ফোন করলে মোটরসাইকেলে চা নিয়ে হাজির হন ‘রনি ভাই’

মোটরসাইকেলে ঘুরে ঘুরে চা বিক্রি করেন রনি আহম্মেদ। সোমবার সকালে রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান বাজারেছবি: প্রথম আলো

কেউ আছেন মাছের আড়তে, কেউ কাপড়ের দোকানে। কেউ আবার মাঠে খেলাধুলা করছেন কিংবা আমবাগানে আড্ডা দিচ্ছেন। চায়ের তৃষ্ণা পেলেই একটি ফোনকল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মোটরসাইকেলে চা নিয়ে হাজির হন রনি। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে তিনি পরিচিত ‘রনি ভাই’ নামে।

রাজশাহীর পবা উপজেলার হরিয়ান ইউনিয়নের দহপাড়া গ্রামের বাসিন্দা রনি আহম্মেদ (৪৩)। করোনার লকডাউনের সময় যখন চায়ের দোকানগুলো বন্ধ হয়ে যায়, তখনই তিনি শুরু করেন ভ্রাম্যমাণ চায়ের ব্যবসা। প্রথমে একটি ফ্লাস্ক ও সাইকেল নিয়ে যাত্রা শুরু করলেও এখন মোটরসাইকেলে করে বিভিন্ন এলাকায় চা পৌঁছে দেন। প্রতিদিন সকাল ১০টার মধ্যে বাড়িতে চা বানিয়ে মোটরসাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়েন। সারা দিন চা বিক্রি শেষে বাড়ি ফিরতে রাত ১১টা–১২টা বেজে যায়। পবা উপজেলার কাটাখালী, হরিয়ান, খড়খড়ি, দুর্গাপুর উপজেলার আমগাছি, পুঠিয়া উপজেলার বেলপুকুরসহ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন এলাকায় তিনি চা বিক্রি করেন।

সোমবার সকালে রনি বাড়ি থেকে বের হওয়ার পর তাঁর প্রথম ক্রেতা স্থানীয় যুবক খালেদুজ্জামান শ্যামল। চা পান করতে করতে তিনি বলেন, ‘করোনার সময় সারা দেশে দোকানপাট বন্ধ ছিল। তখন কোথাও চায়ের দোকানও খোলা ছিল না। পরে দেখি, একজন মোটরসাইকেলে চা বিক্রি করছেন। রনি ভাইয়ের এই সেবাটা আমাদের জন্য অনেক বড় সুবিধা ছিল। যেখানে থাকতাম, ফোন দিলেই চা নিয়ে চলে আসতেন। এখনো আমরা সুযোগ পেলেই তাঁকে ডাকি। তাঁর মসলা চায়ের স্বাদ আলাদা।’

স্থানীয় ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘করোনার সময় রনি আমাদের মনে রাখার মতো সার্ভিস (সেবা) দিয়েছিলেন। সব জায়গায় চা পৌঁছে দিয়েছিলেন। এখনো ফোন করলেই চা দিয়ে যান। ৫-৭ কিলোমিটার দূরে গিয়েও দিয়ে আসেন। ফোন করলে তিনি চা দিতে কখনো না করেন না।’

স্থানীয় বাসিন্দা শাহজাহান আলী বলেন, ‘আমাদের বাজারে দুধ চা সব সময় পাওয়া যায় না। কিন্তু রনি ভাইকে ফোন দিলে সঙ্গে সঙ্গে চলে আসেন। বাজারে, মাঠে, এমনকি বাড়িতেও চা পৌঁছে দেন। আমাদের জন্য এটা খুবই সুবিধাজনক সেবা।’

ক্রেতার হাতে চা দিচ্ছেন রনি। সোমবার সকালে রাজশাহীর পবা উপজেলার কাটাখালী মাছ বাজারে
ছবি: প্রথম আলো

হরিয়ান বাজারের ব্যবসায়ী আবদুল আলিম বলেন, ‘রনি ভাই পরিশ্রম করেন। মানুষের প্রয়োজনের সময় চা পৌঁছে দেন। দোকান ছেড়ে আমাদের কোথাও যেতে হয় না। ফোন দিলেই চলে আসেন।’

কাটাখালী বাজারের মাছ ব্যবসায়ী মো. পিন্টু বলেন, প্রতিদিন রনি বাজারে আসেন। যার যখন প্রয়োজন, ফোন করলেই হাজির হন। তাঁর নিয়মিত অনেক ক্রেতা আছে।

রনি আহম্মেদ বলেন, ‘আগে হরিয়ানের তেঁতুলতলা বাজারে আমার একটা চায়ের দোকান ছিল। করোনার সময় দোকানে লোকজনের আড্ডা বন্ধ হয়ে গেলে সংসার চালানোর চিন্তায় নতুন পথ খুঁজতে থাকি। পরে প্রথমে একটা ফ্লাস্ক আর সাইকেল নিয়ে চা বিক্রি শুরু করি। মানুষ ফোন নম্বর রেখে দিত। কেউ আমবাগান থেকে ডাকত, কেউ বাজার থেকে। পরে বুঝলাম, মোটরসাইকেল থাকলে আরও বেশি জায়গায় যেতে পারব। তখন ঋণ নিয়ে মোটরসাইকেল কিনি।’

প্রতিদিন সকাল ও বিকেলে দুই দফায় চা বিক্রি করেন রনি। তাঁর কাছে মসলা চা, দুধ চা, ব্ল্যাক কফি, দুধ কফি ও ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য চিনি ছাড়া চা–ও পাওয়া যায়। ৫-১০ টাকার মধ্যে তাঁর চায়ের দাম। তিনি বলেন, ‘সকালে গড়ে ১৫০ কাপ আর বিকেলে প্রায় ৩০০ কাপ চা ফ্লাস্কে ভরে বিক্রির উদ্দেশে বের হই। অনেক সময় কিছু চা অবিক্রীত থেকে যায়, সেগুলো ফেলে দিতে হয়। তারপরও আল্লাহর রহমতে সংসার চলে যাচ্ছে।’

বাড়িতে চা তৈরির পর ফ্লাস্কে ভরছেন রনি। সোমবার সকালে রাজশাহীর পবা উপজেলার দহপাড়া গ্রামে
ছবি: প্রথম আলো

জীবনের গল্প বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন রনি। তিনি জানান, সাত বছর বয়সে তাঁর মা মারা যান। দুই সন্তানকে রেখে বাবা বিয়ে করে অন্যত্র চলে যান। রনি ও তাঁর বোনের ঠাঁই হয় নানির সংসারে। নানা মারা গিয়েছিলেন আগেই। সংসার চালাতে শিশুকালেই রনি তুলে নেন বাদামের ঝুড়ি। এরপর কিছুটা বড় হয়ে তিনি ভ্যান চালাতে শুরু করেন। বিয়ের পর স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে সংসার চালাতে গিয়ে আর্থিক অনটনে পড়েন। ১২ বছর আগে বাড়ির পাশে তেঁতুলতলা বাজারে ছোট্ট একটি চায়ের দোকান দেন তিনি। যা পেতেন, তা দিয়ে সংসার চলে যেত। করোনাকালে রাজশাহীতে লকডাউন শুরু হলে আর্থিক সংকটে পড়েন। তখন থেকে মূলত ভ্রাম্যমাণ চা বিক্রি করছেন।

রনি বলেন, ‘আমার বড় ছেলে হাফেজি শেষ করে মাওলানা কোর্সে পড়ছে। ছোট ছেলেও হিফজ করছে। আমার স্বপ্ন হলো দুই ছেলেকে শিক্ষিত করা। এই চা বিক্রির টাকাতেই তাদের মানুষ করার চেষ্টা করছি।’ চা বিক্রির কাজে সবচেয়ে বড় সহযোগী তাঁর স্ত্রী। তিনি বলেন, ‘ভোরের আগে আমার স্ত্রী চা তৈরি করে দেয়। আমি রাত করে বাড়ি ফিরি। আবার সকালে বের হয়ে যাই। সংসার আর ব্যবসা—দুটোই আমরা দুজন মিলে সামলাই।’ ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘একদিন যদি সামর্থ্য হয়, তাহলে একটা বড় দোকান দেব। আরও নানা ধরনের খাবার রাখব। তবে আপাতত আমার স্বপ্ন, এই চা বিক্রি করেই ছেলেদের মানুষ করা।’