতের কুমিল্লা উত্তর জেলা আমির অধ্যাপক আবদুল মতিন। মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি মু. মাহবুবর রহমান জনসভা সঞ্চালনা করেন।
অনুষ্ঠান শেষে কুমিল্লার বিভিন্ন আসনের জামায়াত এবং জোটসঙ্গীদের হাতে দলীয় প্রতীক তুলে দেন জামায়াতের আমির। এ সময় গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। শফিকুর রহমান বলেন, ‘গণভোটে হ্যাঁ ভোট দেওয়া মানে আজাদি। আর না ভোট দেওয়া মানে গোলামি। আমাদের আজাদির জন্যই হ্যাঁ ভোট দিতে হবে।’