সুনামগঞ্জের স্মারকে ভরা জাদুঘর

‘সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর’ এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারিছবি: প্রথম আলো

সুনামগঞ্জ জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্য সংরক্ষণে প্রায় এক যুগ আগে উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। প্রতিষ্ঠা হয় ‘সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর’। ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ হতে থাকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের এই ঠিকানা। কিন্তু গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর এই জাদুঘরে হামলা হয়। খোয়া যায় অনেক জিনিসপত্র। এখন সেটিকে নতুনভাবে গড়ে তুলছে জেলা প্রশাসন।

‘হাওড়-বাঁওড় পাহাড় নদী/ মরমিয়া গান-দরদি/ সুনামগঞ্জের সুনাম যে তাই সব জাগাতে ভাই/ মনজুড়ানো এই জেলার তুলনা যে নাই...।’ গানে-সুরে দেশের উত্তর-পূর্ব কোণের সীমান্ত জেলা সুনামগঞ্জের এমনই সুনাম করেন কোনো এক বাউলশিল্পী। মরমি সাধক হাসন রাজা, বৈষ্ণব কবি রাধারমণ দত্ত, বাউলসম্রাট শাহ আবদুল করিমসহ অগুনতি সাধক-কবির জন্মধন্য এই জেলা। হাওরের জল-ঢেউ আর বসন্ত বাতাসে এখানে গানের সুর খেলা করে।

প্রাণ-প্রাকৃতির অপার সৌন্দর্য, সম্পদ-সম্ভাবনার এই জেলাকে জানতে ও বুঝতে একটি টিনশেড ভবনে গেলে এর ধারণা মিলবে। দেড় শ বছরের পুরোনো এই ভবন। বেশ উঁচু। ভিন্নতা আছে দৈর্ঘ্য, প্রস্থেও। কক্ষগুলো বড়সড়। কাঠের পাটাতনের মেঝে। নিচটা ফাঁকা। সামনে খোলা প্রান্তর। বলা হয় ‘আসাম প্যাটার্ন’–এর ভবন। দারুণ নির্মাণশৈলী। এই দৃষ্টিনন্দন ভবনই জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের ঠিকানা ‘সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর’।

জাদুঘরের সদর দরজা পেরোলে ডানে পরিদর্শন বই রাখা। পাশেই জেলার প্রথম মহকুমা প্রশাসকের ব্যবহৃত চেয়ার-টেবিল, শতবর্ষ পুরোনো রাজকীয় টাইপ রাইটার মেশিনসহ নানা দুর্লভ সামগ্রী। এরপর একে একে জেলার রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিষয়, মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি; পরিবেশ ও প্রকৃতি, জীবন ও জীবিকার নানা উপকরণের সংগ্রহ সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

‘আসাম প্যাটার্ন’–এর এই ভবনে জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের ঠিকানা ‘সুনামগঞ্জ ঐতিহ্য জাদুঘর’
ছবি: প্রথম আলো

জাদুঘরে মুগ্ধ করার বিষয় হলো জেলার ১ হাজার ৬৯১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার নিজের হাতে লেখা ডায়েরির সংরক্ষণ। এসব ডায়েরিতে প্রত্যেক বীর মুক্তিযোদ্ধার ছবি, হাতের পাঁচ আঙুলের ছাপ, পরিচয়ের সঙ্গে যুদ্ধে যাওয়ার বর্ণনা, যুদ্ধদিনের স্মৃতিকথা আছে। এই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই আজ এ ধরায় নেই। আছে ভাষাশহীদদের জীবন ও সংগ্রামের ইতিহাস।

সংস্কৃতি বিভাগে জেলার মরমি সাধকদের আলোকচিত্র, তাঁদের গানের পাণ্ডুলিপি, ব্যবহৃত পোশাক-পরিচ্ছদসহ নানা সামগ্রী। সুনামগঞ্জের রূপ-সৌন্দর্যের বেশ কিছু আলোকচিত্র, হাওর এলাকার মানুষের ব্যবহৃত পুরোনো তৈজসপত্র দেখা গেল প্রকৃতি ও পরিবেশ অংশে। হাওরে মাছ ধরা এবং কৃষিকাজে ব্যবহৃত হয় বাহারি যন্ত্র, এ যন্ত্র সংরক্ষণ করা হয়েছে। এসব এখন হাওর এলাকা থেকে হারিয়ে যাচ্ছে। এখানে হাওরের মিঠাপানির ৩৬ প্রজাতির মাছ ছোট-বড় বয়ামে বিশেষভাবে সংরক্ষণ করা আছে।

সুনামগঞ্জ পৌর শহরের আলফাত স্কয়ার থেকে পূর্ব দিকে ডি এস রোড ধরে মিনিট পাঁচ হাঁটলে ডান পাশে এই জাদুঘর। বাঁ পাশে শহরের ঐতিহ্যবাহী সরকারি জুবিলী উচ্চবিদ্যালয়, শাপলা চত্বর। দক্ষিণে জেলা স্টেডিয়াম, পূর্বে কেন্দ্রীয় ঈদগাহ ও কেন্দ্রীয় জামে মসজিদ। জাদুঘর যে ঘরে, সেটি একসময় জেলা ‘কালেক্টরেট’ ভবন ছিল।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয় শহরের অন্যত্র স্থানান্তর হলে একসময় ভবনটি অযত্ন-অবহেলায় ‘পরিত্যক্ত’ হয়ে পড়ে। বেশি কিছুদিন এভাবেই পড়ে ছিল। পরে সেখানে কয়েক বছর সুনামগঞ্জের নতুন করা একটি উপজেলার প্রশাসনিক কার্যক্রম চলেছে। একপর্যায়ে ওই উপজেলা পরিষদের প্রশাসনিক কার্যক্রমও স্থানান্তরিত হয়ে যায়। পরে এখানে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয়।

প্রশাসন উদ্যোগী হয়ে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংশ্লিষ্ট নানা স্মারক সংগ্রহ করে
ছবি: প্রথম আলো

জাদুঘরের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয় ২০১৬ সালের ৩০ জানুয়ারি। প্রশাসন উদ্যোগী হয়ে জেলার বিভিন্ন স্থান থেকে ইতিহাস-ঐতিহ্যের সংশ্লিষ্ট নানা স্মারক সংগ্রহ করে। অনেকে নিজ উদ্যোগে জাদুঘরে স্মারকসামগ্রী সংরক্ষণের জন্য দেন। বর্তমানে জাদুঘরে তিনজন কর্মী আছেন। প্রতিদিন সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য এটি খোলা থাকে। এখানে নানা শ্রেণি ও পেশার লোকজন আসেন। তবে ছুটির দিন বিকেলে উপস্থিতি ভালো হয়। শিক্ষার্থীরাও আসে এখানে।

জাদুঘরের ডেপুটি কিউরেটর লোকসংস্কৃতি গবেষক মোহাম্মদ সুবাস উদ্দিন জানালেন, এখনো পুরোপুরি সবকিছু গোছানো হয়নি। কাজ চলছে।

সুনামগঞ্জ সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সাবেক সভাপতি আইনুল ইসলাম বলেন, জাদুঘরটি জেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় চলছে। কোনোভাবে এটিকে জাতীয় জাদুঘরের শাখা হিসেবে যুক্ত করা গেলে আরও ভালো হবে। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা ও সহযোগিতায় জাদুঘরটি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।