‘হাতপাখার গ্রামে’ এখন নারীদের ব্যস্ততা

হাতপাখা তৈরি কাজে ব্যস্ত নারীরা। সম্প্রতি কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার দামপাড়া ইউনিয়নেছবি : প্রথম আলো

ঘরের উঠান, বারান্দা কিংবা আঙিনা—সবখানেই চলছে তালপাতার হাতপাখা তৈরির ব্যস্ততা। তীব্র গরম আর ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে বেড়েছে হাতপাখার চাহিদা। আর সেই চাহিদা মেটাতে দিনরাত কাজ করছেন প্রায় তিন শতাধিক নারী। তাঁদের বাড়ি কিশোরগঞ্জের নিকলী উপজেলার দামপাড়া ইউনিয়নের টেকপাড়া ও বর্মনপাড়ায়।

৬৫ বছর বয়সী অর্চনা রানী সূত্রধর তাঁদের একজন। প্রায় ৫০ বছর ধরে তালপাতার হাতপাখা তৈরি করছেন। যে হাতপাখা একসময় পাঁচ টাকায় বিক্রি করতেন, এখন সেটিই বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ১০০ টাকায়।

স্থানীয়দের ভাষায়, সারা বছর টুকটাক কাজ করলেও চৈত্র মাস আসার আগে থেকেই এ গ্রামের দৃশ্যপট যেন পাল্টে যায়। সব বাড়িতে দেখা যায় হাতপাখা তৈরির দৃশ্য। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে পাখা তৈরির খ্যাতির কারণে টেকপাড়া ও বর্মনপাড়া এখন পরিচিত ‘হাতপাখার গ্রাম’ হিসেবে। প্রায় শতাধিক পরিবারের সদস্যরা এ পেশার সঙ্গে জড়িত। শুরুতে হিন্দু পরিবারের নারীরা হাতপাখা তৈরি করতেন। এখন মুসলিম পরিবারের নারীরাও যুক্ত হয়েছেন এই কাজে। হাতপাখা বিক্রির আয়েই চলছে অনেক পরিবারের সংসার, সন্তানদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন খরচ।

সম্প্রতি দুটি গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, নারী ও শিশুরা সবাই কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত। কেউ তালপাতা প্রস্তুত করছেন, কেউ পাখা বুনছেন, কেউ আবার রং করছেন বা বেত দিয়ে পাখার কাঠামো শক্ত করছেন। অনেক বাড়িতে কয়েকজন নারী একসঙ্গে বসে গল্প করতে করতে কাজ করছেন। তাঁদের কাজে সহযোগিতা করছে স্কুল-কলেজপড়ুয়া সন্তানরা।

কারিগরদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি হাতপাখা তৈরিতে কয়েকজনের শ্রম লাগে। প্রথমে তালপাতা কয়েক ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে বা রোদে শুকিয়ে নেওয়া হয়। এরপর নির্দিষ্ট আকারে কেটে বাঁশ, বেত, সুতা ও রঙের সাহায্যে তৈরি করা হয় পাখা। মানভেদে প্রতিটি পাখা পাইকারি ৭০ থেকে ৮০ টাকা এবং খুচরা ৯০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি হয়।

নির্দিষ্ট আকারে কেটে বাঁশ, বেত, সুতা ও রঙের সাহায্যে তৈরি করা হয় পাখা
ছবি: প্রথম আলো

অর্চনা রানী সূত্রধর বলেন, প্রায় ৫০ বছর আগে পাখা বানানো শুরু করি। তখন পাঁচ টাকায় একটি পাখা বিক্রি করেছি। এখন একেকটা পাখা ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হয়। এবার গরম বেশি আর বিদ্যুৎও ঘন ঘন চলে যাওয়ায় চাহিদা বেড়েছে।

ঝুলন রানী সূত্রধরসহ কয়েকজন নারী কারিগর জানান, হাতপাখা বিক্রির আয়েই তাঁদের সংসার চলে। তবে কাঁচামালের দাম বাড়ায় আগের মতো লাভ থাকে না। তালপাতা, বাঁশ, বেত, সুতা ও প্লাস্টিক—সবকিছুর দাম বেড়েছে।

গ্রামের প্রবীণ কারিগর শুভা রানী বলেন, প্রায় ৫৫ বছর আগে তিনিই প্রথম এ গ্রামে হাতপাখা তৈরির কাজ শুরু করেন। পরে তাঁর কাছ থেকে শিখে অন্য নারীরাও এ পেশায় যুক্ত হন। এখন শতাধিক পরিবারের প্রায় তিন শতাধিক নারী এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত।

হারেছা আক্তার নামের এক কারিগর বলেন, তাঁর স্নাতকপড়ুয়া মেয়েসহ তিন সন্তানই এ কাজে সহযোগিতা করে। হাতপাখা বিক্রির টাকায় তাদের পড়াশোনার খরচ চালাতে সাহায্য হয়।

নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লাসহ বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকারদের পাখা নেওয়ার এই দুই গ্রামে আসেন। নরসিংদী থেকে আসা পাইকার আরজু মিয়া বলেন, তিনি দুই গ্রাম থেকে প্রায় দেড় হাজার হাতপাখা কিনেছেন। এসব পাখা নরসিংদী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কুমিল্লা, সিলেটসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি করবেন। প্রতিটি হাতপাখা তিনি ১০০ থেকে ১১০ টাকায় বিক্রির আশা করছেন।

তবে এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কাও রয়েছে। স্থানীয় স্কুলশিক্ষক সাইফুল ইসলাম বলেন, কাঁচামালের দাম যেভাবে বাড়ছে, তাতে ঐতিহ্যবাহী এই পেশা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। সরকারিভাবে সহায়তা প্রয়োজন।

হাতপাখা তৈরির কারিগরদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করেও তাঁরা কোনো সরকারি সহায়তা পাননি। সহজ শর্তে ঋণ ও আর্থিক সহায়তা পেলে তাঁরা উৎপাদন বাড়াতে পারবেন বলে দাবি তাঁদের।

এ বিষয়ে নিকলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেহেনা মজুমদার মুক্তি বলেন, খোঁজখবর নিয়ে প্রত্যন্ত হাওরাঞ্চলের এসব সংগ্রামী নারীর পেশাকে টিকিয়ে রাখতে কী ধরনের সরকারি সহায়তা দেওয়া যায়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে।