ইতিহাসের সাক্ষী মুক্তাগাছার ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছা উপজেলার খেরুয়াজানী ইউনিয়নের হরিপুর দেউলী গ্রামে আছে প্রাচীন এক মসজিদ। স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি ‘ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ’ নামে পরিচিত। ১৮টি স্তম্ভঘেরা ২ গম্বুজবিশিষ্ট প্রাচীন এই মসজিদ সর্বশেষ সংস্কার হয়েছিল ২৯৭ বছর আগে। সেই তথ্য মসজিদের গায়ে খোদাই করে লেখা আছে। এটি কত বছরের প্রাচীন, তা স্থানীয় বাসিন্দারা জানেন না।
গত শুক্রবার সরেজমিন মসজিদটি ঘুরে দেখা যায়, মসজিদের বাইরের অবয়বে শেওলা জমেছে। সামনে এক বিরাট পুকুর। পুকুরের পাশে গাছগাছালিতে ঘেরা মসজিদ, পাশেই কবরস্থান। মসজিদের বাঁ দিকে প্রাচীন একটি ভাঙা কবর দেখা যায়। মসজিদসংলগ্ন বিবির ঘর নামের একটি স্থাপনা মিশে গেছে মাটির সঙ্গে, মসজিদে প্রবেশের সিঁড়িগুলোও এখন অস্তিত্ব হারিয়েছে। মসজিদটিতে সমান আকৃতির দুটি গম্বুজ আছে। মসজিদটি ১৮টি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রতিটি স্তম্ভের ওপর আছে একটি করে ছোট গম্বুজ। এই হিসাবে অনেকে এটিকে বিশ গম্বুজ মসজিদও বলেন। স্তম্ভ ও গম্বুজগুলো নানা কারুকার্যখচিত। মসজিদটিতে দুটি দরজা ও দুটি জানালা আছে। মসজিদটির প্রতিটি অংশেই আছে প্রাচীন কারুকাজময় নকশার নিদর্শন ও শৈল্পিক ছোঁয়া।
মসজিদের খতিব মাওলানা মো. বাদী বিল্লাহ বলেন, ‘জেলার প্রাচীন ঐতিহ্য এই মসজিদ। এই মসজিদ কে নির্মাণ করেছেন, কত সালে নির্মিত হয়েছে, তা কেউ বলতে পারেন না, কোনো নথিপত্রও নেই। শুধু মসজিদের ভেতরে খোদাই করা একটি সংস্কার সাল আছে। মসজিদের সঠিক ইতিহাস আমাদের জানা নেই। তবে দেয়াল ও ইটের ধরন অনুযায়ী এটি মোগল স্থাপত্য বা সুলতানি আমলের প্রথম দিকের হতে পারে বলে আমাদের ধারণা।’ তিনি আরও বলেন, মসজিদের ভেতরে ইমাম ছাড়া ২ কাতারে ৪০ জনের মতো নামাজ পড়তে পারেন। তবে নামাজের জায়গা বাড়াতে বারান্দার কিছু অংশ বাড়ানো হয়েছিল। ২০১৯ সালে এটি সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে তালিকাভুক্ত হওয়ায় এখানে নিয়মিত দর্শনার্থীরা আসেন।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ঘোষিত সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় ময়মনসিংহের ১১টি স্থাপনার একটি মুক্তাগাছার এই ‘ভূঁইয়া বাড়ি জামে মসজিদ’। ২০১৯ সালের ১৯ আগস্ট এটি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গেজেটভুক্ত হয়। গেজেটের তথ্য অনুযায়ী, তৎকালীন ব্রিটিশবিরোধী ফকির বিদ্রোহের সময় মসজিদটি স্থাপন করা হতে পারে।
সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে মসজিদের কোথাও কোনো সাইনবোর্ড নেই। সংস্কারের অভাবে মসজিদটির বেশ কিছু অংশ ভগ্নপ্রায়। সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণ প্রসঙ্গে প্রত্নতত্ত্ব অধিপ্তরের আঞ্চলিক পরিচালক (ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগ) আফরোজা খান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমানে ময়মনসিংহে একটি প্রকল্পের কাজ চলমান থাকলেও মসজিদটি সে তালিকায় নেই। এ অর্থবছরে না থাকলেও আগামী অর্থবছরে হয়তো আমরা সংস্কারের চেষ্টা করব।’ সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে মসজিদে সাইনবোর্ড না থাকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি দেখব ব্যাপারটা।’
মসজিদটির সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুকিদুল ইসলাম ভূঁইয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন, মসজিদটির যে পুরোনো কারুকাজ ছিল, তা যেন বিলীন না হয়। এ যুগের মানুষ এগুলো দেখবে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আতিকুজ্জামান খান বলেন, ‘আমরা ছোট থেকে মসজিদটি একই অবস্থায় দেখছি। এটি কত বছর আগে হয়েছে, কেউ জানে না। তবে সবাই জানি, এটি খুবই প্রাচীন।’