‘বাবা কোথায়, আমাকে কখন নিতে আসবেন’

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গতকাল ভর্তি পরীক্ষার সময় অসুস্থ হয়ে মারা যান ভর্তি–ইচ্ছুক এক শিক্ষার্থীর বাবা ইব্রাহীম খলিলছবি: সংগৃহীত

স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে বাবা ইব্রাহীম খলিলকে সঙ্গে নিয়ে শহর থেকে ২২ কিলোমিটার দূরে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন নাশিতা তাসনিম। সকাল থেকেই বাবা হাসিখুশি ছিলেন। দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার সময়ও ছিলেন মেয়ের পাশে। কিন্তু নাশিতা জানতেন না, তিনি পরীক্ষাকেন্দ্রে প্রবেশের কিছুক্ষণ পরেই বাবা অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আর পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগেই থেমে যাবে বাবার হৃৎস্পন্দনও। অন্য সব পরীক্ষার্থীর মতো নাশিতাও কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে বাবাকে খুঁজতে থাকেন। তাঁর মুঠোফোনেও কল দেন। স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে ছুটে যান। বারবার জানতে চান কোথায় তাঁর বাবা, তাঁকে কি নিতে আসবেন না?

গতকাল শনিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ’ডি’ ইউনিটে ২০২৫-২৬ শিক্ষাবর্ষে স্নাতক প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষার সময় দুপুরে এ ঘটনা ঘটে। সেদিন সকালে ভর্তি-ইচ্ছুক শিক্ষার্থী নাশিতা তাসনিমের বাবা ইব্রাহীম খলিল(৬০) হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করেন। একপর্যায়ে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ছাত্র হলে যান বিশ্রাম নিতে। সেখানে তাঁর মুখ দিয়ে ফেনা বের হতে শুরু করে। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পথে তাঁর মৃত্যু হয়।

ইব্রাহীম খলিলের বড় মেয়ে নাফিসা তাসমিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তরে পড়েন। মুঠোফোনে বাবার কথা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এরপর একটু থেমে বলেন, ‘সকালে আব্বু একদম সুস্থ ছিলেন। আমাদের সঙ্গে নাশতা করে নাশিতাকে নিয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ ফোন আসে, বলা হয়—আব্বু অসুস্থ। হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারি, আব্বু আর নেই।

ইব্রাহীম খলিল অসুস্থ হয়ে পড়ার সময় তাঁর সঙ্গেই ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ আব্দুর রব হলের ১০৬ নম্বর কক্ষের আবাসিক শিক্ষার্থী জসিম মিয়া। তিনি ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিকস ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী। জসিম মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘তিনি সম্ভবত আমাদের “এ” ব্লকের শৌচাগারে এসেছিলেন। সেখান থেকে বের হওয়ার পর তাঁর শরীর খারাপ লাগতে থাকে। এরপর আমাদের ১০৬ নম্বর কক্ষে এসে বিশ্রাম নিতে চান। আমি ও আমার রুমমেট তাঁকে শোয়ার ব্যবস্থা করে দিই। শোয়ার পর হঠাৎ তাঁর মুখে ফেনা আসতে শুরু করে। এ সময় তিনি মেয়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছিলেন। একপর্যায়ে দাঁড়ানোর সময় অজ্ঞান হয়ে পড়ে যান। আমরা হতভম্ব হয়ে তখন অ্যাম্বুলেন্স ডাকি। অ্যাম্বুলেন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনারের সামনে ছিল। তাই রিকশায় করে তাঁকে সেখানে নিয়ে যাই। প্রাথমিকভাবে সেখানকার সহকারী চিকিৎসক জানান, তিনি হার্ট অ্যাটাক করেছেন। এরপর আমাদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে বলেন। পরে পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তাঁরা পার্ক ভিউ হাসপাতালে নিতে বলেন। সেখানে পরিবারের সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। পরে সেখানে নিয়ে গেলে চিকিৎসক জানান, তিনি মারা গেছেন।

এ ঘটনার সময় স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন আলাওল হল সংসদের ক্রীড়া সম্পাদক বনি আল-আমিন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘গতকাল নিরাপত্তা দপ্তরের সামনে প্যাভিলিয়নে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে বসা ছিলাম। তখন জানতে পারি, এক পরীক্ষার্থীর বাবা অসুস্থ হয়েছেন। তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। কিন্তু তাঁর মেয়ে তখনো ভেতরে পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। একটু পরে খবর পাই, তিনি মারা গেছেন। ওই ব্যক্তির মুঠোফোন আমাদের কাছে জমা রাখা হয়েছিল। কিছুক্ষণ পর মেয়েটি অপরিচিত একটি নম্বর থেকে তাঁর বাবার নম্বরে কল দেন। ফোন রিসিভ করলে জানান, তিনি সোহরাওয়ার্দী হল গেটের সামনে আছেন, তাঁর বাবাকে পাচ্ছেন না। বাবা কি তাঁকে নিতে আসবেন না? আমরা গিয়ে মেয়েটির কাছে পৌঁছাই। তাঁকে গাড়িতে তুলে দিই। মেয়েটি তখনো জানতেন না, তাঁর বাবা আর পৃথিবীতে নেই।’

ইব্রাহীম খলিলের বড় মেয়ে নাফিসা তাসমিন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের স্নাতকোত্তরে পড়েন। মুঠোফোনে বাবার কথা জানতে চাইলে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এরপর একটু থেমে বলেন, ‘সকালে আব্বু একদম সুস্থ ছিলেন। আমাদের সঙ্গে নাশতা করে নাশিতাকে নিয়ে ভর্তি পরীক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে যান। গাড়ি নিয়ে গিয়েছিলেন। হঠাৎ ফোন আসে, বলা হয়—আব্বু অসুস্থ। হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারি, আব্বু আর নেই। প্রায় ১০ বছর আগে তাঁর হার্টে রিং পরানো হয়েছিল। এরপর আর কোনো সমস্যা হয়নি। এভাবে চলে যাবেন আমরা বুঝতে পারিনি।’

গতকাল বাদ জোহর চট্টগ্রামে ইব্রাহীম খলিলের জানাজা পড়ানো হয়। এরপর কুমিল্লায় গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। আজ রোববার বাদ আসর জানাজার পর তাঁর দাফন হয় বলে জানান মেয়ে নাফিসা তাসমিন।

নাফিসা জানান, বাবার খুব আদরের ছিলেন তাঁরা দুই বোন। তিনি আরও বলেন, ‘আমি বড় মেয়ে হিসেবে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছি। বাবার ইচ্ছা ছিল, ছোট বোনও এখানে পড়বে। বাবা আমাদের খুব আদর করতেন। বাসায় এসে সবার আগে জিজ্ঞেস করতেন, আমি এসেছি কি না। নাশিতা বাসায় এসেছে কি না, জানতে চাইতেন। এখন আর কেউ জানতে চাইবে না।’

নিহত ইব্রাহীম খলিল কুমিল্লা জেলার বাসিন্দা। তবে তিনি চট্টগ্রাম নগরের জিইসি মোড় এলাকার একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করতেন।