সেচপাম্পে পানি তুলে মাছ চাষ, বন্যার শঙ্কা 

এলাকাবাসী বলছেন, এখনই বিলগুলো পানিপূর্ণ হয়ে থাকলে পরে ভারী বৃষ্টির সময় বিল উপচে বন্যার সৃষ্টি হবে।

যশোরের কেশবপুরে মাছ চাষের জন্য সেচপাম্পের মাধ্যমে পানি তুলে বিল ভরাট করা হচ্ছে। সম্প্রতি সদর ইউনিয়নের ব্যাসডাঙ্গা গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

অতিবৃষ্টি হলে যশোরের কেশবপুরের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়। নদ-নদী পলিতে ভরাট হওয়ার কারণে পানিনিষ্কাশনে অসুবিধা হয়। তখন বিল উপচে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। মানুষজন বাড়িঘর ছেড়ে উঁচু স্থানে আশ্রয় নেন। এই যখন পরিস্থিতি, তখন কেশবপুরে মৎস্য চাষের জন্য মাছের ঘেরমালিকেরা শ্যালো মেশিন ও গভীর নলকূপ থেকে দিনরাত পানি ওঠাচ্ছেন। এলাকাবাসী বলছেন, এখনই বিলগুলো পানিপূর্ণ হয়ে থাকলে পরে ভারী বৃষ্টির সময় বিল উপচে বন্যার সৃষ্টি হবে। তাঁদের দাবি, এখনই ভূগর্ভের পানি ওঠানো বন্ধ করা উচিত।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, কেশবপুরের বিলগুলোতে বছরের আট মাস মাছের ঘের করা হয়। বোরো আবাদের সময় ঘেরগুলো থেকে পানি নিষ্কাশন করে ফসল চাষের উপযোগী করা হয়। এরপর বৃষ্টির পানিতে আবার বিলগুলো পরিপূর্ণ হলে মাছ চাষ করা হয়। তবে এবার বোরো ধান ওঠানোর পরে বিলগুলোতে মাছ চাষের জন্য প্রকৃতির ওপর নির্ভর না করে ভূগর্ভ থেকে শ্যালো মেশিন ও গভীর নলকূপ দিয়ে পানি ওঠানো হচ্ছে।

সরেজমিনে গত ২৯ মে কেশবপুর সদর ইউনিয়নের মাগুরাডাঙ্গা, ব্যাসডাঙ্গা গ্রাম; পাঁজিয়া ইউনিয়নের বাকাবর্শী গ্রাম এবং পৌর এলাকার মধ্যকুল ও হাবাসপোল এলাকায় দেখা যায়, বিলগুলোতে মাছ চাষের জন্য কৃষিকাজে ব্যবহৃত সেচপাম্প দিয়ে পানি ওঠানো হচ্ছে। এলাকার লোকজন জানান, দিনরাত বাধাহীনভাবে সেচপাম্প চালিয়ে পানি উঠিয়ে বিলগুলো পূর্ণ করা হচ্ছে।

হাবাসপোল এলাকার বাসিন্দা শওকত হোসেন বলেন, ‘ঘেরমালিকেরা মাছ চাষ করে আরও বড়লোক হবেন। আর সাধারণ মানুষ পানিতে ডুববে, এটা হতে পারে না। তাই এখনই যথেচ্ছ ভূগর্ভের পানি ওঠানো বন্ধ করতে হবে।’ ব্যাসডাঙ্গা গ্রামের রিয়াজ উদ্দীন দফাদার বলেন, এভাবে মাটির নিচ থেকে পানি ওঠানো অন্যায়। একই গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম বলেন, এই পানি ওঠানোয় নিচের পানির অপচয় হচ্ছে।

পরিবেশ আন্দোলনের নেতা ও পাঁজিয়া সমাজকল্যাণ সমিতির পরিচালক বাবর আলী গোলাদার বলেন, ভূগর্ভের পানি ওঠানোটাই পরিবেশের ক্ষতি। এর ওপর বিল এখন পানিতে ভরে থাকলে বৃষ্টি হলে বাড়িঘর ডুবে যাবে। সেচপাম্প দিয়ে পানি তোলা বন্ধ করতে হবে।

জানতে চাইলে মধ্যকুল গ্রামের মাছের ঘেরমালিক আতিয়ার রহমান বলেন, ভূগর্ভের পানি ওঠানো উচিত নয়। তারপরও মাছ বাঁচাতে হলে মাটির নিচ থেকে পানি ওঠাতে হবে। প্রকৃতির পানির অপেক্ষায় থাকলে মাছ চাষ করা যাবে না।

এ ব্যাপারে কেশবপুরের নাগরিক সমাজের আহ্বায়ক ও পানি সরাও মানুষ বাঁচাও আন্দোলনের নেতা আইনজীবী আবু বকর সিদ্দিকী বলেন, অব্যাহতভাবে ভূগর্ভের পানি ওঠানো হলে এলাকার পানির স্তর নিচে নেমে গিয়ে একসময় বড় ধরনের সমস্যা হতে পারে। তাই ভূগর্ভের পানির অপচয় রোধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী রায়হান আহম্মেদ বলেন, ভূগর্ভ থেকে যথেচ্ছ পানি ওঠানোর কারণে ক্রমান্বয়ে পানির স্তর নিচে নেমে যাচ্ছে। ভূগর্ভের পানি ওঠানো সীমিত করতে হবে। এভাবে পানি ওঠানো অবশ্যই বন্ধ করা উচিত। তিনি বলেন, উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় সভায় তিনি এ বিষয়ে কয়েকবার কথা বলেছেন।

কেশবপুরের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এম এম আরাফাত হোসেন বলেন, ভূগর্ভের পানির অপচয় বন্ধ করতে কৃষিকাজে ব্যবহৃত সেচযন্ত্র দিয়ে অন্য কাজে পানি ব্যবহার করা যাবে না বলে উপজেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় সিদ্ধান্ত হয়েছে। সে কারণে বৈদ্যুতিক সেচপাম্পগুলোর বিদ্যুৎ সংযোগ আপাতত বন্ধ রাখার জন্য পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কাছে চিঠি দেওয়া হচ্ছে। সেচ মৌসুমে আবার সংযোগ দেওয়া হবে।