কিশোরগঞ্জের ভৈরবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের নেতা আল আমিন (৪০) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করে হত্যাকারীদের গতিপথ খুঁজে বের করার চেষ্টা করছে পুলিশ। পরিবারের পক্ষ থেকে করা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের অভিযোগকেও গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।
পুলিশের ভাষ্য, এখন পর্যন্ত পাওয়া আলামতে পারিবারিক বিরোধের বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। তবে আরও কয়েকটি বিষয়ও তদন্তে রাখা হয়েছে।
এদিকে হত্যার তিন দিন পর আজ বুধবার বিকেলে ভৈরব থানায় মামলা হয়েছে। আল আমিনের স্ত্রী তানিয়া খানম বাদী হয়ে ওই মামলা করেন।
আল আমিন ভৈরব পৌর যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। পাশাপাশি পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও ভৈরব চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক পরিচালক ছিলেন। সারের ব্যবসার পাশাপাশি তাঁর রিভারভিউ নামে একটি আবাসিক হোটেল ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর একাধিক মামলা হয়েছিল। তিনি দুবার গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে ছিলেন। বর্তমানে জামিনে ছিলেন।
পুলিশ জানায়, এজাহারে ৮ জনের নাম উল্লেখ করা হয়। অজ্ঞাতনামা আসামি আরও ১০ থেকে ১২ জন।
ভৈরব শহর ফাঁড়ির ইনচার্জ উপপরিদর্শক (এসআই) নুরুল হুদা ভূঁইয়া বলেন, তদন্তের প্রয়োজনে এজাহারে উল্লেখ করা কারও নাম বলা যাচ্ছে না। তবে তিনি ইঙ্গিত দেন এজাহারে উল্লেখ করা নামগুলো আল আমিনের পরিবারের সদস্য।
গত রোববার দিবাগত রাত ১২টার দিকে পৌর শহরের টিনপট্টি এলাকায় আল আমিনকে কুপিয়ে আহত করা হয়। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে রাত তিনটার দিকে চিকিৎসকেরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
পুলিশ জানিয়েছে, হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরে আল আমিন এবং হামলাকারীদের গতিপথের কিছু তথ্য সিসিটিভি ফুটেজ থেকে পাওয়া গেছে। তবে হামলার ঘটনাস্থলের ক্যামেরাটি সড়কের দিকে ছিল না। ফলে হামলার দৃশ্যের ফুটেজ পাওয়া যায়নি। ওই ক্যামেরায় হামলার সময়ের কিছু শব্দ রেকর্ড হয়েছে। পুলিশ এখন সেসব শব্দও বিশ্লেষণ করছে।
এসআই নুরুল হুদা ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, পাওয়া ফুটেজগুলোর মান ভালো না। তবে পরিবারের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ফুটেজের অনেক কিছুর মিল পাওয়া গেছে। এ কারণে পরিবারের অভিযোগকে অপ্রাসঙ্গিক মনে করছে না পুলিশ। আপাতত পারিবারিক বিরোধকেই হত্যার মূল কারণ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসায়িক বিরোধ আছে কি না, তা–ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আরও কয়েকটি কারণ ভাবনায় রাখা হয়েছে।
পুলিশ ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আল আমিন ঘটনার রাতে ভৈরব বাজারে তাঁর ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রিভারভিউ হোটেলে ছিলেন। সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, রাত ১১টা ৩৮ মিনিটে তিনি হোটেল থেকে মোটরসাইকেল নিয়ে বের হন। রাত ১১টা ৪২ মিনিটে গোপাল জিউর মন্দির এলাকা অতিক্রম করেন। এরপর বাড়ির সড়কে প্রবেশের এক মিনিটের মধ্যে তিনি হামলার শিকার হন।
পুলিশের ভাষ্য, আল আমিন ও হামলাকারীরা পৃথক পথ দিয়ে মোটরসাইকেলে করে ঘটনাস্থলের দিকে আসে। হত্যাকারীরা আগে থেকেই ওই সড়কে অপেক্ষা করছিল কি না, কিংবা আল আমিনকে অনুসরণ করছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের পর হামলাকারীদের গতিপথও সিসিটিভি ফুটেজের মাধ্যমে শনাক্তের চেষ্টা চলছে। ঘটনাস্থল থেকে হত্যায় ব্যবহৃত কোনো অস্ত্র বা অন্য কোনো আলামত এখনো উদ্ধার করা যায়নি। তবে ঘটনাস্থলের ক্যামেরায় রেকর্ড হওয়া শব্দ তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছে পুলিশ।
আল আমিনের স্ত্রী তানিয়া খানম বলেন, আহত অবস্থায় তাঁর স্বামী কিছুটা কথা বলতে পারছিলেন। তখন আল আমিনের আপন চাচাতো ভাই হাসান ও জুম্মানের নাম বলে গেছেন। মূলত সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের সূত্র ধরেই এই হত্যাকাণ্ড বলে তানিয়ার বিশ্বাস।
পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আল আমিনের বাবা জসিম উদ্দিন ও তাঁর দুই ভাই নজরুল ইসলাম ও মোমেন মিয়া। তাঁদের মধ্যে জসিম ও নজরুল মারা গেছেন। মোমেন ভৈরব বাজারের তেল ব্যবসায়ী। জুম্মান (২৪) ও হাসান (২২) হলেন মোমেন মিয়ার ছেলে। ভৈরব বাজারে অবস্থিত ‘ফকির মার্কেট’ নামে তাঁদের একটি পারিবারিক সম্পত্তি রয়েছে। ওই সম্পত্তির ভাগ-বাঁটোয়ারা নিয়ে আল আমিনের সঙ্গে কয়েক বছর ধরে বিরোধ চলছিল।
আল আমিনের মা মিনারা বেগম বলেন, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের পর তাঁর দেবরের ছেলেরা আল আমিনকে কুপিয়ে ফেলে রাখার হুমকি দিতেন। তিনি বিষয়টি বিশ্বাস করেননি। এখন তাঁর মনে হচ্ছে, সেই হুমকিই সত্যি হয়েছে।
এদিকে ঘটনার পর থেকে মোমেন মিয়ার পরিবারের সদস্যরা বাড়িতে নেই। বাড়িটি তালাবদ্ধ রয়েছে। তাঁদের মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। তবে মোমেন মিয়ার এক আত্মীয় নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, কিছুদিন আগে উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলামের মধ্যস্থতায় ওই বিরোধ মীমাংসা করা হয়।
এসআই নুরুল হুদা ভূঁইয়া আরও বলেন, হত্যাকারী কতজন ছিল, সে বিষয়ে পুলিশ মোটামুটি নিশ্চিত হয়েছে। তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই তা বলা হচ্ছে না। তাদের চেহারা বা পোশাক শনাক্ত করা গেছে কি না, সেটিও তিনি স্পষ্ট করেননি।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসানকে ছাত্রদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলে প্রচার করা হলেও ভৈরব উপজেলা ছাত্রদলের সভাপতি ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে জানিয়েছেন, হাসানের সঙ্গে ছাত্রদলের কোনো ধরনের সম্পর্ক নেই।