‘মিসাইলের বিকট শব্দে পরানে পানি থাকে না, রাতে ঘুমাতে পারি না’

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতিতে গৃহবন্দী অবস্থায় উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরাছবি: প্রবাসীদের থেকে সংগৃহীত

‘মিসাইলগুলো যখন আকাশ দিয়ে যায়, আমরা ফ্ল্যাটের রুমে বসেই দেখতে পাই। মিসাইলের বিকট শব্দ শুনলে পরানে পানি থাকে না, রাতে ঘুমাতে পারি না। যুদ্ধ আরও এক মাস হলে আমাদের ভবিষ্যৎ কী হবে, বলতে পারছি না। কাতারে ৮ থেকে ১০ লাখ বাঙালি বসবাস করেন। সবার মধ্যেই ভয়ানক আতঙ্ক। অনেকের কাজ নেই, প্রজেক্ট বন্ধ। খাওয়াদাওয়ার কষ্ট হচ্ছে। সবকিছু কেমন যেন থমকে যাচ্ছে।’

তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন কাতারপ্রবাসী ইরাদ শিকদার (৪০)। তিনি দীর্ঘ ১২ বছরের বেশি সময় ধরে কাতারের রাজধানী দোহায় থাকেন। তাঁর বাড়ি মাদারীপুর শহরের বাদামতলা এলাকায়। তিনি কাতারের একটি বহুজাতিক কোম্পানির ইলেকট্রিক সুপারভাইজার হিসেবে কর্মরত। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় চরম আতঙ্কে আছেন তিনি।

শুধু ইরাদ শিকদার একা নন, বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা ও অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশি প্রবাসীদের। দেশের প্রবাসী অধ্যুষিত জেলার মধ্যে শীর্ষে আছে মাদারীপুর। এই জেলার প্রবাসীদের বেশির ভাগ ইউরোপে থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতেও অনেক মানুষ কর্মরত আছেন।

কাতারপ্রবাসী মাদারীপুরের অন্তত পাঁচজনের সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে আড়াই বছর আগে কাতারে পাড়ি জমানো মাদারীপুর সদর উপজেলার মহিষেরচর এলাকার সিয়াম সরদার (২৭) বলেন, ‘সব সময়ই আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। সরাসরি চোখে দেখতে পাই, মিসাইল গিয়ে আমেরিকার এয়ারওয়েজে গিয়ে পড়ছে। দিন যত যাচ্ছে, হামলার তীব্রতা বেড়ে চলেছে। কোনো কাজে যেতে পারছি না। ঘরবন্দী সময় কাটছে। এমন অবস্থায় পরিবারও আমাদের নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছে। পরিবারকে সান্ত্বনা দেওয়া ছাড়া কোনো ভাষা খুঁজে পাচ্ছি না।’

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলা
ছবি : রয়টার্স

মাদারীপুর শহরের আমিরাবাদ এলাকার প্রবাসী হান্নান মোল্লা (২৮) বলেন, বুধবার সকাল থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে চারটি মিসাইল কাতারে পড়ে। আবার রাত একটার দিকেও চারটি মিসাইল পড়ে। বর্তমানে পরিস্থিতি খুবই থমথমে। কখন ইরান কাতারের মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে মিসাইল মারে, বোঝা যায় না। কখনো ইফতারের আগে মারে আবার সকালেও মারে। আগে সাইরেন বাজত, এখন সেটাও বাজে না। বিস্ফোরণ হলে বিকট শব্দে পুরো দোহা কেঁপে ওঠে।

প্রবাসীরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় বাঙালিরা অতি উৎসাহিত হয়ে কোথায় মিসাইল পড়ছে, সেটা দেখতে যাচ্ছেন, মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ কুড়িয়ে আনতে যান। ছবি ও ভিডিও করতে যান কেউ কেউ। এ সময় আকাশ থেকে মিসাইলের ধ্বংসাবশেষ পড়ে দুই থেকে তিনজন বাঙালি আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন কাতারপ্রবাসীরা। কাতার সরকার সবাইকে ঘরের মধ্যে থাকতে বলেছে। কারণ, যখন আকাশে মিসাইলগুলো নিষ্ক্রিয় করা হয়, তখন ধ্বংসাবশেষ নিচে পড়ে যেন কেউ আহত না হন।

খোয়াজপুর ইউনিয়নের চরগোবিন্দপুর এলাকার লোকমান হোসেন (৩৫) দীর্ঘ এক দশক ধরে সৌদি আরবের রিয়াদে পরিবার নিয়ে থাকেন। তিনি একটি সুপারশপে চাকরি করেন। তিনি মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সৌদির মার্কিন দূতাবাসে যখন ড্রোন হামলা হলো, তখন চারদিকে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। বাঙালিরা কাজ করছেন। তবে তাঁদের আতঙ্কের মধ্যে থাকতে হচ্ছে। এমন ভয়ের দিন কবে শেষ হবে, সেই আশায় আছি।’

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় তীব্র উদ্বেগ-উৎকণ্ঠায় আছেন কাতারপ্রাবাসী বাংলাদেশীরা
ছবি: প্রবাসীদের সৌজন্যে

মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই শহরে ১৭ বছর ধরে থাকেন মাদারীপুরের মস্তফাপুর ইউনিয়নের তাঁতীবাড়ি এলাকার দেলোয়ার হোসেন। তিনি বলেন, ‘প্রবাসে ভালো নেই। এ ধরেন হঠাৎ ঘুমিয়ে গেছি, ধুরুম-ধারুম শুরু হয়ে গেছে। আতঙ্কে কেঁপে উঠি। ভয়াবহ বিকট শব্দ হয়। পুরো ভবন কেঁপে ওঠে। ভয় হয়, আমি যেই ভবনে থাকি, সেটার ওপরে পড়ল নাকি অন্য কোথাও। রাতে ঘুম হয় না। কোন দিকে আশ্রয় নেব, সেটা মাথায় ঘুরতে থাকে। আমরা অবিলম্বে এই যুদ্ধ বন্ধ চাই।’

আরও পড়ুন

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় দেশে থাকা প্রবাসীদের স্বজনেরাও উদ্বেগের মধ্যে আছেন। মাদারীপুরের বিভিন্ন পত্রিকার এজেন্ট ওমর আলী শিকদারের বড় ছেলে কাতারপ্রবাসী। ঈদের আগে তাঁর দেশে ফেরার কথা থাকলেও সেটি অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। ওমর আলী শিকদার বলেন, ‘বড় ছেলে কাতারে থাকে। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে খুব চিন্তার মধ্যে আছি। সামনে ঈদ; এমন পরিস্থিতিতে কাজও করতে পারছে না। আমরা চাই, এই যুদ্ধ দ্রুত বন্ধ হোক। আমরা শান্তি চাই।’

মাদারীপুর জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক আবদুল জলিল মিয়া প্রথম আলোকে বলেন, মাদারীপুর জেলা প্রবাসী অধ্যুষিত অঞ্চল। ইউরোপের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যেও প্রচুর মানুষ আছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা বাংলাদেশিদের সুরক্ষা নিশ্চিতের জন্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কল সেন্টারও আছে। সেখানে প্রবাসীরা সহযোগিতা চাইলে দূতাবাসের মাধ্যমে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে।