কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষার্থী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান ওরফে তনু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লার আদালতে এসেছেন। মামলাটির অগ্রগতি জানাতে পিবিআইর তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করেছিলেন কুমিল্লার আদালত।
তদন্ত কর্মকর্তা কুমিল্লার আদালতে উপস্থিত হয়ে মামলাটির অগ্রগতি জানানোর পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডে সন্দেহভাজন তিনজনের ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ের (মেলানোর) আবেদন জানিয়েছেন। আদালত সেটিতে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন।
২০ মার্চ সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের এক দশক পূর্ণ হলেও মামলাটির তদন্তে এখনো তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এতে ক্ষোভের শেষ নেই পরিবারের। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই তদন্ত কর্মকর্তাকে তলব করলেন কুমিল্লার আদালত। আজ সোমবার বেলা ১১টার দিকে কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতের বিচারক মো. মমিনুল হকের আদালতে হাজির হন মামলাটির তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) রাজধানীর কল্যাণপুরের পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।
২০১৬ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যায় কুমিল্লা সেনানিবাসের ভেতরে একটি বাসায় টিউশনি করতে গিয়ে আর বাসায় ফেরেননি তনু। পরে খোঁজাখুঁজি করে সেনানিবাসের পাওয়ার হাউসের অদূরে ঝোপের মধ্যে তনুর লাশ পাওয়া যায়। তাঁকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয় বলে প্রাথমিকভাবে প্রতীয়মান হয়। পরদিন তনুর বাবা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ডের অফিস সহায়ক (বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত) ইয়ার হোসেন বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় হত্যা মামলা করেন। ২০১৬ সালের ৪ এপ্রিল ও ১২ জুন দুই দফা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে তনুর মৃত্যুর কারণ খুঁজে না পাওয়ার তথ্য জানায় কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ফরেনসিক বিভাগ।
এই হত্যাকাণ্ডের শেষ ভরসা ছিল ডিএনএ রিপোর্ট। ২০১৭ সালের মে মাসে সিআইডি তনুর পোশাক থেকে নেওয়া নমুনার ডিএনএ পরীক্ষা করে তিনজন পুরুষের শুক্রাণু পাওয়ার কথা গণমাধ্যমকে জানিয়েছিল। এ ছাড়া তনুর মায়ের সন্দেহ করা তিনজনকে ২০১৭ সালের ২৫ থেকে ২৭ অক্টোবর পর্যন্ত সিআইডির একটি দল ঢাকা সেনানিবাসে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। তবে ওই সময়ে তাঁদের নাম গণমাধ্যমকে জানায়নি সিআইডি।
কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতে উপস্থিত একাধিক আইনজীবী ও তনুর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বেলা ১১টার পর পিবিআই কর্মকর্তা মো. তরিকুল ইসলাম আদালতকে মামলাটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জানান। এ সময় তিনি তিনজনের নাম উল্লেখ করে ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ করে ম্যাচিং করার দাবি জানান ওই কর্মকর্তা। তিনি জানান, ২০১৭ সালের মে মাসে তনুর পোশাকে পাওয়া তিনজন পুরুষের শুক্রাণু থেকে তিনজন ব্যক্তির ডিএনএ প্রোফাইল তৈরি করা হয়। কিন্তু পরে সন্দেহভাজনদের সঙ্গে কাছ থেকে নমুনা নিয়ে ওই তিনজনের ডিএনএ ম্যাচিং করা হয়নি। তদন্ত কর্মকর্তার কাছ থেকে বিষয়টি জেনে আদালত ডিএনএ নমুনা ম্যাচিংয়ে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন। ওই তিনজন ব্যক্তি হলেন তৎকালীন সময়ে কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান ও সৈনিক জাহাঙ্গীর ওরফে জাহিদ।
আদালত থেকে বের হয়ে পিবিআই পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আজকে আমরা মূলত আদালতের তলবের কারণে কুমিল্লায় এসেছি। আমরা আদালতকে মামলাটির অগ্রগতি সম্পর্কে জানিয়েছি। মামলার অগ্রগতির বাকি বিষয় পরবর্তী তারিখে জানাতে বলেছেন আদালত।’ তিনজনের ডিএনএ ম্যাচিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আদালতে কিছু বিষয়ে কথা হয়েছে। তবে আমরা এসব নিয়ে এখনই কথা বলতে চাচ্ছি না। আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। আশা করছি, তদন্তের মাধ্যমে সব বেরিয়ে আসবে। আদালতে আমাদের সঙ্গে মামলার বাদী তনুর বাবাও ছিলেন।’
তনুর বাবা ইয়ার হোসেন প্রথম আলোকে জানান, তিনি অসুস্থ। গতকাল রাতে এবং আজকে সকালে তদন্ত কর্মকর্তা মুঠোফোনে কল করে তাঁকে আদালতে আসতে বলেন। তিনি সময়মতো আদালতে এসেছেন। তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনি বলেছিলেন আদালতের কাজ শেষে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে। ১ নম্বর আমলি আদালতটি ছিল সিজিএম কোর্টের ৪ তলায়। সেখানে কাজ শেষে নামতে নামতেই তনুর বাবা দেখেন, পিবিআইর তদন্ত কর্মকর্তা চলে গেছেন। তাঁদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি।
ইয়ার হোসেন বলেন, ‘শুধু সার্জেন্ট জাহিদ, ওয়ারেন্ট অফিসার হাফিজুর রহমান এবং সৈনিক জাহিদই নয়, এর বাইরে আরও অনেকে আমার মেয়ের হত্যার সঙ্গে জড়িত। আমি তাঁদের বিচার চাই। আমরা ঘটনার পর থেকেই নামগুলো বলে আসছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত একজন খুনিকেও গ্রেপ্তার করা হয়নি। এই সরকার যদি বিচার না করে, তাহলে মনে হয়, আর বিচার পাব না।’
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করার আকুতি জানিয়ে তনুর বাবা বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দেশে আসার আগেই বলেছেন, বিএনপি ক্ষমতায় এলে সবার জন্য ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা হবে। সবার জন্য বিচার সমান হবে—তিনি যেই অঙ্গীকার করেছেন, সেটা আমরা দেখতে চাই। আমি একটিবার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমার মেয়ের খুনিদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বলতে চাই। আমার বয়স হয়েছে, জানি না কত দিন বাঁচব। মৃত্যুর আগে শুধু একটাই আশা, মেয়ের খুনের বিচারটা দেখে যেতে চাই। যদি খুনিদের ফাঁসি দেখে যেতে না পারি, তাহলে মরেও শান্তি পাব না।’
তনুর পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, গত ১০ বছরে চারটি তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন আর ছয়বার তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন ছাড়া তদন্তে এখনো নতুন কোনো আশার আলো দেখতে পাননি তাঁরা। বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা মামলাটির দায়িত্ব পাওয়ার সাত মাস পর গত বছরের ৭ এপ্রিল কুমিল্লায় এসেছিলেন। প্রায় এক বছর পর আজ সোমবার আদালতে এসেছেন তিনি। এই দীর্ঘ সময় তদন্ত কর্মকর্তার সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নেই পরিবারের।
সোমবার দুপুরে মুঠোফোনে তনুর মা আনোয়ারা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘এই জীবনে আর কিছু চাই না, শুধু মাইয়াডার খুনিডির বিচার দেখতাম চাই। আইন আর বিচার যদি সবার লাইগ্যা সমান হয়, তাইলে আমরা বিচার পাইতাম না ক্যারে? আমরা আশায় আছি নতুন সরকার এই খুনের বিচার করব। যদি নতুন সরকার বিচার না করে, তাইলে বুইজ্জাম গরিবের কোনো বিচার নাই।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঘটনার শুরুতে থানা–পুলিশ, পরে জেলা পুলিশের গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) এবং পরে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ সময় ধরে মামলাটি তদন্ত করেও কোনো কূলকিনারা করেনি। পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে ২০২০ সালের ২১ অক্টোবর তনু হত্যা মামলার নথি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই), ঢাকার সদর দপ্তরে হস্তান্তর করে সিআইডি। প্রায় চার বছর মামলাটি তদন্ত করেছেন পিবিআই সদর দপ্তরের পুলিশ পরিদর্শক মো. মজিবুর রহমান। তিনিও পূর্বের তদন্ত কর্মকর্তাদের পথে হেঁটে অন্যত্র বদলি হয়ে গেছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে মামলাটির ষষ্ঠ তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব পেয়েছেন পরিদর্শক মো. তরিকুল ইসলাম।