বইঠা হাতে মেঘনায় ২৫ বছর, নদীই এখন তাসলিমার ঠিকানা
আড়াই দশক আগে স্বামীর মৃত্যুর পর শিশুসন্তানদের নিয়ে অথই সাগরে পড়েন তাসলিমা বেগম। বাধ্য হয়ে স্বামীর রেখে যাওয়া নৌকার বইঠা হাতে তুলে নেন তিনি। নৌকা চালিয়ে মেঘনার শাখানদীর এক পার থেকে অপর পারে মানুষ ও কৃষিপণ্য পারাপার করে জীবিকা নির্বাহ করেন তিনি।
নিজের থাকার জায়গা নেই তাসলিমার। অন্যের জমিতে ঘর তুলে বসবাস করেন। ঝড়-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নৌকা চালান তিনি। ২৫ বছর ধরে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন ৬৫ বছর বয়সী এই সংগ্রামী নারী।
তাসলিমা বেগমের বাড়ি শরীয়তপুরের গোসাইরহাট উপজেলার কোদালপুর ইউনিয়নের হাজীপাড়া এলাকায়। ওই ইউনিয়নের পাশে মেঘনা নদী। বিভিন্ন সময় চর পড়ে সেখানে একটি শাখানদী তৈরি হয়েছে। সেই নদীতে নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন তাসলিমার স্বামী নাসির সরদার। চার শিশুসন্তানকে রেখে ২৬ বছর আগে তিনি মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পর শিশুসন্তানদের খাবার জোগাড় করতে স্বামীর নৌকা নিয়ে নদীতে নামেন তাসলিমা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, কোদালপুর মূলত কৃষিপ্রধান চরাঞ্চল। সেখানকার অধিকাংশ মানুষ কৃষিকাজ ও নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। প্রয়োজনের তাগিদে অন্য কোথাও যেতে বাসিন্দাদের নৌকা দিয়ে মেঘনার শাখানদী পার হতে হয়। ২০০১ সালে হাজীপাড়া এলাকায় একটি খেয়াঘাট তৈরি করে দেয় কোদালপুর ইউনিয়ন পরিষদ। সেই খেয়াঘাটে নৌকায় মানুষ ও কৃষিপণ্য পারাপার শুরু করেন তাসলিমা।
তবে নৌকা দিয়ে মানুষ ও কৃষিপণ্য পারাপার করে নগদ টাকা পান না তাসলিমা। নদী পারাপারের বিনিময়ে গ্রামের বাসিন্দারা ফসলের মৌসুমে তাসলিমাকে বিভিন্ন ফসল দেন। সেই ফসল বিক্রি করে সংসারের খরচ চালান তিনি। নৌকা চালানোর আয় দিয়ে তাসলিমার ভালোই চলছিল। এভাবে তিন মেয়ে ও ছেলেকে বড় করে বিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু পাঁচ বছর আগে বিপদ নেমে আসে সংসারে। ছেলে আলী আকবর সড়ক দুর্ঘটনায় একটি পা হারিয়ে পঙ্গু হয়ে যান। ছেলের চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েন তাসলিমা। সেই পঙ্গু ছেলে এখন ঢাকায় বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা চালিয়ে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে জীবন চালান।
কৃষকদের কাছ থেকে বিভিন্ন কৃষিপণ্য কিনে বিভিন্ন হাটবাজারে বিক্রি করেন কোদালপুর এলাকার রফিক সরদার। প্রতিদিন মেঘনার শাখানদী পার হয়ে হাজীপাড়ায় গিয়ে কৃষিপণ্য সংগ্রহ করতে হয় তাঁকে। রফিক প্রথম আলোকে বলেন, তাসলিমা বেগম বয়োজ্যেষ্ঠ নারী হয়েও নদীতে নৌকা চালান। তিনি এই ঘাটে নৌকা না চালালে তাঁরা অনেক বিপাকে পড়তেন। তাসলিমার নৌকা দিয়ে তিনি কৃষিপণ্য পারাপার করেন।
তাসলিমার মেয়ে বিবি সাহেরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘শিশু বয়সে আমাদের বাবা মারা যান। মা আমাদের ছেড়ে যাননি। তিনি বইঠা হাতে নৌকা নিয়ে নদীতে নেমে পড়েন। দিন-রাত পরিশ্রম করে যা আয় করতেন, তা দিয়ে আমাদের জীবন চলত। আমরা সংসারের চাপে মায়ের খোঁজ রাখতে পারি না। এই বৃদ্ধ বয়সেও মাকে নৌকা চালাতে হচ্ছে।’
তাসলিমা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘স্বামীর মৃত্যুর পর ছোট ছেলেমেয়েদের নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় পড়ি। তখন মাথায় আসে, স্বামীর রেখে যাওয়া নৌকাই আমার বেঁচে থাকার অবলম্বন হবে। ২৫ বছর ধরে নদীর একূল থেকে ওকূলে নৌকায় জীবন ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। সরকারি সহায়তা বলতে বিধবা ভাতা পাই। বড় আশা ছিল, সন্তানদের বসবাসের জন্য আর নিজের কবরের জন্য একটুকরা জমি হবে। কিন্তু সে আশা পূরণ হলো না। অন্যের জমিতে ঘর বেঁধেছি। যখন ছেড়ে দিতে বলবে, তখন ছেড়ে দিতে হবে। নদীই এখন আমার বেঁচে থাকার ঠিকানা।’
কোদালপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, স্বামী মারা যাওয়ার পর সংসারের তাগিদে নৌকা চালানো শুরু করেন। এলাকার মানুষ তাঁকে ধান-চালসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য দেন। তাতে তাঁর সংসার চলে। তাঁরা বিভিন্ন সময় ইউনিয়ন পরিষদ থেকে সহায়তা করেন। তিনি যে ঘাটে নৌকা চালান, সেখানকার ইজারা মওকুফ করা হয়েছে। তিনি যাতে একটি খাস জমি বরাদ্দ পেতে পারেন, সে উদ্যোগ নেওয়া হবে।