দোহারে পাঁচ দিনের ব্যবধানে মা-মেয়ের মৃত্যু, ছিলেন ঋণের চাপে
ঢাকার দোহারে পাঁচ দিনের ব্যবধানে মা ও মেয়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় লোকজন বলছেন, নিহত মা-মেয়ে এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে সময়মতো দিতে না পারায় মানসিক চাপে ছিলেন। তাঁদের চাপ দেওয়ার পাশাপাশি গালাগাল করছিলেন ঋণদাতা সংস্থার কর্মকর্তারা। এ কারণে লজ্জায়-অভিমানে অসুস্থ হয়ে ২৪ জুন মারা যান দোহারের খালপাড় এলাকার লাভলী আক্তার। একই কারণে অসুস্থ হয়ে গত সোমবার রাতে মারা গেছেন মা রেহানা বেগম।
স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা ও নিহত মা-মেয়ের পরিবার সূত্রে জানা যায়, দোহার উপজেলার খালপাড় এলাকার মৃত শেখ শহীদের স্ত্রী লাভলী এক বছর আগে ‘রুরাল কনস্ট্রাকশন নিউনেশন’নামে একটি এনজির উপজেলার বটিয়া শাখা থেকে তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ছেলেকে সৌদি আরবে পাঠান। কিন্তু ছেলে টাকা না পাঠানোয় ঋণের টাকা শোধ করতে পারছিলেন না লাভলী। এতে এনজিও কর্মকর্তারা তাঁকে নানাভাবে চাপ দিতে থাকেন।
এনজিওর চাপ সইতে না পেরে অসুস্থ হয়ে আমার মা ও বোন মারা গেছে। আমি আমার মা ও বোনের মৃত্যুর বিচার চাই।নুরুল ইললাম, রেহেনা বেগমের ছেলে
কিস্তির টাকা পরিশোধ করতে না পেরে ভয়ে লাভলী বাড়ি ত্যাগ করে অন্যত্র অবস্থান নেন। তিনি উপজেলার নাগেরকান্দায় মায়ের বাড়িতে অবস্থান করেন। সেখানে গিয়েও ঋণের টাকার জন্য চাপ দেন এনজিওর এক কর্মকর্তা। ওই কর্মকর্তা পুলিশ নিয়ে গিয়ে লাভলীকে গ্রেপ্তার করার কথা বলে ভয়ভীতি দেখান। ওই দিনই লাভলী অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং সন্ধ্যার পর তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, লাভলীর মৃত্যুর সপ্তাহ না যেতেই ঋণের টাকা আদায়ের জন্য চাপ দেওয়া এবং ভয় দেখানো হয় তাঁর মা রেহানা বেগমকে। এতে রেহানা বেগম আতঙ্কিত হয়ে অসুস্থ হয়ে পড়লে দোহার স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। পাঁচ দিনের ব্যবধানে মা-মেয়ের মৃত্যুতে এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
মৃত্যুর কারণ জানতে দুটি লাশই উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠিয়েছে পুলিশ। দোহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবুবকর সিদ্দিক বলেন, খবর পেয়ে লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকায় প্রেরণ করা হয়েছে। প্রতিবেদন পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
রেহানা বেগমের ছেলে ও লাভলীর ভাই নুরুল ইললাম বলেন, ‘আমার মা ঋণের বিষয়ে অবগত নন। তারপরও এনজিও লোকজন আমাদের বাড়িতে এসে মায়ের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করে এবং পুলিশের ভয় দেখায়। এ সময় ঘরের সিঁড়িতে দাঁড়ানো অবস্থায় মা পড়ে গিয়ে মারা যায়। এনজিওর চাপ সইতে না পেরে অসুস্থ হয়ে আমার মা ও বোন মারা গেছে। আমি আমার মা ও বোনের মৃত্যুর বিচার চাই।’
নাগেরকান্দা এলাকার রইস লস্কর জানান, পাঁচ দিনের ব্যবধানে মা ও মেয়ের মৃত্যু খুবই মর্মান্তিক ঘটনা। এনজিও কর্মকর্তাদের এমন আচরণে ভয়ে অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়ার বিষয়টি নতুন নয়। এ বিষয়ে সরকারের ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।
দোহার উপজেলার বটিয়ায় অবস্থিত রুরাল কনস্ট্রাকশন নিউনেশনের শাখা ব্যবস্থাপক আনোয়ার জাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘ঋণগ্রহীতা লাভলী আক্তার ছয় মাস আগে ঋণখেলাপি হয়েছেন। আমরা টাকা আদায়ে নানাভাবে চেষ্টা করে ব্যর্থ হই। লাভলী মারা যাওয়ার পর আমরা তার ঋণ মওকুফের জন্য মৃত ব্যক্তির ডেথ সার্টিফিকেট চাইতে তাঁর মায়ের বাড়িতে যাই। টাকার জন্য মাকে চাপ দেওয়া হয়নি।’
দোহার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাঈদুল ইসলাম বলেন, ভুক্তভোগী পরিবার বিষয়টি লিখিতভাবে জানালে ওই এনজিওর বিষয়ে খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।