কৃষকের জন্য খাল কেটে জেলে যেতে হয়েছে: সালাহউদ্দিন আহমদ

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নে একটি পথসভায় বক্তব্য দেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও ধানের শীষের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদছবি: প্রথম আলো

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার-১ আসনের ধানের শীষের প্রার্থী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমি মন্ত্রী থাকার সময় কৈয়ারবিলের কৃষকের সুবিধার জন্য, তাঁদের চাষাবাদ নিশ্চিত করতে নিজের টাকায় জায়গা কিনে খাল কেটেছিলাম। এর পর থেকে এ অঞ্চলের মানুষ ফসল ফলাতে পারছেন। কিন্তু এই খাল নাকি আমি মাছ চাষের জন্য কেটেছিলাম। মিথ্যা অপবাদ দিয়ে আমার বিরুদ্ধে মামলা করেছিল। জেলও খেটেছি। এতে আমার আফসোস নেই। কারণ, আপনাদের চাষাবাদ নিশ্চিত হয়েছে, নদীর ভাঙন থেকে ঘরবাড়ি রক্ষা পেয়েছে।’

আজ মঙ্গলবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের খিলছাদক এলাকায় নির্বাচনী পথসভায় সালাহউদ্দিন আহমদ এ কথা বলেন।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, জনগণের ভাগ্য উন্নয়ন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের প্রত্যাশা পূরণে ধানের শীষে ভোট দিতে হবে। বিএনপিকে নির্বাচিত করলে মানুষ দেশের পক্ষের শক্তিকে পাশে পাবে। কারণ, বিএনপি এ দেশের মানুষের রাজনৈতিক দল। বিএনপির যা কিছু পরিকল্পনা, রাষ্ট্রভাবনা—সবকিছুই এ দেশের মানুষকে কেন্দ্র করে।

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, আসুন সবাই মিলে সারা দেশে ধানের শীষে ভোট দিয়ে বিএনপিকে নির্বাচিত করি। বিএনপি ক্ষমতায় গেলে এমন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করবে, যেটি ছিল শহীদদের প্রত্যাশা এবং এ দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষা।

সালাহউদ্দিন আহমদ চকরিয়া-পেকুয়া আসন থেকে তিনবার সংসদ সদস্য ছিলেন। তাঁর স্ত্রী হাসিনা আহমদও একবার সংসদ সদস্য ছিলেন। এবার সালাহউদ্দিন আহমদসহ তিনজন প্রার্থী নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অন্য প্রার্থীরা হলেন জামায়াতের প্রার্থী আবদুল্লাহ আল ফারুক এবং ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থী ছরওয়ার আলম কুতুবী।

সালাহউদ্দিন আহমদ বেলা ১১টা থেকে বেলা আড়াইটা পর্যন্ত চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নে প্রচারণা চালান। এ সময় তিনি সাতটি পথসভায় বক্তব্য দেন। তিনি জলদাশপাড়া, দেওয়ান আলী বাজার, খোঁজাখালী, খিলছাদক, ঘোনাপাড়া, ভরাইন্ন্যারচর, ডিককুল, দক্ষিণ খিলছাদক, ছোঁয়ালিয়াপাড়া, পরিষদ স্টেশন, কৈয়ারবিল স্কুল স্টেশন, মন্ডলপাড়া, ইসলামনগর, কৈয়ারবিল আবাসন এলাকায় গণসংযোগ করেন।

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নের খিলছাদক এলাকায় মাতামুহুরী নদীর ওপর কাঠের সেতুতে দাঁড়িয়ে জনসংযোগ করেন সালাহউদ্দিন আহমদ। আজ দুপুর একটার দিকে
প্রথম আলো

বেলা ১১টায় সালাহউদ্দিন আহমদের প্রচারণার গাড়ি কৈয়ারবিল ইউনিয়নে প্রবেশ করে। প্রথমে তিনি জলদাশপাড়ায় যান। এ সময় সড়কের দুই পাশে নারী-পুরুষ দাঁড়িয়ে তাঁকে স্বাগত জানান। বিভিন্ন বিদ্যালয় ও মাদ্রাসার শিক্ষক-শিক্ষার্থীরাও তাঁকে স্বাগত জানান। খোঁজাখালী স্টেশনে দাঁড়িয়ে ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আমি আপনাদের পরীক্ষিত মানুষ। আমাকে তিনবার ভোট দিয়েছেন। আমাকে ভালোবেসে আমার স্ত্রীকেও আপনারা নির্বাচিত করেছিলেন। কে উন্নয়ন করতে পারে, কে আপনাদের আপন—সবই আপনারা চেনেন। ১২ ফেব্রুয়ারি ভোরে প্রত্যেকে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে উন্নয়নের প্রতীক ধানের শীষে একটি করে ভোট দেবেন।’

পরে খিলছাদক স্টেশনে পথসভায় বক্তব্য দেন সালাউদ্দিন আহমদ। এতে তিনি বলেন, ‘আপনাদের দোয়া ও ভালোবাসার বদৌলতে ১৫ বছর পর হলেও আপনাদের দুয়ারে আসতে পেরেছি। নিজেকে খুব ভাগ্যবান মনে হচ্ছে। আপনাদের জন্য খাল কেটে জেল খেটেছি। এতে কোনো আফসোস নেই। আপনাদের যা দাবি আছে, সব পাস; নির্বাচিত হওয়ার পর প্রতিটি প্রকল্পে কাজ শুরু হবে।’

এরপর সালাউদ্দিন আহমদ মাতামুহুরী নদীর ওপরে খিলছাদক এলাকায় কাঠের সেতু পরিদর্শন করেন। তিনি নির্বাচিত হলে পাকা সেতু করে দেওয়ার আশ্বাস দেন। পথে পথে বৃদ্ধ নারী-পুরুষেরা তাঁকে বহনকারী গাড়ি ঘিরে ধরে নানা দাবি জানাতে থাকেন। সবাইকে দাবি বাস্তবায়নের আশ্বাসও দেন।

ভরাইন্ন্যারচর স্কুলের পাশে সড়কের কিনারে লাঠিতে ভর দিয়ে দাঁড়ান সুফিয়া বেগম (৭০)। তাঁর উদ্দেশ্য সালাহউদ্দিন আহমদকে একনজর দেখা। সুফিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘সালাহউদ্দিনকে দেখতে এসেছি। তাঁকে হাসিনা মেরে ফেলতে চেয়েও পারেনি। আমি রোজা রেখেছিলাম।’ তবে ভিড় ঠেলে কাছে গিয়ে কথা বলতে পারেননি তিনি। দূর থেকেই গাড়ির ভেতরে থাকা সালাউদ্দিন আহমদকে একনজর দেখেন সুফিয়া।

সালাহউদ্দিন আহমদকে পথে পথে ফুলের মালা পরিয়ে দেন নানা শ্রেণি–পেশার মানুষ। এ সময় বেড়িবাঁধ, নদীভাঙন রোধ, সড়ক ও সেতু নির্মাণ, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন।

পরে বিকেল পাঁচটায় সালাহউদ্দিন আহমদ কাকারা ইউনিয়ন বিএনপি আয়োজিত উত্তর কাকারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে নির্বাচনী পথসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন। এ দেশের গণতন্ত্র, জনগণ ও স্বাধীনতা বিএনপির হাতে নিরাপদ উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা বাংলাদেশের গণতন্ত্র হারিয়ে ফেলেছিলাম, বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিল। মানুষের কথা বলার কোনো অধিকার ছিল না। এখন আপনারা সেই অধিকার ফেরত পেয়েছেন। রাষ্ট্রের মালিকানা ফেরত পেয়েছেন। এ দেশের গণতন্ত্র, জনগণ, স্বাধীনতা বিএনপির হাতে সুরক্ষিত, নিরাপদ।’

কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলার কৈয়ারবিল ইউনিয়নে সড়কে পাশে গাড়ি থামিয়ে জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেন সালাহউদ্দিন আহমদ। আজ দুপুরে
প্রথম আলো

বিএনপি বাংলাদেশের দল উল্লেখ করে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা এ দেশের দল। আমরা এ দেশের জন্য, এ দেশের মানুষের জন্য সবকিছু বিসর্জন দিতে রাজি। এ জন্য আপনারা দেখেছেন, এ দেশের গণতন্ত্র রক্ষার জন্য, ভোটাধিকার আদায়ের জন্য সংগ্রাম করতে করতে আমাদের দেশনেত্রী খালেদা জিয়া তাঁর নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন। বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে সম্মানে সমাহিত করেছে।’

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, এবারের নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচন। এবারের নির্বাচন নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের শক্তিশালী গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে। এবারের নির্বাচনে আপনাদের ভোটাধিকার প্রয়োগের পরীক্ষা হবে। স্বাধীনভাবে আপনার পছন্দের প্রার্থীকে ভোট প্রয়োগ করবেন। আপনার পছন্দমতো প্রার্থীকে নির্বাচন করবেন। গণতন্ত্রের স্বাদ ভোগ করবেন।

সালাহউদ্দিন বলেন, ‘ভবিষ্যতে আপনারা যে সংসদ নির্বাচিত করবেন, সে সংসদে সবচেয়ে বেশি আইন প্রণয়ন হবে এবং সবচেয়ে বেশি সংবিধানের সংশোধনী হবে। আমরা বলেছি, ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার সবার। আমার সামনে সনাতন ধর্মাবলম্বী মা-বোনেরা বসে আছেন, তাঁদের মুখের হাসি দেখে বোঝা যায়, তাঁরা বিএনপির হাতে নিরাপদ। এ দেশে যখনই বিএনপি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় ছিল, আপনাদের স্বাধীনতা, ধর্মীয় স্বাধীনতা, নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। কোনো রকমের সংঘর্ষের মধ্যে আপনাদের যেতে হয়নি।’

জেলা নির্বাচন অফিসের সর্বশেষ প্রকাশিত ভোটার তালিকা অনুযায়ী, কক্সবাজার-১ (চকরিয়া-পেকুয়া) আসনে মোট ভোটারসংখ্যা ৫ লাখ ৩৩ হাজার ৮৯। তাঁদের মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৮৪ হাজার ৪৬৯ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৪৮ হাজার ৬২০ জন।

উপজেলাভিত্তিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চকরিয়া উপজেলার ১৮টি ইউনিয়ন ও ১টি পৌরসভা এলাকায় মোট ভোটারসংখ্যা ৩ লাখ ৮৬ হাজার ৪৯০ জন এবং পেকুয়া উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে মোট ভোটারসংখ্যা ১ লাখ ৪৬ হাজার ৫৯৯ জন। এই সংসদীয় আসনে মোট ভোটকেন্দ্র ১৭৫টি এবং মোট বুথের (কক্ষের) সংখ্যা ১ হাজার ৬টি।