চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) সংযুক্ত আরব আমিরাতের ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া এগিয়ে নিচ্ছে সরকার। এরই অংশ হিসেবে ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে যে কনসেশন চুক্তি হবে, তার খসড়া দলিল নিয়ে দুই দিনব্যাপী কর্মশালার আয়োজন করেছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারি কর্তৃপক্ষ। আগামী সোম ও মঙ্গলবার প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ৪ ডিসেম্বর এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির চুক্তি-সম্পর্কিত প্রক্রিয়া নিয়ে করা রিট আবেদনের ওপর বিভক্ত রায় দিয়েছিলেন হাইকোর্ট। ওই দিন হাইকোর্ট বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি ফাতেমা নজীব চুক্তি-সম্পর্কিত প্রক্রিয়া অবৈধ ঘোষণা করেছেন। এর সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ার রিট আবেদন (রুল ডিসচার্জ) খারিজ করে রায় দেন।
দ্বিধাবিভক্ত রায়ের পর এনসিটির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ আছে কি না জানতে চাইলে রিট আবেদনকারীর জ্যেষ্ঠ আইনজীবী আহসানুল করিম শনিবার প্রথম আলোকে বলেন, উচ্চ আদালতের দ্বিধাবিভক্ত রায়ের পর এনসিটির কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, যেহেতু বিভক্ত রায় হয়েছে, সুতরাং এখন বিষয়টি প্রধান বিচারপতির কাছে যাবে। প্রধান বিচারপতি বিষয়টি নিষ্পত্তির জন্য হাইকোর্টের একক একটি বেঞ্চ নির্ধারণ করে দেবেন। এই বেঞ্চের সিদ্ধান্তের মধ্যে রিটের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হবে। একক বেঞ্চে নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত সরকার এ বিষয়ে কোনো কার্যক্রম বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারবে না।
অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হকের কাছে বিষয়টি নিয়ে জানতে চাইলে তিনি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে রায়ের পরপর প্রথম আলোকে দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তিনি বলেছিলেন, চুক্তির প্রক্রিয়ার চলমান কার্যক্রম চালাতে আইনি কোনো বাধা নেই।
নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে বাংলাদেশ যুব অর্থনীতিবিদ ফোরামের পক্ষে সংগঠনটির সভাপতি মির্জা ওয়ালিদ হোসাইন চলতি বছর রিট করেন।
রুলে দেশি অপারেটরদের (প্রতিষ্ঠান) অনুমতি না দিয়ে পিপিপি আইন ও নীতি লঙ্ঘন করে এনসিটি পরিচালনায় চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বিদেশি কোম্পানির চুক্তির চলমান প্রক্রিয়া কেন আইনগত কর্তৃত্ববহির্ভূত ঘোষণা করা হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়। একই সঙ্গে যেকোনো অপারেটরকে এনসিটি পরিচালনার দায়িত্ব (নিযুক্ত) দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট আইন ও নীতি অনুসারে ন্যায্য ও প্রতিযোগিতামূলক পাবলিক বিডিং (দরপত্র আহ্বান) নিশ্চিত করতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা-ও জানতে চাওয়া হয় রুলে। এ নিয়ে কয়েক দফা শুনানি শেষে গত ৪ ডিসেম্বর বিভক্ত রায় দেন হাইকোর্ট।
নিউমুরিং টার্মিনাল চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় টার্মিনাল। টার্মিনালে একসঙ্গে চারটি সমুদ্রগামী কনটেইনার জাহাজ ও একটি ছোট কনটেইনার জাহাজ ভেড়ানো যায়। টার্মিনালে অত্যাধুনিক যন্ত্রের সাহায্যে মূলত জাহাজ থেকে আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনার নামানো হয় এবং রপ্তানি পণ্যবাহী কনটেইনার জাহাজে তোলা হয়।
চালু এই টার্মিনালটি বিদেশিদের হাতে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারির আওতায় জি টু জি ভিত্তিতে টার্মিনালটি ছেড়ে দেওয়ার এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেয় অন্তর্বর্তী সরকার। এ নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠন, পেশাজীবী ও শ্রমিকেরা আন্দোলন কর্মসূচি পালন করেন।
২০০৭ সালে বন্দর এই টার্মিনাল নির্মাণ করে। টার্মিনালটি নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি সংযোজনে বন্দর কর্তৃপক্ষ ধাপে ধাপে মোট ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। বর্তমানে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড। বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়ার আগপর্যন্ত চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেডের এই টার্মিনাল পরিচালনা করার কথা রয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে কর্ণফুলী নদীর তীরে বর্তমানে সমুদ্রগামী জাহাজের কনটেইনার ওঠানো-নামানোর জন্য চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে। এর মধ্যে পতেঙ্গা টার্মিনাল ২০২৪ সালে সৌদি আরবের কোম্পানির কাছে ছেড়ে দেওয়া হয়। এনসিটি ছাড়া বাকি দুটি এখন দেশীয় অপারেটররা পরিচালনা করছে।
এর বাইরে গত নভেম্বরে পতেঙ্গার লালদিয়ায় নতুন টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার জন্য ডেনমার্কের এপিএম টার্মিনালসের সঙ্গে ৩৩ বছরের চুক্তি হয়েছে। একই দিন বিকেলে বুড়িগঙ্গার তীরে পানগাঁও নৌ টার্মিনাল ২২ বছর পরিচালনার জন্য সুইজারল্যান্ডের মেডলগ এসএ কোম্পানির সঙ্গে চুক্তি হয় বন্দরের।