২৮ বছর ধরে সাইকেলে ছুটছেন ‘রানার’ আকবর

সাইকেলে চিঠি নিয়ে গন্তব্যের উদ্দেশে ছুটছেন আলী আকবর। গত বৃহস্পতিবার চট্টগ্রামের আনোয়ারায়ছবি: জুয়েল শীল

‘রানার ছুটেছে তাই ঝুমঝুম ঘণ্টা বাজছে রাতে, রানার চলেছে খবরের বোঝা হাতে, রানার চলেছে রানার।’ সুকান্ত ভট্টাচার্যর কবিতার সেই রানার এখন আর রাতের আঁধারে ছুটে চলেন না। তবে রানারের যাত্রা একেবারে থেমেও যায়নি। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গ্রামীণ পথে এখনো সাইকেলের ঘণ্টা বাজিয়ে ছুটে চলেন আলী আকবর। সঙ্গে পাটের ছোট বস্তা। আর সেই বস্তায় মানুষের চিঠি; সাইকেলের ঝুড়িতেও চিঠি।

উপজেলার বারখাইন ইউনিয়নে সবুজ গাছপালার মাঝ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলে গেছে একটি সড়ক। স্থানীয়ভাবে সড়কটির কোনো নাম নেই। তবে হাজারো মানুষের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ পথ এটি। সেই আঁকাবাঁকা পথ ধরেই প্রতিদিন সকাল সকাল সাইকেলের বেল বাজিয়ে ছুটে চলেন আলী আকবর। বয়স পঞ্চাশ ছুঁই ছুঁই। মাথার চুলে পাক ধরেছে।

আকবরের খাকি পোশাক দেখে দূর থেকেই বোঝা যায়, তিনি ডাক বিভাগের কর্মী। প্রায় ২৮ বছর ধরে পাটের বস্তা সঙ্গে নিয়ে সাইকেলে এক ডাকঘর থেকে আরেক ডাকঘরে ছুটে বেড়াচ্ছেন তিনি। চিঠিপত্র পৌঁছে দিচ্ছেন, সংগ্রহ করছেন। স্থানীয় মানুষের কাছে তিনি পরিচিত ‘রানার আকবর’ নামে।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দা আলী আকবর। ডাক বিভাগের সঙ্গে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। সে সময় ডাক বিভাগের ‘মেইল ক্যারিয়ার’ পদে যোগ দেন তিনি। তবে স্থানীয়ভাবে তখন এই পদটি ‘রানার’ নামেই বেশি পরিচিত ছিল।

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার বাসিন্দা আলী আকবর। ডাক বিভাগের সঙ্গে তাঁর যাত্রা শুরু হয় ১৯৯৯ সালে। সে সময় ডাক বিভাগের ‘মেইল ক্যারিয়ার’ পদে যোগ দেন তিনি। তবে স্থানীয়ভাবে তখন এই পদটি ‘রানার’ নামেই বেশি পরিচিত ছিল। তাঁর এই আয় দিয়েই পাঁচ ছেলেমেয়ে ও পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব সামলে আসছেন আকবর।

আলী আকবর মূলত দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা চিঠি ও ডাক এক পোস্ট অফিস থেকে সংগ্রহ করে অন্য পোস্ট অফিসে পৌঁছে দেন। আবার সেসব পোস্ট অফিস থেকে অন্য জায়গায় পাঠানোর জন্য আসা চিঠি সংগ্রহ করে তাঁর এলাকার বিভিন্ন পোস্ট অফিসে পৌঁছে দেন। সকাল থেকেই শুরু হয় তাঁর কাজ।

সাইকেলে কেটেছে ২৮ বছর

গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে আনোয়ারা উপজেলা ডাকঘরের সামনে দেখা হয় আলী আকবরের সঙ্গে। চিঠি নিয়ে তাঁর একটি দিনের কর্মকাণ্ড দেখতে এখানে আসা। সামনে চিঠির বস্তা রেখে সাইকেলে উঠছিলেন তিনি। জানান, প্রতিটি দিনই তাঁর কর্মব্যস্ততায় কাটে। কার চিঠি, কিসের চিঠি—এসব কিছুই জানেন না তিনি। শুধু জানেন, চিঠিগুলো ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিতে হবে। কারণ, তিনি পৌঁছে না দিলে সংশ্লিষ্ট ডাকঘরের পোস্টম্যান বা ‘ডাকপিয়ন’ সেই চিঠি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারবেন না।

প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে নামাজ পড়েই কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন আলী আকবর। সকাল নয়টার আগেই তাঁকে পৌঁছাতে হয় আনোয়ারা উপজেলা ডাকঘরে। সেখান থেকে চিঠির বস্তা নিয়ে শুরু হয় তাঁর প্রতিদিনের যাত্রা। প্রথম গন্তব্য চার কিলোমিটার দূরের তৈলার দ্বীপ শাখা ডাকঘর।

তৈলার দ্বীপের পথে প্রথমে পড়ে পাকা সড়ক। সাইকেলেও ওই দূরত্ব পাড়ি দিতে আলী আকবরের লাগল ১৫ মিনিট। এরপর গ্রামের রাস্তা ধরে প্রায় আধা ঘণ্টা চলার পর তৈলার দ্বীপ ডাকঘরে পৌঁছালেন। এখনো মাটির তৈরি একটি ঘরেই কার্যক্রম চলে ডাকঘরটির।

তৈলার দ্বীপ ডাকঘরের সামনে আলী আকবর
ছবি: জুয়েল শীল

এই ডাকঘরের সামনে দাঁড়িয়ে কথা হয় আকবরের সঙ্গে। জানান, অষ্টম শ্রেণির পর আর পড়াশোনা করা হয়নি তাঁর। অভাবের সংসারে দ্রুতই কাজের খোঁজে নামতে হয়েছিল তাঁকে। ১৯৯৯ সালে ডাক বিভাগে যোগ দেওয়ার পর থেকে চিঠিই হয়ে উঠেছে তাঁর জীবনের সঙ্গী। এক পোস্ট অফিস থেকে আরেক পোস্ট অফিসে চিঠি পৌঁছে দিতে দিতে কেটে গেছে দুই যুগের বেশি।

সরকারি বেতন-ভাতা আগের তুলনায় বেড়েছে। কিন্তু চিঠির জন্য মানুষের সেই অপেক্ষা নেই। এখন দাপ্তরিক কাগজপত্র বেশি আসে। তবে সাইকেলে চিঠি বিলি করতে অনেক পরিশ্রম হয়। সময়ও বেশি লাগে। একটি মোটরসাইকেল থাকলে কাজটা আরও সহজ হতো।
আলী আকবর, কর্মী, ডাক বিভাগ

এই দীর্ঘ সময়ে নিজের সংসারটাকেও ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন আলী আকবর। এই চাকরির আয়েই দুই মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন। সংসারের নানা প্রয়োজন মিটিয়েছেন। ছেলেদের পড়াশোনাও চালিয়ে যাচ্ছেন। বড় ছেলের বয়স এখন ২০ বছর। গ্রামে ব্যবসা করছেন তিনি। মেজ ছেলে উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। ছোট ছেলে আগামী বছর মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে।

কথা বলতে বলতে আবার সাইকেলের প্যাডেলে চাপ দেন আলী আকবর। সামনে চিঠির বস্তা। গন্তব্য তৈলার দ্বীপ শাখা ডাকঘর। সেখানে পৌঁছে শাখা ডাকঘরে পোস্টমাস্টারকে চিঠি বুঝিয়ে দেন তিনি। নেন আরেকটি বস্তা। এগুলো নিয়ে যাবেন উপজেলা ডাকঘরে। এভাবে প্রতিদিন শাখা ডাকঘর ঘুরে বেলা তিনটার দিকে উপজেলা ডাকঘরে পৌঁছান তিনি। অন্য কাজ সেরে বিকেল পাঁচটায় ফেরেন ঘরে।

ডাকঘরে চিঠি হস্তান্তর করছেন আলী আকবর
।ছবি: জুয়েল শীল

যে ব্যবস্থার একটি ছোট্ট অংশ হয়ে প্রতিদিন ছুটে চলেন আলী আকবর, সেই ডাকব্যবস্থারই প্রতীকী দিন আজ। আজ ৯ অক্টোবর, বিশ্ব ডাক দিবস। ১৯৬৯ সাল থেকে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ওয়ান পোস্টাল নেটওয়ার্ক, ইনফিনিট পসিবিলিটিজ’। বাংলায় যার অর্থ, ‘সমন্বিত ডাক নেটওয়ার্ক, সীমাহীন সম্ভাবনা’।

আলী আকবর বলেন, সরকারি বেতন-ভাতা আগের তুলনায় বেড়েছে; কিন্তু চিঠির জন্য মানুষের সেই অপেক্ষা নেই। এখন দাপ্তরিক কাগজপত্র বেশি আসে। তবে সাইকেলে চিঠি বিলি করতে অনেক পরিশ্রম হয়। সময়ও বেশি লাগে। একটি মোটরসাইকেল থাকলে কাজটা আরও সহজ হতো।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিভাগের ডেপুটি পোস্টমাস্টার জেনারেল মো. শফিউল আরেফিন বলেন, ইউনিভার্সাল পোস্টাল ইউনিয়ন (ইউপিইউ) ও ডাক অধিদপ্তরের সমন্বিত উদ্যোগে সারা দেশে ১২০টি বৈদ্যুতিক বাইক দেওয়া হয়েছিল গত বছর শুরুতে। দেশের বিভিন্ন পোস্ট অফিসে এসব বাইক সরবরাহ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ আরও বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে।