এ প্রসঙ্গে বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেলে কলেজ হাসপাতালের পরিচালক এইচ এম সাইফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা এটার চাহিদাপত্র ঢাকায় পাঠিয়েছি। বর্তমানে গুরুতর রোগীদের ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে। তবে এর হার খুব কম।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, বরিশাল বিভাগের ছয় জেলায় ছয়টি সদর হাসপাতাল এবং পটুয়াখালী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালেও প্লাটিলেট সেল সেপারেটর মেশিন নেই। সে ক্ষেত্রে বিভাগের কোনো হাসপাতালেই গুরুতর রোগীদের চিকিৎসা দেওয়ার মতো পুরো সক্ষমতা নেই।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য-উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা যায়, এবার সেপ্টেম্বর থেকে বরিশাল বিভাগে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হতে থাকে। ২৮ অক্টোবর পর্যন্ত এ বিভাগে ১ হাজার ৪৯৪ রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। এর মধ্যে মারা গেছেন ৫ জন। তারা সবাই মারা গেছেন সেপ্টেম্বরে। সর্বশেষ ৩০ সেপ্টেম্বর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে একজন মারা গেছেন।

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার কাঠমিস্ত্রি লিটন মজুমদার (৪৫) তিন দিন ধরে জ্বরে আক্রান্ত। পরে পরীক্ষার পর তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে শুক্রবার সকালে তাঁকে আনা হয় বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। লিটন বলেন, ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার আগে তিনি এক বছরে কোথাও ভ্রমণ করেননি। এমনকি তাঁদের বাড়িতে আরও চারজন রোগী আছেন।

স্বাস্থ্য বিভাগ জানায়, ডেঙ্গুতে বিভাগে যে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে, তাঁরা সবাই বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে তিনজন নারী। দুজন বরগুনার, দুজন পিরোজপুরের এবং একজন বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জের বাসিন্দা ছিলেন।

সম্প্রতি বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, অনেক রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন। শয্যা না পেয়ে অনেক রোগীকে মেঝেতে থেকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। হাসপাতালে আলাদা ডেঙ্গু ওয়ার্ড নেই। সাধারণ ওয়ার্ডেই কিছুটা আলাদা করে রাখা হচ্ছে ডেঙ্গু রোগীদের। এতে অন্য রোগীদেরও ঝুঁকি বাড়ছে। 

হাসপাতালটির পরিচালক এইচ এম সাইফুল ইসলাম বলেন, আপাতত মেডিসিন ওয়ার্ডে একটি কর্নার করে সেখানে ডেঙ্গু রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তবে করোনা ওয়ার্ডের যে নতুন ভবন আছে, সেখানে আলাদা একটি ডেঙ্গু ওয়ার্ড করার চিন্তাভাবনা চলছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, বরিশাল বিভাগে ব্যাপক হারে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছিল ২০১৯ সালে। ওই বছর বিভাগের প্রায় সাড়ে ৭ হাজার ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল। আর মৃত্যু হয়েছিল ১৯ জনের। দক্ষিণাঞ্চলে আগে কখনো ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাবের ইতিহাস নেই। ওই বছরই প্রথম পিরোজপুরে ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছিল। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছিল পিরোজপুর জেলায়। ওই বছর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মারা যাওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগ রোগীরই ঢাকা বা অন্য স্থানে ভ্রমণের ইতিহাস ছিল। ২০২০ সালে বিভাগে ডেঙ্গুর তেমন প্রকোপ না থাকলেও ২০২১ সালে অন্তত ২০০ রোগী শনাক্ত হয়েছিল এ বিভাগে। তবে কারও মৃত্যু হয়নি। 

স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এবার মৃত ও আক্রান্ত ব্যক্তিদের অনেকেরই ঢাকা বা অন্য স্থানে ভ্রমণের ইতিহাস নেই। ফলে স্থানীয়ভাবে ডেঙ্গুবাহী এডিস মশার বংশবিস্তার হচ্ছে। মূলত এটাই এখন উদ্বেগের বিষয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কীটতত্ত্ববিদেরাও বরিশাল, পটুয়াখালী ও পিরোজপুরে অনুসন্ধান করে এডিস মশার অস্তিত্ব পেয়েছেন।

বিউটি বেগম তাঁর মেয়েজামাতা জহির রায়হানকে (৩০) গুরুতর অবস্থায় শুক্রবার ভর্তি করেছেন হাসপাতালে। জহির ঢাকায় থাকেন। সেখান থেকেই জ্বর নিয়ে বাড়িতে ফিরেছেন। বিউটি বলেন, ‘আজ এক ব্যাগ রক্ত দিয়েছি। কিন্তু এখনো অবস্থার তেমন উন্নতি হচ্ছে না।’

বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও মুখপাত্র শ্যামল কৃষ্ণ মণ্ডল প্রথম আলোকে বলেন, জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ নেই। পাশাপাশি প্লাটিলেট দেওয়ার সেল সেপারেটর মেশিন অপারেট করার মতো টেকনোলোজিস্টের অভাব আছে। গুরুতর ডেঙ্গু রোগীদের দ্রুত বরিশালের শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানোর নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।