ফুলের মতো মেয়েটির যে স্বপ্ন পূরণ হলো না
মাথায় রঙিন হেয়ার ব্যান্ড। টমটমে বসা ছোট্ট সিদরাতুল জান্নাতের মুখটা বিষণ্ন। সেখানে বিকেলের লাল আলো এসে পড়ছিল। ১০ বছর বয়সী সিদরাতুলের এই ছবি মুঠোফোনে দেখিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা শানত কবির। তিনি বলেন, ‘ফুলের মতো মেয়েটাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না। ওর স্বপ্ন ছিল স্কুলের শিক্ষক হবে। সেই স্বপ্ন পূরণ হলো না।’
গতকাল শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসকদের সব চেষ্টা বিফল করে দিয়ে পৃথিবীর মায়া ছেড়ে যায় সিদরাতুল। ব্রেন টিউমারের সঙ্গে দীর্ঘ লড়াই করে অবশেষে ১০ বছর বয়সে থেমে যায় জীবনের চাকা। আজ শনিবার বেলা দুইটায় জানাজা শেষে কক্সবাজারের রামুর কচ্ছপিয়া ইউনিয়নের হাজিরপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে তাকে দাফন করা হয়।
সিদরাতুলের বাবা শানত কবির কক্সবাজার শহরের একটি হোটেলে সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে কাজ করেন। মা আজিজা বেগম গৃহিণী। সহায়–সম্বলহীন এই পরিবার কচ্ছপিয়ার হাজিরপাড়া সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে বসবাস করে। চার সন্তানের মধ্যে সিদরাতুল ছিল একমাত্র মেয়ে। মেয়ের অসুস্থতার পর দিশাহারা হয়ে পড়েছিলেন মা–বাবা। চিকিৎসকেরা জানিয়েছিলেন, অপারেশনের জন্য প্রয়োজন ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা। যা তাঁদের পক্ষে জোগাড় করা অসম্ভব ছিল। তবে পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর অনেকেই এগিয়ে আসেন। জোগাড় হয় তহবিলও। কিন্তু সিদরাতুলকে বাঁচানো যায়নি।
প্রতিবেশী মো. সাজ্জাদ জানান, এই পরিস্থিতিতে সিদরাতুলের অসুস্থতা নিয়ে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে মানবিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর দেশ–বিদেশের অনেকেই এগিয়ে আসেন। প্রবাসী ও স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় একটি তহবিল গঠন করা হয়। এতে প্রায় আট লাখ টাকা জোগাড় হয়। সেই টাকা নিয়ে ৫ এপ্রিল বড় ভাই মোহাম্মদ ইজাজ ছোট বোনকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যান। পরিবারের সবাই আশা করেছিলেন, সিদরাতুল সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু সেই যাত্রাই হয়ে ওঠে তার শেষ যাত্রা।
তিন ভাইয়ের একমাত্র বোন ছিল সিদরাতুল। তার চলে যাওয়ায় পুরো পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। তার ভাই মোহাম্মদ ইজাজ বলেন, কচ্ছপিয়ার মৌলভিকাটা মাস্টারপাড়া তানফিজুল কোরআন মডেল মাদ্রাসায় তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ত সিদরাতুল জান্নাত। প্রতিদিন কাঁধে ব্যাগ নিয়ে তার মাদ্রাসায় যাওয়ার সেই চেনা দৃশ্য এখন শুধুই স্মৃতি। এসব বলতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি।
বোনের স্মৃতিচারণা করে ইজাজ আরও বলেন, অসুস্থতার মধ্যেও সে বারবার বলত, সুস্থ হলে আবার পড়াশোনা করবে। বড় হয়ে একজন আদর্শ শিক্ষক হবে। কিন্তু দেড় মাস আগে হঠাৎ ধরা পড়ে তার মস্তিষ্কে টিউমার। এরপরই থমকে যায় তার স্বাভাবিক জীবন।
মেয়েকে হারিয়ে বাবা শানত কবির এখন প্রায় উন্মাদ। আর মা আজিজা বেগম শোকে কথাও বলতে পারছেন না। আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে মেয়ের কবর। সেখানে আদরের মেয়েটি একা শুয়ে আছে, এটাই মানতে পারছেন না মা–বাবা।