শরীয়তপুরে ২০৯ ছাত্রী এসএসসি দেয়নি, অধিকাংশ বাল্যবিবাহের শিকার
চলমান এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে শরীয়তপুরের জাজিরার কাজিয়ারচর সমির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয় থেকে ১৩০ শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করেছিল। প্রায় সব শিক্ষার্থী প্রবেশপত্র নিতে স্কুলে এলেও বিলাশপুর ইউনিয়নের একটি গ্রামের এক ছাত্রী আসেনি। শিক্ষকেরা ওই ছাত্রীর বাড়িতে খোঁজ নিলেন। জানতে পারলেন, মেয়েটির বিয়ের তোড়জোড় চলছে। বাদ সাধলেন শিক্ষকেরা। কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না। পরিবার মেয়েটিকে গ্রাম থেকে ঢাকায় নিয়ে বিয়ে দেয়। বিয়ে হলো এসএসসি পরীক্ষা শুরুর প্রথম দিন, গত ৩০ এপ্রিল।
শরীয়তপুরে বাল্যবিবাহের এমন ঘটনা আরও আছে। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ২০৯ জন ছাত্রী চলতি এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। শিক্ষকেরা বলছেন, এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ফরম পূরণ করার পর গত চার মাসে ওই সব ছাত্রীর অধিকাংশের বিয়ে হয়ে গেছে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্র জানায়, শরীয়তপুরে ১২৫ উচ্চবিদ্যালয় ও মাধ্যমিক পর্যায়ের ৫৯টি মাদ্রাসা রয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো থেকে এ বছর এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার জন্য ১৪ হাজার ৮৬৮ জন শিক্ষার্থী ফরম পূরণ করে। কিন্তু ৩১৩ জন পরীক্ষায় অনুপস্থিত রয়েছে। এর মধ্যে ২০৯ ছাত্রী ও ১০৪ জন ছাত্র। শরীয়তপুরের গ্রামগুলোতে বাল্যবিবাহের ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শ্যামল চন্দ্র শর্মা প্রথম আলোকে বলেন, ‘চলতি এসএসসি পরীক্ষায় ২০৯ জন ছাত্রী অংশ নেয়নি। বিভিন্ন স্কুল ও মাদ্রাসায় খোঁজ নিয়ে জেনেছি, ওই ছাত্রীদের অধিকাংশ বাল্যবিবাহের শিকার।’
বিদ্যালয় ও মাদ্রাসাগুলোতে এসএসসি নির্বাচনী পরীক্ষায় যারা উত্তীর্ণ হয়, তারা পরীক্ষা দেওয়ার জন্য গত নভেম্বরে ফরম পূরণ করে। পরীক্ষার রুটিন প্রকাশ হওয়ার পর গত এপ্রিলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে শিক্ষার্থীদের প্রবেশপত্র আসে।
এক প্রশ্নের জবাবে কাজিয়ারচর সমির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জি এম সালাউদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ বছর আমাদের বিদ্যালয়ের পাঁচ ছাত্রী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়নি। তাদের প্রত্যেকের বাল্যবিবাহ হয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছিলাম বাল্যবিবাহ ঠেকানোর। কিন্তু পরিবারের অসহযোগিতায় তা আর পারা যায়নি।’
বাল্যবিবাহের এমন আরেক ঘটনা আছে শরীয়তপুর শহরের পাশের একটি ইউনিয়নে। ওই কিশোরী শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ত। এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য সে যথারীতি ফরম পূরণ করে। কিন্তু গত জানুয়ারিতে এক প্রবাসীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়ে যায়।
জানতে চাইলে শরীয়তপুর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের এক এসএসসি পরীক্ষার্থী বাল্যবিবাহের শিকার হয়েছে। বিয়ের পরে আমরা জেনেছি। ওই ছাত্রীকে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার জন্য বলা হয়েছিল। কিন্তু তার স্বামীর আপত্তির কারণে সে আর পরীক্ষা দিতে পারেনি।’
মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, এবার এসএসসি পরীক্ষায় সবচেয়ে বেশি পাঁচ ছাত্রী অনুপস্থিত রয়েছে জাজিরার কুন্ডেরচর সমির উদ্দিন উচ্চবিদ্যালয়ে। নড়িয়া বিহারীলাল উচ্চবিদ্যালয়ের ৪ জনসহ ৮৫টি বিদ্যালয়ের ১৪১ ছাত্রী অনুপস্থিত রয়েছে। এ ছাড়া ৩৫টি মাদ্রাসার ৫১ জন ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৮ ছাত্রী পরীক্ষা দিচ্ছে না।
বাল্যবিবাহ নিরোধ আইন ২০১৭ অনুযায়ী, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করার জন্য জেলা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। জেলা কমিটির সভাপতি জেলা প্রশাসক, উপজেলা পর্যায়ে ইউএনও এবং ইউনিয়ন পর্যায়ের কমিটির সভাপতি ইউপি চেয়ারম্যান। সমাজের গণ্যমান্য ও গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা ওই কমিটির সদস্য।
বাল্যবিবাহ ঠেকাতে উদ্যোগের বিষয়ে জানতে চাইলে সদর উপজেলার তুলাসার ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান জামাল হোসেন ফকির প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঘটনাগুলো গোপনে ঘটে। যখন খবর পাই, তখন আটকানোর পদক্ষেপ নিই। বিবাহ রেজিস্ট্রি করার কাজিদের নিষেধ করা হয় বাল্যবিবাহ সম্পন্ন না করার জন্য। তারপরও বাল্যবিবাহ থামানো যাচ্ছে না।’
জেলা প্রশাসন ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের এক হিসাব বলছে, গত বছরের জানুয়ারি থেকে চলতি বছরের ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত জেলা প্রশাসন ২৬টি ও মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর ১৩টি বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ করেছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে ৭১টি কিশোর-কিশোরী ক্লাব গঠন করেছে মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তর।
জানতে চাইলে শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক পারভেজ হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘২০৯ ছাত্রী পরীক্ষায় অংশ নেয়নি এমন তথ্য পেয়েছি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের ও মহিলাবিষয়ক কর্মকর্তাকে বিষয়টি খতিয়ে দেখতে বলা হয়েছে। আর বাল্যবিবাহ বন্ধ করতে প্রশাসন তৎপর রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সমাজের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। সচেতনতা সৃষ্টি করতে হবে।’