ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাসের মতো নানা দুর্যোগ মোকাবিলায় উপকূলে ঢাল হিসেবে কাজ করে শ্বাসমূলীয় (ম্যানগ্রোভ) বন। বরগুনার তালতলী উপজেলায় সেই জীবন্ত রক্ষাকবচ নিজেই এখন বিপন্ন। আন্ধারমানিক নদের দুই তীরে প্রায় ২০ কিলোমিটার বাঁধের ঢালে শ্বাসমূলীয় প্রজাতির সৃজিত বনাঞ্চল সাবাড় করে গড়ে তোলা হয়েছে অর্ধশতাধিক মাছের ঘের, এতে বাঁধটি হুমকিতে পড়েছে।
স্থানীয় ব্যক্তি ও পরিবেশকর্মীরা বলেন, দীর্ঘদিন ধরেই ওই এলাকায় একটি–দুটি করে ঘের গড়ে তোলা হলেও সম্প্রতি ঘের তৈরির প্রবণতা বেড়েছে। বনের ওপর এমন অনাচারের মাধ্যমে শুধু বনভূমির পরিমাণই কমছে না, হুমকিতে পড়ছে জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ এবং উপকূলীয় এলাকার বাঁধ। এসব ঘেরের পাড়ে বাঁধের ওপর নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার করায় পরিবেশ বিপর্যয়ের ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে বাঁধের নিরাপত্তায় নদের পাড় (রিভার সাইড) ও অভ্যন্তরের (কান্ট্রি সাইড) ২০ ফুটের মধ্যে পুকুর-দিঘি বা ঘের খনন নিষিদ্ধ হলেও এই নিয়মের তোয়াক্কা করছেন না এসব ঘেরমালিকেরা।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বাঁধঘেঁষা এলাকায় ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে খনন বা জলাধার তৈরি করাও বাঁধের গঠনগত ভারসাম্য বিনষ্ট করে, যা ভবিষ্যৎ দুর্যোগের সময় ভয়াবহ বিপর্যয়ের কারণ হতে পারে।
সম্প্রতি সরেজমিন ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তালতলীর শারিকখালী ইউনিয়নের নিওপাড়া থেকে চাউলাপাড়া পর্যন্ত আন্ধারমানিক নদের তীরের ২০ কিলোমটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের বাইরে চরে সৃজিত শ্বাসমূলীয় বনাঞ্চল কেটে মাছের ঘের তৈরি করেছেন স্থানীয় ব্যক্তিরা। নতুন করে আরও কয়েক ব্যক্তিকে গাছপালা কেটে খননযন্ত্র দিয়ে ঘেরের জলাধার নির্মাণ করতে দেখা যায়। এতে একদিকে যেমন বনাঞ্চল সাবাড় হয়েছে, তেমনি বাঁধ ঘেঁষে এমন জলাধার খনন করায় বাঁধের স্থায়িত্ব হুমকিতে পড়েছে।
ওই এলাকার আঙ্গারপাড়া গ্রামে দেখা যায়, বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ঘেঁষে প্রায় ১৫০ মিটার এলাকাজুড়ে গাছ কেটে উজাড় করা হয়েছে। সেখানে খননযন্ত্র (এক্সকাভেটর) দিয়ে মাটি কেটে ঘেরের জলাধার নির্মাণ করা হচ্ছে।
আবদুল খালেক মিয়া নামের স্থানীয় এক বাসিন্দা এই ঘের বানাচ্ছেন বলে জানান এলাকার বাসিন্দারা। জানতে চাইলে আবদুল খালেক মিয়া বলেন, ‘এই জমি আমার রেকর্ডীয়। এখানে সরকারি জমি নেই।’ নদের চরের জমি কীভাবে ব্যক্তিমালিকানার হয়, এমন প্রশ্নে বলেন, ‘একসময় আমাদের জমি নদে ভেঙে যায়। বহু বছর পর পুনরায় চর জেগে ওঠে।’ তবে গাছ কাটার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তর দেননি।
আঙ্গারপাড়া থেকে কিছু দূরে চাউলাপাড়া গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, একইভাবে কয়েক হাজার ছইলা ও কেওড়াগাছ কেটে প্রায় দুই একর জমির মাটি খনন করে ঘের বানানো হচ্ছে। ওই এলাকার বাসিন্দারা জানান, স্থানীয় বাবুল মৃধা ও জাকির মৃধা নামের দুই ভাই এই ঘের বানাচ্ছেন।
তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে বাবুল মৃধা ও জাকির মৃধা দাবি করেন, তাঁরা বন্দোবস্তপ্রাপ্ত জমিতে চিংড়ি চাষের জন্য ঘের নির্মাণ করছেন। গাছ কেটে ঘের নির্মাণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তাঁরা বলেন, ‘বন বিভাগের লোকজন এসে দেখে গেছেন।’
একই এলাকায় হাসান মিয়া নামের আরেক ব্যক্তি বাঁধের পাড় ঘেঁষে বিশাল ঘের নির্মাণ করেছেন বেশ কয়েক বছর আগে। হাসান মিয়ার দাবি, তিনি ২০ বছর ধরে বাঁধের বাইরে ঘের করছেন। ঘেরের জমির বেশির ভাগ তাঁদের ব্যক্তিমালাকানার, তবে কিছু জমি সরকারিও আছে। এ জন্য তাঁদের নামে বন বিভাগ মামলা করেছে।
স্থানীয় অন্তত চার ব্যক্তি নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বন সাবাড় করায় ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে হুমকিতে পড়েছে গোটা এলাকা। কিন্তু এসব ব্যক্তিরা স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় কেউ এর প্রতিবাদ করতে পারেন না। আবার বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এসব অপকর্মে নেপথ্য সহযোগিতা আছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
‘নিয়ম অনুযায়ী, বাঁধের ২০ ফুটের মধ্য ঘের বা পুকুর খনন করা যাবে না। যদি বাঁধ লাগোয়া স্থানে ঘের বা পুকুর কাটা হয়, আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’মো. রাকিব, পাউবোর বরগুনা কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পটুয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী
উপকূলীয় বন বিভাগ পটুয়াখালীর আওতাধীন তালতলী রেঞ্জ কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, সরকারি জমি দখল ও গাছ কাটার অপরাধে শারিকখালী বিট কর্মকর্তা হায়দার আলী সম্প্রতি ৬ ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, আরও ১৬ জনকে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এরপরও এসব কর্মকাণ্ড থামছে না।
তালতলী রেঞ্জ কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান বলেন, ‘এসব ঘের ও জমি দখলে বন বিভাগের লোকজন জড়িত, এমন অভিযোগ সঠিক নয়। আর এ ঘটনায় এরই মধ্যে বেশ কয়েকজনের বিরুদ্ধে আমরা মামলা দিয়েছি। এ ছাড়া বাকিদের নোটিশ দিয়ে তাঁদের জমি দাবির পক্ষে কী কাগজপত্র আছে, তা নিয়ে হাজির হওয়ার জন্য বলা হয়েছে। সঠিক কাগজপত্র দেখাতে না পারলে তাঁদের বিরুদ্ধেও বন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
এসব বন্য নিয়ন্ত্রণ বাঁধের দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো)। জানতে চাইলে পাউবোর বরগুনা কার্যালয়ের অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পটুয়াখালী কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাকিব প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিয়ম অনুযায়ী, বাঁধের ২০ ফুটের মধ্য ঘের বা পুকুর খনন করা যাবে না। যদি বাঁধ লাগোয়া স্থানে ঘের বা পুকুর কাটা হয়, আমরা আইনগত ব্যবস্থা নেব।’
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) বরিশাল বিভাগীয় সমন্বয়ক রফিকুল আলম প্রথম আলোকে বলেন, বাঁধের স্থায়িত্ব রক্ষায় পাড়ে ছইলা ও কেওড়ার মতো শ্বাসমূলীয় গাছ রোপণ করা হয়, যা ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় ঢেউয়ের আঘাত শোষণ করে এবং বাঁধকে টেকসই রাখতে সহায়তা করে। এই গাছগুলো মাটির ক্ষয় রোধে প্রাকৃতিক অবলম্বন হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাঁধের বাইরে (রিভার সাইড) মৎস্যঘের নির্মাণের ফলে ঘেরের পানির স্রোত ও নোনা জল বাঁধের পাড়ের মাটি আলগা করে ফেলে। এতে করে বাঁধের ভিত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং অল্পতেই ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।