জিপিএ-৫ পাওয়া প্রতিবন্ধী মেয়ের লেখাপড়া চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় মা–বাবা

২০২২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছেন পুষ্পিতা কবির
ছবি: প্রথম আলো

সকালে ঘুম ভাঙলে মেয়ের দাঁত ব্রাশ করে দেন মা। গোসল, জামা পরানো ও এলোমেলো চুল চিরুনিও করে দেন। মুখে তুলে খাওয়ান। শেষে বিদ্যালয়ে পাঠান সহপাঠীদের সঙ্গে। জন্মের পর থেকে এভাবেই একমাত্র মেয়ের দেখভাল করেছেন মা রহিমা আক্তার। এর মধ্যেই মেয়ের বয়স ২০ বছর পেরিয়ে গেছে।

মেয়েটির নাম পুষ্পিতা কবির (২০)। তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধী। জন্ম থেকেই দুই হাত বাঁকা। সেই বাঁকা হাতে আঁকা ছবি ঠাঁই পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভেচ্ছা কার্ডে। ২০২২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে পেয়েছেন জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি। সেই মেয়ের এখন পড়ালেখা চালানো নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন মা-বাবা।

পুষ্পিতা কবিরের বাড়ি গাইবান্ধা শহরের মাস্টারপাড়া এলাকায়। তাঁর বাবা ফিরোজ কবির। তিনি একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কারিগরি শাখায় চাকরি করেন। মা রহিমা আক্তার গৃহিণী। তাঁদের একমাত্র সন্তান পুষ্পিতা। ফিরোজ কবির যে বেতন পান, তা দিয়ে সংসারের খরচ, মেয়ের লেখাপড়া ও চিকিৎসার খরচ চলে না। তাই সকাল-বিকেল এসি ও রেফ্রিজারেটর মেরামতের কাজ করেন। এরপরও মেয়ের উচ্চশিক্ষা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি।

পুষ্পিতা ২০১৫ সালে গাইবান্ধা ল্যাবরেটরি স্কুল থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে জিপিএ-৫ পান। গাইবান্ধা সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ে ভর্তি হন। এ বিদ্যালয় থেকে ২০২০ সালে এসএসসিতে জিপিএ-৫ পান। আর অষ্টম শ্রেণিতে তিনি জিপিএ-৫ নিয়ে উত্তীর্ণ হন।
ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ার পাশাপাশি পুষ্পিতা বাঁকা হাতে ছবিও আঁকেন। জেলা পর্যায়ের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান ও বিভাগীয় পর্যায়ে স্বর্ণপদক অর্জন করেন। তাঁর আঁকা গ্রামীণ দৃশ্যের চিত্রাঙ্কন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভেচ্ছা কার্ডে স্থান পেয়েছে। ১৪২৩ বঙ্গাব্দে প্রধানমন্ত্রীর শেখ হাসিনার শুভেচ্ছা কার্ডে পুষ্পিতার আঁকা ছবি ঠাঁই পায়। কার্ডটির নিচে এক পাশে লেখা ছিল শারীরিক প্রতিবন্ধী শিশু পুষ্পিতা কবিরের আঁকা ছবি।

পুষ্পিতা কবির ভবিষ্যতে চিকিৎসক হতে চান। চিকিৎসক হয়ে মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করার ইচ্ছা তাঁর। পুষ্পিতা বলেন, চিকিৎসক হলে বিনা পয়সায় গরিব মানুষের সেবা করবেন। অন্য চাকরি পেলেও মানুষের কল্যাণে কাজ করবেন। কেউ চাইলে তিনি স্বেচ্ছাশ্রমে ছবি আঁকা শেখাবেন।

জন্ম থেকেই দুই হাত বাঁকা পুষ্পিতার। সেই বাঁকা হাতে আঁকা ছবি ঠাঁই পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শুভেচ্ছা কার্ডে। ২০২২ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় গাইবান্ধা সরকারি কলেজ থেকে পেয়েছেন জিপিএ-৫ পেয়েছেন তিনি।
ছবি আঁকছেন পুষ্পিতা কবির
ছবি: প্রথম আলো

পুষ্পিতার রহিমা আকতার বলেন, মেয়েটি নিজের মেধায় সমাজে তাঁদের মুখ উজ্জ্বল করেছেন। মেয়েকে আরও পড়াতে চান। কিন্তু তাঁদের অবস্থা ভালো নয়। কীভাবে মেয়ের পড়ালেখা খরচ জোগাবেন, বুঝতে পাচ্ছেন না।

মেয়েটির বাবা ফিরোজ কবির বলেন, ‘আমার ছোট ভাই ফরহাদ কবির মেরিন বিভাগের প্রকৌশলী ছিলেন। সে আমার মেয়ের চিকিৎসার দায়িত্ব নিয়েছিল। কিন্তু কয়েক বছর আগে সে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যায়। তখন থেকে টাকার অভাবে মেয়েকে উন্নত চিকিৎসা করাতে পারছি না। অন্য কারও সহায়তাও পাচ্ছি না। আমার সামান্য বেতনের চাকরি। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে গেছে। সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। তারপরও কষ্ট করে মেয়েটাকে মানুষের মতো মানুষ করতে চাই। সে বড় হয়ে যেন তার দিক থেকে মানুষের কল্যাণ করতে পারে।’