যে পুকুরে পদ্মফুলের সঙ্গে খেলা করে রঙিন মাছ ও বক

পদ্মপাতার উপরে বসেছে বক পাখি। যশোর শহরের কালেক্টরেট পুকুরে
ছবি: প্রথম আলো

‘ভালবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি/..../বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টি নীলপদ্ম’—কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কবিতায় এভাবে ১০৮টি নীলপদ্ম খুঁজছেন বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে। অথচ যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র কালেক্টরেট পুকুরেই হাজার পদ্মফুলের দেখা মিলবে একসঙ্গেই। যদিও এসব পদ্ম নীল নয়, গোলাপি।

‘কেউ কথা রাখেনি’ নামের ওই কবিতায় পদ্মফুলের মাথায় খেলা করেছে ‘সাপ আর ভ্রমর’। আর কালেক্টরেট পুকুরে পদ্মফুলের সঙ্গে বিদেশি রঙিন মাছ, ভ্রমণ ও বক পাখি খেলা করে। মাঝে মাঝে আসে সাপও। শহরের ব্যস্ততম এই প্রাঙ্গণে এমন দৃশ্য উপভোগ করতে দিনভর দর্শণার্থীরা আসেন। বিশেষ করে পড়ন্ত বিকেলে শহরবাসী পরিবার–পরিজন নিয়ে পুকুরপাড়ে আসেন স্বস্তি পেতে।

স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন, শান্ত পরিবেশে হাঁটার জন্য বিশাল পুকুরের চারপাশে পায়ে হাঁটার পথ নির্মাণ করা হয়েছে। পুকুরে শানবাঁধানো দুটি সুন্দর ঘাট রয়েছে। মানুষের বসার জন্য পুকুরের চারপাশ দিয়ে নির্মিত সুরক্ষাপ্রাচীরের সঙ্গে রয়েছে বসার ব্যবস্থাও। শহরের বাসিন্দাদের জন্য ডোবা পুকুর সংস্কার করে নান্দনিক পদ্মপুকুরে রূপান্তরিত করেছে জেলা প্রশাসন।

এ বিষয়ে যশোরের জেলা প্রশাসক তমিজুল ইসলাম খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘কালেক্টরেট প্রাঙ্গণের পুকুরটি জেলা প্রশাসন ও বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের আর্থিক সহযোগিতায় সংস্কার করেছি। এরপর বিভিন্ন জায়গা থেকে ২০০টি পদ্মফুলের কন্দ সংগ্রহ করে পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পুকুরে ছাড়া হয়েছে আট হাজারের বেশি বিদেশি রঙিন মাছ। এ দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন হাজারো মানুষ ওই পুকুরপাড়ে ভিড় করেন। মানুষ আনন্দ পাচ্ছেন—এটাই ভালো লাগছে।’

পদ্মপুকুরে খেলা করছে রঙিন মাছ
ছবি: প্রথম আলো

জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ ও যশোরের অভয়নগর উপজেলা থেকে ২০০টি পদ্মের কন্দ আনা হয়। ওই পদ্ম যখন বাড়তে শুরু করে, তখন ঝিকরগাছা উপজেলার উদ্যোক্তা সালমানের সঙ্গে পরামর্শ করে পুকুরে ছেড়ে দেওয়া হয় আট হাজার রঙিন মাছ।

পদ্মপুকুর দেখতে এসেছেন স্থানীয় একটি কলেজের শিক্ষক নজরুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘আগেও অনেকবার এখানে এসেছি। এবার এসে দেখি অনেক পরিবর্তন হয়েছে। পুরো পুকুর পরিষ্কার। চারপাশ বাঁধানো। পুকুরে পদ্মফুল ও রঙিন মাছ খেলা করছে। দেখেই চোখ জুড়িয়ে যায়।’

সম্প্রতি ওই পদ্মপুকুরপাড়ে গিয়ে দেখা যায়, পুকুরের শানবাঁধানো ঘাটের পাশে স্বচ্ছ পানিতে রঙিন মাছের দল ভেসে বেড়াচ্ছে। মাছগুলোকে দর্শকদের কেউ কেউ মুড়ি ছিটিয়ে দিচ্ছেন। সেই মুড়ি খেতে পানির ওপরে ভেসে উঠছে মাছের দল। এ নয়নাভিরাম দৃশ্য উপভোগ করছেন দর্শনার্থীরা। বৈশাখের তপ্ত দুপুরে একটু বিশ্রাম নিতে অনেকে বসেছেন পুকুরের পাশে নির্মিত বেঞ্চে।

পুকুরের চারপাশে নির্মাণ করা হয়েছে কংক্রিটের বসার টুল
ছবি: প্রথম আলো

দুই ছেলেমেয়েকে নিয়ে পদ্মপুকুর দেখতে এসেছেন সেলিম হোসেন নামের এক দর্শনার্থী। তিনি বলেন, ‘পাশের মার্কেটে স্ত্রীসহ পরিবারের লোকজন কেনাকাটা করছেন। এই ফাঁকে স্বস্তি পেতে সন্তানদের নিয়ে পদ্মপুকুরে এসেছি। রঙিন মাছ ও পদ্মফুল দেখে ওরা আনন্দ পাচ্ছে। আমারও ভালো লাগছে। আসলে এই প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা তো এমন পদ্মফুল দেখতে পায় না। যশোরের জেলা প্রশাসন এমন নানন্দিক উদ্যোগ নেওয়ায় কালেক্টরেট চত্বরটার সৌন্দর্যই বেড়ে গেছে।’

সারা বছর পানি থাকে এমন জায়গায় পদ্ম ভালো জন্মে। তবে খাল-বিল, হাওর, বাঁওড় ইত্যাদিতেও এ উদ্ভিদ জন্মে। পাতা বড় এবং গোলাকৃতি, কোনো কোনো পাতা পানিতে লেপটে থাকে, কোনোটা উঁচানো। ফুল বৃহৎ এবং বহু পাপড়িযুক্ত। সাধারণত বোঁটার ওপর খাড়া, ৮-১৫ সেন্টিমিটার চওড়া। ফুলের রং লাল, গোলাপি ও সাদা, সুগন্ধিযুক্ত। পুরোনো গাছের কন্দ ও বীজের সাহায্যে এদের বংশবিস্তার হয়।